মনের প্রশান্তি দেবে ভার্টিক্যাল গার্ডেন

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ইট-কাঠ-পাথরে গড়া শহরের বুকে ছোট্ট একটু সবুজের টুকরো মনে প্রশান্তি এনে দেয়। অনেকেই একটি বাগানের স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু শহুরে জীবনের ছোট্ট বারান্দা বা সীমিত জায়গার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। আপনি কি জানেন, খুব সহজেই বারান্দায় একটি ভার্টিক্যাল বা উল্লম্ব বাগান তৈরি করতে পারেন? এমন একটি বাগান করার জন্য খুব বড় বারান্দা বা জায়গার প্রয়োজন হয় না। জীবনে যদি আরও সবুজ যোগ করার প্রয়োজন হয়, তবে ছোট বারান্দা থেকেই শুরু করতে পারেন। আর এসব কিছু নিয়েই আমাদের আজকের এই আয়োজন।


কী এই ভার্টিক্যাল গার্ডেন?


গাছ আমরা কে না ভালোবাসি! সবুজে ঘেরা চারপাশ, যা চোখের শান্তির পাশাপাশি মনকেও এক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। সময় ও স্থানসংকটের কথা চিন্তা করে ভার্টিক্যাল গার্ডেন হতে পারে বেস্ট চয়েস। ভার্টিক্যাল গার্ডেন বা উল্লম্ব বাগান হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে মাটিতে না লাগিয়ে দেয়াল, কাঠের ফ্রেম, লোহার স্ট্যান্ড বা ঝুলন্ত কাঠামোর ওপর গাছ লাগানো হয়।


ছোট্ট বারান্দায় সূর্যের আলো ও বাতাসের সুযোগ থাকলে তৈরি করে নিতে পারেন এই সবুজ, প্রাকৃতিক ও দৃষ্টিনন্দন দেয়াল। ন্যূনতম পরিমাণ প্রচেষ্টার বিপরীতে সর্বাধিক সুবিধা পাওয়া যায় এই ধরনের বাগানে। একদম সহজ থেকে শুরু করে জটিল পর্যায়ের এই সৃজনশীল কাজ একটি সুন্দর ও মনোরম সবুজে ঘেরা পরিবেশ তৈরি করবে। এটি বাড়ি, অফিস, রেস্তোরাঁ কিংবা ছোট্ট বারান্দা—সব জায়গাতেই সমানভাবে জনপ্রিয়।


এই ভার্টিক্যাল বাগানে কী চাষ করা যায়, তা গবেষণা করার আগে বিবেচনা করার প্রথম বিষয় হলো আপনার বারান্দায় এ ধরনের বাগানের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আছে কি না। স্থান বা আকার যা-ই হোক না কেন, সবুজের বৃদ্ধির জন্য কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন—


গাছের কতটা সূর্যালোক লাগবে, তা নির্ভর করে এর ধরন ও প্রজাতির ওপর। কিছু গাছ সরাসরি সূর্যালোক পছন্দ করে, আবার অন্যরা ছায়ায় বৃদ্ধি পায়। আপনার বারান্দায় কেমন সূর্যের তাপ আসে এবং গাছপালার জন্য পূর্ব বা পশ্চিমমুখী অবস্থান প্রয়োজন কি না, তা বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।


বৃষ্টি, অতিরিক্ত হাওয়া ও রোদের উপস্থিতি বারান্দায় কেমন এবং এগুলো মোকাবিলায় গাছগুলো সক্ষম কি না, তাও মাথায় রাখতে হবে। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, বারান্দায় প্রচুর বাতাস থাকলে গাছও বাতাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির উদ্ভিদ আছে, যেগুলো চরম ঠান্ডা বা গরমে বাঁচতে পারে না। আবহাওয়ার এমন পরিস্থিতি হলে গাছগুলোকে কিছু দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে, নতুবা ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে হতে পারে।


যেহেতু এ ধরনের বাগানে গাছগুলোকে সরাসরি মাটিতে রোপণ করা হয় না, তাই মূলের আকারের পাশাপাশি গাছের আকারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিছু গাছপালা বেশ বড় হতে পারে এবং বড় পাত্রের প্রয়োজন হতে পারে। যদি এমন হয়, তবে সেই গাছগুলো এ ধরনের উলম্ব বাগানের জন্য উপযুক্ত নয়।


এ ধরনের বাগানের জন্য যে স্থানটি নির্বাচন করা হবে, তার আকারের ওপর নির্ভর করে বাগানটি পরিকল্পনা করতে হবে। এর স্থাপন এবং বাগানটি লালন-পালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখতে হবে।

বারান্দায় ভার্টিক্যাল বাগান স্থাপনের জন্য কী দরকার?


উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়ে গেলে বলা যায়, আপনার বারান্দাটি এখন ভার্টিক্যাল গার্ডেনের জন্য উপযুক্ত স্থান। এখন এটি স্থাপনের জন্য যা যা দরকার—


আপনার বারান্দার এমন স্থান বেছে নিতে হবে, যেখানে প্রচুর উল্লম্ব জায়গা রয়েছে, যাতে গাছপালাগুলো সংকুচিত হওয়ার সুযোগ না থাকে। এ ছাড়া গাছের বৃদ্ধির জন্য জায়গাটিতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের চলাচলও নিশ্চিত করতে হবে।


উল্লম্ব বাগান স্থাপনের আগে, গাছপালাগুলো যেখানে থাকবে সেখানকার পরিবেশ বিবেচনা করুন। বৃষ্টি কি বারান্দায় আসে? কত ঘন ঘন বৃষ্টি হয়? জলবায়ু কতটা গরম বা ঠান্ডা? এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করবে বাগানটি কোথায় স্থাপন করবেন। ছোট জায়গায় যেহেতু গাছে পানি দেওয়ার জন্য স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রাখা হয় না, তাই বৃষ্টির সময় খেয়াল রাখতে হবে পানি দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না বা গাছগুলোতে পানি জমে আছে কি না। আবার যদি সরাসরি একটানা রোদের তাপ পায়, তা থেকে বাঁচতে শামিয়ানা টানানো যেতে পারে।


এই বাগানে গাছপালাগুলো যেহেতু লম্বালম্বিভাবে স্থাপন করা হয়, তাই অতিরিক্ত ওজন এড়ানোর জন্য এতে মাটির পরিমাণ অনেক কম থাকে। এখানে সাধারণত ব্যবহার করা হয় কোকোপিট, জৈব সার ও অল্প পরিমাণ মাটি। মাটির পরিমাণ কম থাকার কারণে গাছে ক্ষতিকর পোকামাকড় তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে।


মাটির কম ব্যবহারে পোকামাকড় কম হলেও বারান্দার অবস্থানের ওপরও কিন্তু কীটপতঙ্গের উপস্থিতি নির্ভর করে। আপনি যদি নিচতলায় থাকেন, তবে কীটপতঙ্গ সহজেই বারান্দায় প্রবেশ করতে পারে। আবার যদি উঁচু জায়গায় থাকেন, সে ক্ষেত্রে কিছুটা কম হবে। এ জন্য বাগ প্রতিরোধক মজুত করে রাখতে হবে।


গাছ নির্বাচন


এই ভার্টিক্যাল গার্ডেনে এডিবল ও নন-এডিবল—দুই ধরনেরই গাছ লাগানো যেতে পারে। উল্লম্বভাবে শাকসবজি চাষ করা যায়। ডাল ও মটরশুঁটি খুব সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে। টমেটো রোপণ করা যেতে পারে। কিছু প্রজাতির স্কোয়াশ আছে, যা উল্লম্বভাবে বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া অন্যান্য শাকসবজি যেমন লেটুস, ব্রকলি, লালশাক, পালংশাক, ক্যাপসিকাম ইত্যাদি দিয়েও এই বাগান সাজানো যায়।


আর নন-এডিবল যেমন মানিপ্ল্যান্ট, ফার্ন, স্পাইডার প্ল্যান্ট, ড্রাসিনা, রিও ইত্যাদি গাছ দিয়েও মনের মতো করে সাজানো যেতে পারে।


সবুজের জন্য বড় বাগান নয়, দরকার শুধু একটু ইচ্ছা ও সৃজনশীলতা। একটি ছোট্ট দেয়ালও হয়ে উঠতে পারে আপনার ব্যক্তিগত সবুজ স্বর্গ। তাই সীমিত জায়গাকে আর বাধা না ভেবে আজই শুরু করুন নিজের স্বপ্নের ভার্টিক্যাল গার্ডেন।

sidebar ad