মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, অনেক নারীকে শুধু ঘরের দৃশ্যমান কাজই নয়, পরিবারের নানা বিষয় পরিকল্পনা করা, সন্তানের প্রয়োজন মনে রাখা, সম্পর্কের সমস্যা সামলানো এবং সবার আবেগের ভার বহন করতে হয়। এই অদৃশ্য চাপকে প্রায়ই ‘মেন্টাল লোড’ বা মানসিক দায়িত্বের বোঝা বলা হয়। কিন্তু আমাদের সমাজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চিত্রের কোনো বাস্তবায়ন নেই। এই সমাজ বলে, মেয়েমানুষ একটু মানিয়ে নেবে।
সংসার করতে হলে অনেক কিছু সহ্য করতে হয়।
স্বামী যেমনই হোক, সংসারটা মেয়েকেই টিকিয়ে রাখতে হবে।
বাচ্চাদের কথা ভেবে সব ভুলে যাও।
এই কথাগুলো আমরা এত বেশি শুনেছি যে, কখন যেন এগুলোকে সত্যি বলে মেনে নিতে শিখে গেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সংসার কি একজন মানুষের? যদি সংসার দুজন মানুষের হয়, তাহলে সেটি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব কেন শুধু একজন নারীর কাঁধে এসে পড়ে?
কেন একজন নারীকে বারবার শেখানো হয়—মানিয়ে নিতে, চুপ থাকতে, নিজের ইচ্ছাকে ছোট করতে? কেন তাকে বোঝানো হয়, সংসার বাঁচাতে হলে অপমান গিলতে হবে, স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে, অন্যায়ের সঙ্গেও আপস করতে হবে?
আর সবকিছু সহ্য করে যাওয়ার নামই বা কেন দেওয়া হবে—‘ভালো বউ’?
সংসার টিকিয়ে রাখা মানে কোনো একজন মানুষকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দেওয়া নয়। সংসার মানে এই নয় যে, একজন সব সময় ছাড় দেবে আর অন্যজন সেই ছাড়কে নিজের অধিকার মনে করবে। সংসার মানে দুজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলা—
সমস্যা এসেছে, আমরা একসঙ্গে এর সমাধান করব।
ভুল হলে দুজনই ক্ষমা চাইবে।
কষ্ট হলে দুজনই শুনবে।
দায়িত্ব থাকলে দুজনই ভাগ করে নেবে।
সমস্যা হলে দুজনই পরিবর্তনের চেষ্টা করবে।
তাহলে শুধু মেয়েটাই কেন বারবার নিজের স্বপ্নকে ছোট করবে?
শুধু মেয়েটাই কেন নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে দেবে?
শুধু মেয়েটাই কেন নতুন একটি পরিবারের সঙ্গে মানিয়ে চলার দায়িত্ব একা নেবে?
শুধু মেয়েটাই কেন স্বামীর রাগ, অবহেলা, ভুল—এমনকি অন্যায়ও সহ্য করবে?
আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, একজন নারী যখন এসব প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখন অনেক সময় সমাজই তাকে বলে— “তুমি সংসার করতে জানো না।”
কিন্তু নিজের আত্মসম্মান রক্ষা করা সংসার না জানার লক্ষণ নয়। অন্যায়কে অন্যায় বলা সংসার ভাঙার চেষ্টা নয়। নিজের স্বপ্নের কথা বলা স্বার্থপরতা নয়। বরং একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য প্রয়োজন দুজন মানুষের সমান মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দায়িত্ববোধ।
ফরাসি দার্শনিক ও নারীবাদী সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, “One is not born, but rather becomes, a woman”—অর্থাৎ, কেউ জন্মগতভাবে সমাজের নির্ধারিত সেই ‘নারী’ হয়ে জন্মায় না; সমাজ, সংস্কার ও প্রত্যাশাই তাকে একটি নির্দিষ্ট ভূমিকায় গড়ে তোলে।
ছোটবেলা থেকেই যদি একটি মেয়েকে শেখানো হয়—
তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে
তোমাকে সহ্য করতে হবে
তোমাকেই সংসার বাঁচাতে হবে—
তাহলে সে একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করে, এটাই বুঝি তার স্বাভাবিক দায়িত্ব। কিন্তু একইভাবে কী আমাদের ছেলেদের শেখানো হয়? তাদের কী বলা হয়—
স্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখাও?
ঘরের কাজ তোমারও দায়িত্ব?
সন্তান শুধু মায়ের নয়, তোমারও?
সঙ্গীর ক্যারিয়ার ও স্বপ্নের মূল্য দাও?
ভুল করলে ক্ষমা চাও?
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পরিবর্তনের দায়িত্ব তোমারও?
আমাদের মেয়েদের শেখাতে হবে—সংসার মানে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলা নয়। আর আমাদের ছেলেদেরও শেখাতে হবে—বিয়ে মানে একজন নারীকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া নয়; বিয়ে মানে একজন সঙ্গী পাওয়া এবং তার প্রতি দায়িত্ব নেওয়া।
যে সমাজ মেয়েকে ছোটবেলা থেকেই শেখায়, “সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে তোমাকেই অনেক কিছু সহ্য করতে হবে”, সেই সমাজের এখন নিজের শিক্ষাটাই বদলানোর সময় এসেছে। কারণ একটি সুস্থ সংসার একজন নারীর একতরফা ত্যাগে তৈরি হয় না। সুস্থ সংসার তৈরি হয় দুজন মানুষের—সম্মানে, বিশ্বাসে, সহযোগিতায়, দায়িত্ববোধে এবং একে অপরের পাশে থাকার ইচ্ছায়।
ভালোবাসা কখনো একজনের আত্মত্যাগ আর অন্যজনের সুবিধার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
ঢাকা/আরএস