সন্তান সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে, জানেন তো?

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬

সন্তান সোশ্যাল মিডিয়ায় কী করছে, জানেন তো?

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইউনিসেফের "Through Children’s Eyes: How Digital Technologies Enable Child Sexual Abuse" শিরোনামে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ২১টি দেশের ১২–১৭ বছর বয়সী প্রায় ২১ হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে সংস্থাটি অনুমান করেছে, এক বছরে প্রায় ২ কোটি শিশু ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্তত এক ধরনের যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অর্থাৎ, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশুদের প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন। এসব নির্যাতনের অর্ধেকেরও বেশি ঘটেছে শিশুদের প্রতিদিনের ব্যবহৃত মূলধারার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেড় কোটিরও বেশি শিশু তাদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হয়েছে। 


এবার আরেকটি পরিসংখ্যান দেখা যাক


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৪ সালের এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ১১, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, সমস্যাজনক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের হার ২০১৮ সালের ৭ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ১১ জনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।


ভিন্ন দুটি বিষয়ে করা গবেষণার এই পরিসংখ্যান আমাদের শিশু-কিশোরদের ডিজিটাল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক সামনে আনে, যা সত্যিই খুব উদ্বেগজনক।


রাত প্রায় এগারোটা। ঘর নিস্তব্ধ। মা ভাবলেন, ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে। দরজা ফাঁক করে দেখলেন—ঘরের আলো নিভে গেছে, কিন্তু ছোট্ট মুখে ফোনের নীল আলো নাচছে। সে হাসছে, কখনো চুপ, কখনো দ্রুত স্ক্রল করছে। মা কাছে গিয়ে কী দেখছে জানতে চাইলে, ছেলে জানায় কিছু না।


মা আর তেমন কিছু না বলে ঘুমিয়ে পড়তে বললেন। কিন্তু সেই “কিছু না” কথাটা মায়ের বুকে পাথর হয়ে বসল। সন্তানের ঘরে কী হচ্ছে, পড়াশোনায় কেমন করছে; সবই তিনি জানেন। কিন্তু ফোনের পর্দার ওপারে কী ঘটছে, সেটা কি তিনি সত্যিই জানেন? কারন এই “কিছু না”-এর ভেতরেই থাকতে পারে অচেনা বন্ধু, অদ্ভুত চ্যালেঞ্জ, কৌতূহল, ভয়, তুলনা, আর না-বলা এক বিশাল জগৎ। 


তাই সন্তানের হাতে কতক্ষণ স্মার্টফোন থাকছে, শুধু সেই হিসাব রাখাই কি যথেষ্ট? এক্ষেত্রে এখন প্রশ্নটা আরও বড়—সেই ফোনের পর্দার ওপারে সে কী দেখছে, অনলাইনে থাকাকালে আসলে কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সেসব অভিজ্ঞতা তার ওপর কেমন প্রভাব ফেলছে?


ফোনের পর্দার ওপারে সন্তানের যে জগৎ


ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে শিশুদের কাছে স্ক্রিন কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি শেখার জায়গা, খেলার সঙ্গী এবং বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শিশুর জ্ঞান অর্জন, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও ডিজিটাল সক্ষমতা বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।  আধুনিক শিক্ষা ও ই-লার্নিং, তথ্য ও জ্ঞানের সহজলভ্যতা, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীর জন্য প্রস্তুতি, ক্রিয়েটিভিটি ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে ডিজিটাল জগতের ইতিবাচক দিক উপেক্ষা করার অবকাশ নেই।  


কিন্তু এই জগতের আরেকটি দিকও রয়েছে। নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কথা মনে আছে তো? প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অবশ্য ডিজিটাল জগতের প্রভাব পদার্থবিজ্ঞানের এই সূত্র মেনে চলে না। তবু রূপক অর্থে বলা যায়, প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু ঝুঁকিও। যে পর্দা শিশুকে নতুন জ্ঞান ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে, সেই পর্দার ওপারেই রয়েছে অনেক জটিলতা। 


সেখানে হতে পারে সাইবার বুলিং ও অনলাইন হয়রানি। অনলাইন গেমিং বা  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুরা অনেক সময় কটূক্তি বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। অজান্তেই তারা বয়স-অনুপযোগী সহিংস বা যৌন কনটেন্টের মুখোমুখি হতে পারে। আবার কেউ কেউ ভুয়া পরিচয়ে গেম বা চ্যাট রুমে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। ধীরে ধীরে আস্থা অর্জন করে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও চাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। ফলে শিশু অনলাইন প্রতারণা, শোষণ কিংবা ব্ল্যাকমেইলের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


শুধু কি তাই, ডিজিটাল জগতের আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো স্ক্রিন ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। কিছু প্ল্যাটফর্মে একের পর এক ভিডিও দেখার সুযোগ, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখতে পারে। সব শিশুর ক্ষেত্রে এমনটা না ঘটলেও, কারও কারও জন্য ব্যবহার সীমিত করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা ও দৈনন্দিন কাজের সময় কমে গেলে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাও প্রভাবিত হতে পারে।


এর পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক তুলনা ও অনলাইনে জনপ্রিয় হওয়ার চাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক, কমেন্ট, ভিউ এবং ফলোয়ারের সংখ্যা এখন অনেক কিশোর-কিশোরীর কাছে নিজের যোগ্যতা পরিমাপের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কৈশোরে অন্যের মতামত, স্বীকৃতি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় একটি নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করাও কারও কারও মধ্যে হতাশা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি বা নিজের চেহারা নিয়ে অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে। তবে এসব প্রভাব ব্যক্তি, ব্যবহারের ধরন ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। 



সন্তান কি সব কথা বাবা-মাকে বলতে পারে?


সব সন্তান সব কথা মা-বাবাকে বলতে পারে না। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী তাদের জীবনের অনেক বড় বড় ঘটনা, ভয় বা ভুল মা-বাবার কাছ থেকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রাখে। এর পেছনে থাকতে পারে নানাবিধ কারণ-


- "এটি শুনলে মা-বাবা বকা দেবেন বা মারবেন"—এই ভয়টি শিশুদের মনে সবচেয়ে বেশি কাজ করে। কোনো ভুল করে ফেললে তারা সেটি নিজে নিজে সামলানোর চেষ্টা করে, যা অনেক সময় বিপদ আরও বাড়িয়ে দেয়।


- জেনারেশন গ্যাপের বিষয়টিও এতে কাজ করে। সন্তান মনে করতে পারে যে তার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বা আবেগ মা-বাবা বুঝতে পারবেন না কিংবা তাকেই দোষী ভাববেন। এতে করে তারা অনেক ব্যাপার আড়াল করে রাখে।


- বাবা-মা যেমন সন্তানকে অকৃত্রিম ভালবাসেন, তেমনি অনেক সন্তান মা-বাবাকে ভীষণ ভালোবাসে এবং তাদের চোখে নিজেদের 'ভালো সন্তান' ইমেজটি ধরে রাখতে চায়। তারা মনে করে কোনো দুর্বলতা বা ব্যর্থতার কথা প্রকাশ করলে মা-বাবা কষ্ট পাবেন বা হতাশ হবেন।


- বিশেষ করে টিনএজার বা বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েরা নিজেদের একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে দেখতে শুরু করে। এসময় তারা নিজেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে চায়। তাই তাদের সব চিন্তা বা অনুভূতি মা-বাবার সাথে শেয়ার করাকে তাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে করতে পারে।



“ফোনটা দাও, দেখি”—এটাই কি সমাধান?


সন্তানের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উদ্বিগ্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। আর এই শংকা থেকেই অভিভাবকের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয়—ফোন কেড়ে নেওয়া, পাসওয়ার্ড চাওয়া বা গোপনে তার চ্যাট দেখা। 


কখনো কখনো পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিভাবকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি পরিস্থিতিতে যদি নজরদারিকেই একমাত্র সমাধান মনে করা হয়, তাহলে হয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে।


সন্তানের ফোনের ওপারে কী জগৎ রয়েছে তা জানার কৌতুহল অভিভাবক হিসেবে থাকতে পারে। তবে ফোন কেড়ে নেয়া বা চেক করা সন্তানের সাথে আপনার দূরত্বের দেয়াল আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সন্তান যখন দেখে মা-বাবা তার ফোন চেক করছেন, তখন সে ধরে নেয় যে আপনারা তাকে বিশ্বাস করেন না। এতে পারিবারিক সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই আচরণ তাদের জেদি ও বিদ্রোহী করে তোলে। 


শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে গোপনীয়তা বা লুকোচুরি করার স্বভাবটাও বেড়ে যাবে। বর্তমান যুগের সন্তানেরা প্রযুক্তিতে অনেক দক্ষ। আপনি জোর করে ফোন চেক করলে তারা ব্রাউজিং হিস্ট্রি ডিলিট করা, পাসওয়ার্ড বদলে ফেলা, সিক্রেট ফোল্ডার ব্যবহার করা বা অল্টারনেটিভ অ্যাকাউন্ট খোলার মতো পথ বেছে নেবে।


তাহলে সঠিক সমাধান কি?


