“ছেলেমেয়েদের জন্যই তো সারাজীবন কাটিয়ে দিলাম। এখন তারা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু আমি কে?”
এই প্রশ্নটি আজকের সমাজে হাজারো নারীর মনের গভীরে লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে ৫০ বছর পার হওয়ার পর, যখন সন্তানরা বড় হয়ে যায়, পড়াশোনা বা চাকরির জন্য অন্য শহর কিংবা দেশে চলে যায়, তখন অনেক নারী হঠাৎ করেই নিজেদের জীবনের এক অদ্ভুত শূন্যতার মুখোমুখি হন।
সমাজে এই অবস্থাকে অনেকেই “এম্পটি নেস্ট সিনড্রোম” বা “খালি বাসার অনুভূতি” বলে থাকেন। তবে এটি কোনো রোগ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচয়ে বেঁচে থাকার পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মানসিক প্রক্রিয়া।
ফরিদার গল্প: মা পরিচয়ের বাইরে নতুন আমি
ঢাকার মিরপুরে বসবাসকারী ৫৪ বছর বয়সী নাসরিন আক্তার (ছদ্মনাম) ছিলেন একজন পূর্ণকালীন গৃহিণী। দুই সন্তানের পড়াশোনা, কোচিং, খাবার, অসুস্থতা—সবকিছু ঘিরেই ছিল তাঁর জীবন।
বড় ছেলে কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যায়। কিছুদিন পর মেয়ে বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস শুরু করে।
একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি বুঝতে পারলেন, রান্নাঘরে আর সেই ব্যস্ততা নেই। স্কুলের টিফিন বানাতে হচ্ছে না। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ নেই। ঘর আছে, সংসার আছে, কিন্তু যেন কাজ নেই।
তিনি বলছিলেন, “একসময় মনে হতো আমার প্রয়োজনই শেষ হয়ে গেছে।”
এই মানসিক অবস্থা প্রায় দুই বছর স্থায়ী হয়। পরে এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি অনলাইনে বেকিং শেখা শুরু করেন। প্রথমে পরিবারের জন্য, পরে পরিচিতজনদের জন্য কেক বানাতে শুরু করেন।
আজ তিনি একটি ছোট হোম বেকারি পরিচালনা করছেন। মাসে আয়ও করছেন সম্মানজনক পরিমাণ।
তিনি বলেন, “আমি এখনো মা। কিন্তু শুধু মা নই। আমি একজন উদ্যোক্তাও।”
কেন এই সংকট তৈরি হয়?
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে নারীদের পরিচয় অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তাঁদের পারিবারিক ভূমিকার মাধ্যমে।
“অমুকের স্ত্রী”, “অমুকের মা”, “অমুকের বউমা”—এই পরিচয়গুলো এতটাই প্রভাবশালী যে নিজের ব্যক্তিসত্তা অনেক সময় আড়ালে চলে যায়।
সন্তান ছোট থাকাকালে এই পরিচয় নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। কারণ দায়িত্ব থাকে, ব্যস্ততা থাকে, প্রয়োজন থাকে।
কিন্তু সন্তান যখন স্বাধীন হয়ে যায়, তখন অনেক নারী অনুভব করেন যে তাঁদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হঠাৎ করেই সরে গেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এটি আসলে পরিচয়ের সংকট। সন্তানদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়; বরং নিজের পরিচয় নতুন করে আবিষ্কারের সময়।
রেহানার দ্বিতীয় জীবন
চট্টগ্রামের রেহানা সুলতানা (ছদ্মনাম) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লেখালেখি করতেন। বিয়ের পর সংসার, সন্তান, শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে সেই শখ হারিয়ে যায়।
৫২ বছর বয়সে যখন দুই সন্তানই বিদেশে চলে যায়, তখন তিনি আবার ডায়েরি লেখা শুরু করেন।
সেই ডায়েরির কিছু অংশ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। পাঠকদের ইতিবাচক সাড়া তাঁকে অনুপ্রাণিত করে।
আজ তিনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকায় লিখছেন। সম্প্রতি তাঁর প্রথম বইও প্রকাশিত হয়েছে।
রেহানা বলেন, “আমি বুঝলাম, বয়স আমার স্বপ্নকে মেরে ফেলেনি। আমি নিজেই তাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলাম।”
