কিংবদন্তি অভিনেতা আবুল হায়াতের জীবনে এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল। তাকে চিকিৎসকের মুখে শুনতে হয়েছিল—‘ভালো সংবাদ দিতে পারছি না।’ প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেই গল্প দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি।
আবুল হায়াতের ক্যানসার-জয়ের গল্পে সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটি হলো তাঁর নিজের উপলব্ধি—ভয়কে অস্বীকার না করে, তাকে সঙ্গী করেই সামনে এগিয়ে যাওয়া। ২০২৫ সালের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি প্রস্টেট ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার দিন, পরিবারের প্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসার সময়কার মানসিক লড়াইয়ের কথা বিস্তারিত বলেছেন। তাঁর চিকিৎসা বাংলাদেশেই হয়েছিল।
কখনো কখনো একটি বাক্যই বদলে দেয় জীবনের পুরো দৃশ্যপট। চারপাশের পরিচিত পৃথিবীটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়। ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা, মনে ভর করে ভয়। কিংবদন্তি অভিনেতা আবুল হায়াতের জীবনেও এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল। চিকিৎসকের মুখে শুনতে হয়েছিল—‘ভালো সংবাদ দিতে পারছি না।’ শব্দগুলো খুব ছোট। কিন্তু তার অভিঘাত ছিল বিশাল।
প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন—বায়োপসির পর চিকিৎসকের কথাতেই বিষয়টি বুঝে গিয়েছিলেন আবুল হায়াত। তার আগে অবশ্য আশার জায়গাটুকু ছিল। চিকিৎসক সন্দেহ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বায়োপসির রিপোর্টই নিশ্চিত করে কঠিন বাস্তবতাকে। সেই মুহূর্তে তাঁর পাশে ছিলেন স্ত্রী শিরিন হায়াত, সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা।
ক্যানসার শব্দটি শুনলেই যে ভয় তৈরি হয়, সেটি স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি আবুল হায়াত। তিনি জানিয়েছেন, খবরটি শোনার পর মন খারাপ হয়েছিল, চুপচাপ ছিলেন। খুব বেশি কথা বলতেন না। কিন্তু পরিবার তাঁকে একা হতে দেয়নি।
সবাই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছে। তাঁকে বোঝানো হয়েছে—এটি চিকিৎসাযোগ্য, চিকিৎসা হবে, সবাই তাঁর পাশে আছে। চিকিৎসকরাও তাঁকে সাহস দিয়েছেন। আর সেই সাহসই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল তাঁর লড়াইয়ের অন্যতম শক্তি।
ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের কথা শুনলে অনেকের প্রথম চিন্তা হয়—বিদেশে যেতে হবে। কিন্তু আবুল হায়াতের ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয়েছে বাংলাদেশেই। ইউরোলজিস্টের পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন অনকোলজিস্টও। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা।
তবে শুধু ওষুধ কিংবা চিকিৎসাই নয়, এই যাত্রায় তাঁর মানসিক শক্তিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চিকিৎসক তাঁকে বলেছিলেন—ইতিবাচক থাকতে হবে, সক্রিয় থাকতে হবে, প্রতিদিন ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে এবং ইতিবাচক কাজ করতে হবে। এই কথাগুলোই যেন আবুল হায়াতের ক্যানসার-যুদ্ধের মন্ত্র হয়ে উঠেছিল।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইকে পরিবারের ছোট্ট একটি উদ্যোগ যেন আরও অর্থবহ করে তুলেছিল। চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁর নাতি-নাতনিরা কাগজ দিয়ে প্লাস চিহ্ন কেটে বাড়ির দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছিল। পুরো বাড়ি হয়ে উঠেছিল ‘প্লাস প্লাস’—ইতিবাচকতার প্রতীক। হাসপাতালের বিছানা থেকে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার এই সময়টাতে পরিবারের ভালোবাসা তাঁকে যে কতটা শক্তি দিয়েছিল, তাঁর কথাতেই তার ইঙ্গিত মেলে। অসুস্থতার মাঝেও জীবন থামেনি তার।
আবুল হায়াত বরাবরই কাজকে জীবনের আনন্দের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। অভিনয়, নাট্যচর্চা, লেখা কিংবা নির্মাণ—দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর অভিনয়জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৯ সালে টেলিভিশনে; পরে মঞ্চ ও চলচ্চিত্রেও তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত মুখ। একুশে পদকসহ পেয়েছেন বহু সম্মাননা। ক্যানসারের অভিজ্ঞতাও যেন তাঁর জীবনদর্শনকে আরও গভীর করেছে।
তিনি বলেছেন, জীবন সুন্দর। জীবন হলো কাজ করার জায়গা, আনন্দ করার জায়গা। এই উপলব্ধি হয়তো একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত দর্শন, কিন্তু ক্যানসারের মতো কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে সাহসের একটি বার্তা।