জাতীয় নারী সমতা দিবস: যে অধিকার একদিন ছিল স্বপ্ন

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬

ছবি: এআই/রোদসী
ছবি: এআই/রোদসী

কোনো অধিকারই সহজে অর্জিত হয় না। তার পেছনে জমা থাকে দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য ত্যাগ, তিতিক্ষা আর কখনো কখনো নিজের কণ্ঠস্বরটুকু বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ের গল্প। আজ যে স্বাধীনতার সুফলটুকু আমরা উপভোগ করি, একসময় সেটিই ছিল অসম্ভব মনে হওয়া এক স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন বাস্তব করতে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে লড়াই করতে হয়েছে।


নারীর অধিকারও তার ব্যতিক্রম নয়। একসময় পৃথিবীর বহু সমাজে নারীর জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল সীমিত। সংসার, সন্তান, ঘর—এই গণ্ডিই ছিল তার নির্ধারিত পৃথিবী। আর রাষ্ট্র পরিচালনা? সে তো অনেক দূরের ব্যাপার। সেখানে নারীর কণ্ঠস্বরের প্রবেশাধিকারের কোনো জায়গাই ছিল না। 


কিন্তু নারীরা সেই বাস্তবতাকে মেনে নেননি। বছরের পর বছর আন্দোলন, প্রতিবাদ, কারাবরণ এবং অসংখ্য নারীর নিরলস প্রচেষ্টার পর একসময় বদলাতে শুরু করেছিল সেই চিত্র। আর এই দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে আছে ২৬ আগস্ট, জাতীয় নারী সমতা দিবস। 


যে দিন বদলে দিয়েছিল ইতিহাস


প্রতি বছর ২৬শে আগস্ট পালন করা হয় 'জাতীয় নারী সমতা দিবস'। দিবসটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট মার্কিন কংগ্রেস সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী পাস করে। এর মাধ্যমে লিঙ্গের কারণে কোনো নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া বা সীমিত করা যাবে না—এমন সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়।


এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের আন্দোলন। ১৮৪০ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত 'বিশ্ব দাসপ্রথা-বিরোধী সম্মেলন'-এ বেশ কয়েকজন নারীকে সম্মেলনের মূল অধিবেশনে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হয়। মূলত এই ঘটনাটিই নারী অধিকার আন্দোলনের বীজ বপন করে। লুক্রেশিয়া মট এবং এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান্টন; মার্থা রাইট, মেরি অ্যান ম্যাকক্লিনটক এবং জেন হান্টের সাথে মিলে—নিউ ইয়র্কের সেনেকা ফলসে প্রথম নারী অধিকার সম্মেলনের পরিকল্পনা শুরু করেন।


 ১৮৪৮ সালের ১৯ ও ২০শে জুলাই ওয়েসলিয়ান চ্যাপেলে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের প্রথম দিনেই ২০০ জন নারী অংশ নেন। দ্বিতীয় দিনে পুরুষদের জন্যও সম্মেলনের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং কয়েকজন পুরুষ এতে যোগও দেন।


সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো যে, ভোটাধিকারের পবিত্র অধিকারটি নিজেদের জন্য নিশ্চিত করা এ দেশের নারীদের কর্তব্য। ১৮৪৮ সালে নিউইয়র্কের সেনেকা ফলস সম্মেলনের ৯ম প্রস্তাব সম্মেলন চলাকালীন নেতৃবৃন্দ ১২টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন যে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইনি এবং প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষের সমান হওয়া উচিত। ৯ম প্রস্তাবটি ছাড়া বাকি সবকটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ভোটাধিকারের বিষয়টি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। অনেক নারী মনে করেছিলেন যে, এর ফলে তাঁদের অনেক সমর্থক সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। তবে, দীর্ঘ বিতর্কের পর এবং দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনের নেতা ফ্রেডরিক ডগলাসের সমর্থনের ফলে ৯ম প্রস্তাবটিও পাস হয়।


ভোটাধিকার


সেই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকারের আন্দোলন পুরোদমে শুরু হয়। ১৮৬৯ সালে সুসান বি. অ্যান্থনি নামের আরেকজন আন্দোলনকারী স্ট্যান্টনের সাথে যোগ দিয়ে ‘ন্যাশনাল ওম্যান সাফ্রেজ অ্যাসোসিয়েশন’ (NWSA) গঠন করেন। প্রায় দশ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা ও প্রচারণার পর, ১৮৭৮ সালে NWSA ভোটাধিকার সংক্রান্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে। দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৮৮৬ সালে প্রস্তাবটি কংগ্রেসের অধিবেশনে উত্থাপিত হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল হয়ে যায়।


পরিশেষে, কংগ্রেসে নতুন কোনো সংশোধনী প্রস্তাব আসতে আরও ৩৪ বছর সময় লেগেছিল। এই দীর্ঘ সময়ে আন্দোলনকারীরা সভা করেছেন, মিছিল করেছেন, পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন; অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। অবশেষে, ১৯২০ সালে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত বিজয়। নারীরা সমঅধিকার লাভ করলে কংগ্রেস সংবিধানের ১৯তম সংশোধনী পাস করে।


নারী সমতা দিবসের ইতিহাস


ভোটাধিকার আন্দোলনের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ১৯৭০ সালের ২৬শে আগস্ট দেশব্যাপী ‘নারীদের সমতার দাবিতে ধর্মঘট’-এর পর এই দিনটির জন্য আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৩০ জুলাই কংগ্রেসওম্যান বেলা আবজুগ ২৬ আগস্টকে 'নারী সমতা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯তম সংশোধনী অনুমোদন এবং নারীদের সাংবিধানিক ভোটাধিকার অর্জনের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের মধ্যে কংগ্রেস একটি যৌথ প্রস্তাব পাস করে, যার মাধ্যমে প্রতি বছর ২৬ আগস্ট দিনটি পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৯তম সংশোধনীর অনুমোদনকে স্মরণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট এই দিনটিকে 'নারী সমতা দিবস' হিসেবে ঘোষণা করে আসছেন।


ভোটাধিকারই কি সমতার শেষ কথা?


একদমই নয়।

এখানেই জাতীয় নারী সমতা দিবস- এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই দিবস মনে করিয়ে দেয় যে, সমতা অর্জনের প্রচেষ্টা ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায়নি। ১৯২০ সালের ২৬ আগস্ট নারীরা একটি দরজা খুলেছিলেন। সেই দরজা দিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের নারীরা আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আজকের দিনে নারী সমতা বলতে শুধু ভোটাধিকার বোঝায় না। একজন নারী যেন নিজের শিক্ষা, পেশা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সম্পত্তি, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজের মত প্রকাশ করতে পারেন—সমতার ধারণাটি তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।


সমতা মানে সবাইকে একই রকম করে দেওয়া নয়; বরং লিঙ্গের কারণে কারও সুযোগ যেন কমে না যায়, সেটি নিশ্চিত করা।


তাই জাতীয় নারী সমতা দিবস, কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, সেই সব প্রজন্মের নারীদের, যারা ভোটাধিকারের দীর্ঘ লড়াইয়ে নানা বিরোধিতা, ত্যাগ ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এই দিবসটি নিশ্চিত করে যে, তাঁদের সাহস, অধ্যবসায় ও দৃঢ় সংকল্প—এবং তাঁরা যে আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তার ইতিহাস—যেন সর্বদা স্মরণ ও স্বীকৃত থাকে।


ঢাকা/আরএস

sidebar ad