নজরদারি বা জোর করে কন্ট্রোল করা নয়, শুরুটা হতে পারে কথোপকথন দিয়ে। “আজ ফোনে কী দেখলে?”—এর বদলে জিজ্ঞেস করা যায়, "তোমার ফিডে আজ সবচেয়ে মজার কী দেখলে?” “আজ অনলাইনে এমন কিছু দেখেছ, যেটা তোমার ভালো লাগেনি?” অর্থাৎ কৌতুহল নয়, আগ্রহ দেখান। এভাবে কথা শুরু করলে, সেও সব খুলে বলবে। 


উন্মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। তাকে কথাচ্ছলে বোঝান যে ইন্টারনেট জগৎটি যেমন মজার, তেমনি সেখানে অনেক কিছুর ঝুঁকিও থাকে। অনেক অপরিচিত মানুষ ও অনাকাঙ্ক্ষিত লিংক থাকে। তাই অচেনা কোন লিংকে ক্লিক না করা এবং অনলাইনে পরিচিত হওয়া আর বাস্তবে কাউকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে চেনা এক বিষয় নয়- ব্যাপারগুলো বোঝাতে হবে। এর পরেও কোনো সমস্যা বা অদ্ভুত কিছুর মুখোমুখি হলে সে যেন ভয় না পেয়ে প্রথমেই আপনাকে জানাতে পারে, সেই ভরসা দিন।


সন্তানকে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে রাখা সব পরিবারের পক্ষে সম্ভবও নয়, সবসময় প্রয়োজনীয়ও নয়। তার পরিবর্তে ডিজিটাল সীমারেখা করে দেয়া যায়। ঘুমের সময় ফোন নয়, পড়াশোনা বা খাবারের সময় ফোন নয়। ব্যক্তিগত তথ্য অপরিচিত কারও সঙ্গে নয়, অস্বস্তিকর কিছু দেখলে বা কেউ বিরক্ত করলে সঙ্গে সঙ্গে জানাতে হবে, কাউকে ছবি বা ভিডিও পাঠানোর আগে ভাবতে হবে সেটি পরে কোথায় যেতে পারে। নিয়মটি কেবল সন্তানের জন্য নয়, পরিবারের সবার জন্য প্রযোজ্য করুন।


ভুল করলে শাস্তি নয়, আশ্রয় দিন। সে যদি ভুল করে ফেলে, তাকে বকা দিলে সে ব্যাপারগুলো আরো লুকাবে। ভালোবাসা দিলে সে আপনার কাছেই ফিরে আসবে।


সন্তানরা অনুকরণপ্রিয়। শুধু তাদের মানা করে, আপনি যদি সারাক্ষণ ফোনে থাকেন তবে সেই নিষেধ কাজ করবে না। তাই নিজের স্ক্রিন টাইমও লিমিট করুন। তার পরিবর্তে অফলাইন জীবন সমৃদ্ধ করুন। খেলা, বই, বন্ধু, পরিবার, প্রকৃতি—এগুলো যত সমৃদ্ধ হবে, অনলাইনের অন্ধকার তত কম প্রভাব ফেলবে।


শুধু সন্তানকে নয়, অ্যালগরিদমকেও বুঝুন


ডিজিটাল যুগে নিরাপদ প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় সত্য এটাই; শুধু সন্তানকে শাসন বা নজরদারি করলেই হবে না, পর্দার আড়ালে থাকা এই নাটের গুরু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদমকেও বুঝতে হবে। ইউটিউব, টিকটক বা ফেসবুকের অ্যালগরিদম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে ব্যবহারকারী দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে থাকে। কেউ একটি ভিডিওতে কয়েক সেকেন্ড বেশি তাকালেই অ্যালগরিদম বুঝে নেয় তার পছন্দ। এরপর অবিকল একই ধরনের ভিডিও একটার পর একটা সামনে আনতে থাকে। একে বলে 'র‍্যাবিট হোল', যা শিশুর মগজে ভালো লাগার হরমোন (Dopamine) নিঃসরণ করে আসক্তি তৈরি করে।


সন্তান ইন্টারনেটে কী খুঁজছে, কোন গেমে কত সময় দিচ্ছে—এই সব ডেটা বা তথ্য অ্যালগরিদম ট্র্যাক করে। এরপর সেই অনুযায়ী তার সামনে চটকদার বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট সাজিয়ে দেওয়া হয়, যা তার অবচেতন মনকে প্রভাবিত করে।


এই অ্যালগরিদমকে টেক্কা দিতে মা-বাবাকে 'ডিজিটাল লিটারেসি' বা প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়াতে হবে। ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো অ্যাপগুলোতে 'প্যারেন্টাল কন্ট্রোল' ও 'রেস্ট্রিক্টেড মোড' চালু রাখুন। এতে ক্ষতিকর কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিল্টার হয়ে যাবে।


ভিডিও শেষ হওয়ার পর আরেকটি ভিডিও নিজে নিজে চালু হওয়ার অপশনটি বন্ধ করে দিন। অ্যালগরিদম এই ফিচারের মাধ্যমে বাচ্চাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে আটকে রাখে। অটো প্লে অফ থাকলে শিশুর স্ক্রিন থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।


সন্তানের ব্যবহৃত ডিভাইসের সার্চ ও ওয়াচ হিস্ট্রি নিয়মিত পরিষ্কার (Clear) করুন। এতে অ্যালগরিদম তাদের পছন্দের প্যাটার্ন ভুলে নতুন করে কনটেন্ট সাজাবে, ফলে একটানা আসক্তি কমবে।


এগুলো ছাড়াও, আরেকটি কাজ করা যায়।  সন্তানকে কীভাবে অনলাইনে সচেতনভাবে কনটেন্ট বেছে নিতে হয়, সেটিও শেখানো যেতে পারে। 


ডিজিটাল প্যারেন্টিং-এর আসল জায়গাটা কোথায়?


ডিজিটাল প্যারেন্টিং-এর আসল জায়গাটা কোনো অ্যাপ, সফটওয়্যার বা প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই; এর আসল ভিত্তি হলো মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যকার শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক এবং খোলামেলা যোগাযোগ। প্রযুক্তির যুগে শুধু ডিভাইস লক বা ট্র্যাক করে সন্তানকে ধরে রাখা অসম্ভব, তাই মূল কাজটি করতে হয় সন্তানের মন ও চিন্তাভাবনার জায়গায়। তাকে এমনভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব, যাতে সে জানে-


কিভাবে প্রাইভেসি মেইনটেইন করে রাখতে হয়, কোন অনলাইন যোগাযোগ বিপজ্জনক হতে পারে, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে কেন ভাবতে হয়, ব্লক বা রিপোর্ট কাউকে কখন বা কিভাবে করতে হয়, কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটলে কোথায় সাহায্য চাইতে হয়।


কারণ আজকের পৃথিবীতে সন্তানকে হাত ধরে শুধু রাস্তা পার করিয়ে দেওয়ার নিরাপত্তা শেখালেই হবে না; তাকে দেখে-শুনে, নিজের ভেতরের বুদ্ধি খাটিয়ে ডিজিটাল রাস্তায় চলার নিরাপত্তাও শিখতে হবে।


সন্তানের হাতে থাকা ফোনটি আকারে হয়তো মাত্র কয়েক ইঞ্চির। কিন্তু তার ভেতরেই আছে বিশাল এক অজানা পৃথিবী। একসময় ‘ব্লু হোয়েল’ নিয়ে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল নানা ভয়ংকর দাবি—কিশোর-কিশোরীরা নাকি একটি অনলাইন গেমের নানা ‘চ্যালেঞ্জ’ অনুসরণ করতে গিয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ছে। যদিও অনেকগুলো দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।


কিন্তু ব্লু হোয়েল-কে ঘিরে তৈরি হওয়া আতঙ্ক অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে এনেছিল, শিশু-কিশোররা কতক্ষণ অনলাইনে আছে  তা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ ; কিন্তু সে অনলাইনে কী দেখছে, কী শিখছে, কার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এবং সেই অভিজ্ঞতা তাকে কেমন মানুষ করে তুলছে—প্রশ্নটা তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। 

sidebar ad