শায়লা জাহান
প্রায় তিন দশকের দাম্পত্য, বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিবাহবিচ্ছেদ, শত শত কোটি ডলারের সম্পদের ভাগ এবং অসংখ্য বিতর্ক; কোন কিছুই তাঁকে ভেঙ্গে দিতে পারেনি। বরং প্রতিটি ঝড় পেরিয়ে তিনি আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছেন নিজ পরিচয়ে। বছরের পর বছর ফোর্বস এর বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় স্থান করে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারীর পরিচয় শুধু তাঁর স্বামীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনা।
বলছি প্রযুক্তি জগতের সফল নির্বাহী, মানবকল্যাণের অন্যতম মুখ, নারী ক্ষমতায়নের দৃঢ় কন্ঠ এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সমাজসেবী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস এর কথা। সাফল্যের শিখরে ওঠা, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া, সম্পর্কের ভাঙ্গন থেকে আবার উঠে দাঁড়ানো- সব মিলিয়ে মেলিন্ডার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেনো নতুন করে নিজেকে আবিষ্কারের কথা বলে। তাঁর জীবন শুধু অনুপ্রেরণার নয়, সাহসের এক অসাধারন দলিল।
বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় বারবার উঠে আসা মেলিন্ডা’কে অনেকেই চেনেন বিল গেটসের সাবেক স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু তাঁর পরিচয় এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৬৪ সালের ১৫ আগস্ট টেক্সাসের ডালাসে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন তিনি। বাবা রে ফ্রেঞ্চ ছিলেন একজন মহাকাশ প্রকৌশলী এবং মা এলেইন অ্যামারল্যান্ড ছিলেন গৃহিণী। তাঁর বাবা-মা উচ্চশিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও বিজ্ঞান ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। পরিবারের উৎসাহে তিনি ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সাথে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৭ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি মাইক্রোসফটে প্রোডাক্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি ছিলেন মাত্র ১০ জন নারী কর্মীদের একজন। তিনি ৯ বছর ধরে এই কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন এবং কাজের দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং দূরদর্শিতার কারণে খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পান। অনলাইন ট্র্যাভেল-অ্যাগ্রিগেটর ওয়েবসাইট ‘এক্সপেডিয়া’, ইন্টারঅ্যাক্টিভ মুভি গাইড ‘সিনেমানিয়া’ এবং ডিজিটাল বিশ্বকোষ ‘এনকার্টা’ র দায়িত্বে ছিলেন। এই সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের।
১৯৯৪ সালে বিল গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ বিয়ে করেন। পরবর্তী প্রায় ২৭ বছর তাঁরা শুধু স্বামী-স্ত্রীই ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতব্য উদ্যোগগুলোর অন্যতম অংশীদার। যে বছর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, সেই একই বছরে তাঁরা ‘উইলিয়াম এইচ গেটস ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন। এর তিন বছর পর তাঁরা গড়ে তোলেন ‘গেটস লাইব্রেরি ফাউন্ডেশন’। ২০০০ সালে এই দুটি সংস্থা একত্রিত হয়ে হয় ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’। ফ্রেঞ্চ গেটস এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হিসেবে আফ্রিকার জায়ারে করা এক সফরের কথা উল্লেখ করেন। সেখানকার ভয়াবহ দারিদ্র্যতা, নারীদের দুরবস্থা তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। ৯১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদের অধিকারী এই সংস্থাটি “প্রতিটি জীবনের মূল্য সমান’’ এই মূলমন্ত্র দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করে। তাঁদের মতে, জন্মস্থান যেখানেই হোক না কেন, প্রত্যেকেরই একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনের সুযোগ থাকা উচিৎ।
এই ফাউন্ডেশনের মধ্যমে স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, শিক্ষার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করে। বিশেষ করে এইচআইভি/ এইডস, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মার মতো রোগ মোকাবিলার ওপর গুরুত্বারোপ করে। ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম পরিবর্তন করে “গেটস ফাউন্ডেশন’’ রাখা হয়।
কর্মজীবনে যার এতো এতো সাফল্যগাঁথা রয়েছে, ব্যক্তিজীবনে তাঁকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়। ২০২১ সালে প্রায় ২৭ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন বিল ও মেলিন্ডা। বিশ্বজুড়ে এই সংবাদ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান , তাঁর কাছে বিশ্বাস, সম্মান এবং একটি সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক চিন্তা ভাবনার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। ব্যক্তিগত জীবনের এতো বড় পরিবর্তনেও তিনি থেমে থাকেননি। বিচ্ছেদের পরও তাঁরা কিছুকাল একসাথে ফাউন্ডেশনের কাজ চালিয়ে যান। ২০২৪ সালে মেলিন্ডা আনুষ্ঠানিকভাবে সেখান থেকে পদত্যাগ করে নিজের কাজ দিয়ে সামনে এগিয়ে যান তিনি। আরও বেশি মনোযোগ দেন নারী অধিকার ও সমাজসেবামূলক কর্মকান্ডে।
মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস সামাজিক অগ্রগতির গতি ত্বরান্বিত করতে পিভোটাল নামের একটি ইনভেস্টমেন্ট ও কিউরেটিভ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার ও অগ্রগতির পক্ষে সোচ্চার মেলিন্ডা বিশ্বাস করতেন, নারীদের যখন এগিয়ে নেয়া যায়, তখন মানবতাকেও এগিয়ে নেয়া হয়। ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি স্বাস্থ্যকর ও সমতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করা মেলিন্ডার প্রতিষ্ঠিত পিভোটাল, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বজুড়ে নারী ও তরুণদের অগ্রগতির গতি ত্বরান্বিত করা। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের ঘাটতি দূর করার লক্ষ্যও নিয়েছেন।
নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষায় নিজের আগের প্রতিশ্রুতি আরও জোরালো করেছেন তিনি। এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালে ঘোষণা দিয়েছেন যে, ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি ১ বিলিয়ন ডলার অনুমোদন দেবেন।
লেখক হিসেবেও ছিলেন সমানভাবে সফল। ২০১৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য মোমেন্ট অফ লিফটঃ হাউ এমপাওয়ারিং উইমেন চেঞ্জেস দ্য ওয়ার্ল্ড’ ছিলো বিশ্বজুড়ে বেস্টসেলার একটি বই। মেলিন্ডা এখানে নিজের কন্ঠস্বর খুঁজে পাওয়ার এবং নারী ও মেয়েশিশুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। দীর্ঘদিনের ভ্রমণ, মানবিক কার্যক্রম ও ব্যাপক গবেষণার মধ্য দিয়ে তাঁর বইয়ে তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এমন সব নারীর সাথে, যাদের সাথে তাঁর পথে দেখা হয়েছে। তাঁদের গল্পগুলো অত্যন্ত অকপট ও হৃদয়বিদারক, আার একই সাথে অনুপ্রেরণাদায়ক ও বিজয়ের আখ্যান। এসব গল্প আমাদের দেখায় যে, কিভাবে ক্ষমতায়িত নারীরা বারবার ঘুরে দাঁড়ান এবং নিজেদের পরিবার ও সমাজকেও সাথে নিয়ে এগিয়ে যান।
ফোর্বসের বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীর তালিকায় বারবার উঠে আসা মেলিন্ডা কর্মজীবনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম সহ বহু সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন।
তথ্যসূত্র: ফোর্বস, গেটস ফাউন্ডেশন, পিভোটাল ভেঞ্চারস (অফিসিয়াল ওয়েবসাইট), দ্য মোমেন্ট অফ লিফট।