নতুন পরিচয় খোঁজার পথ
অনেক নারী মনে করেন, ৫০ বছর বয়স মানেই জীবনের শেষ অধ্যায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, গড় আয়ু বেড়েছে। ৫০ বছরের একজন নারী সামনে আরও ২৫ থেকে ৩০ বছর সক্রিয় জীবন পেতে পারেন।
এই দীর্ঘ সময়টাকে কি শুধুই অপেক্ষা করে কাটানো উচিত?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন “সেকেন্ড ইনিংস” ধারণাটি জনপ্রিয় হচ্ছে। অর্থাৎ জীবনের দ্বিতীয় পর্বে নতুন পরিচয় তৈরি করা।
কেউ উদ্যোক্তা হচ্ছেন, কেউ শিক্ষকতা করছেন, কেউ ভ্রমণ করছেন, কেউ সমাজসেবায় যুক্ত হচ্ছেন, কেউ আবার নতুন করে পড়াশোনা শুরু করছেন।
শারমিনের সামাজিক নেতৃত্ব
রাজশাহীর শারমিন আরা (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে শুধু পরিবার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন।
সন্তানরা বিদেশে যাওয়ার পর তিনি স্থানীয় একটি নারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
শুরুতে ছোটখাটো স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ করলেও পরে তিনি নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পরিচালনা শুরু করেন।
আজ তাঁর নেতৃত্বে শতাধিক নারী বিভিন্ন আয়মূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, “আগে ভাবতাম আমি শুধু আমার পরিবারের জন্য দরকারি। এখন বুঝি সমাজেরও আমাকে প্রয়োজন আছে।”
যে ভুলটি আমরা করি
আমাদের সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় অন্যের জন্য বাঁচতে।
সন্তানের জন্য, স্বামীর জন্য, পরিবারের জন্য—সবকিছুই করতে হবে। এটি অবশ্যই মূল্যবান। কিন্তু সমস্যা হয় তখন, যখন নিজের জন্য কোনো জায়গাই রাখা হয় না। একজন নারী যদি সারাজীবন নিজের শখ, প্রতিভা, আগ্রহ, স্বপ্ন—সবকিছু বন্ধ করে রাখেন, তাহলে একসময় তিনি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেন। সন্তান বড় হয়ে গেলে সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটিকেই খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কী করা যেতে পারে?
৫০ বছর বয়সে নতুন পরিচয় খুঁজে পাওয়ার জন্য বড় কোনো বিপ্লব দরকার নেই।
ছোট ছোট পদক্ষেপই যথেষ্ট।
হয়তো আপনি গান শিখতে চেয়েছিলেন।
হয়তো লেখালেখি করতে ভালোবাসতেন।
হয়তো একটি ছোট ব্যবসার স্বপ্ন ছিল।
হয়তো সমাজের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলেন। এখনই সেই সময়।
প্রতিদিন এক ঘণ্টা নিজের জন্য বরাদ্দ করুন।
নতুন কিছু শিখুন।
বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ান।
ভ্রমণ করুন।
কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হোন।
অনলাইন কোর্স করুন।
সবচেয়ে বড় কথা, নিজের পরিচয়কে শুধুমাত্র “মা” পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন না।
মাতৃত্ব একজন নারীর জীবনের অন্যতম সুন্দর পরিচয়। কিন্তু একজন নারীর পুরো পরিচয় নয়। সন্তান একদিন বড় হবে, নিজের পথে হাঁটবে—এটাই জীবনের নিয়ম। তাই সন্তানদের সফলভাবে বড় করে তোলার পর যে নারী একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন, “আমি কে?”—তাঁর জন্য উত্তরটি হতে পারে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা।
হয়তো তিনি একজন উদ্যোক্তা। হয়তো একজন লেখক। হয়তো একজন সমাজনেত্রী। হয়তো একজন শিল্পী। হয়তো তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি এখনও নিজের সেরা অধ্যায়টি শুরুই করেননি। কারণ জীবনের গল্পে ৫০ বছর কোনো সমাপ্তি নয়। অনেক নারীর জন্য সেটিই নতুন পরিচয়ের শুরু।
— সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী