কর্মজীবী বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি


কর্মজীবী মা-বাবা একইসঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব এবং সন্তানের যত্ন ও লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত কাজ, সন্তানের যত্ন, ঘরের কাজ এবং নিজের প্রয়োজন—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো অনেক সময় প্যারেন্টের জন্য কঠিন হয়ে যায়। এর ফলে তারা মানসিক চাপ, ক্লান্তি, অপরাধবোধ এবং নিজের জন্য সময় না পাওয়ার মতো সমস্যার সম্মুখীন হোন।


কর্মজীবী প্যারেন্ট হওয়ার কিছু ভালো দিকও আছে। প্যারেন্ট কর্মজীবী হলে আর্থিক সচ্ছলতা, সন্তানকে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো, বয়স অনুযায়ী সন্তানের বিকাশে ব্যয় করতে পারাসহ নানাবিধ সুবিধা পাওয়া যায়। কর্মজীবী প্যারেন্টের সন্তানরা দায়িত্বশীলতা, স্বনির্ভরতা, পরিশ্রম ও কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ শিখতে পারে। একজন ভালো প্যারেন্ট হওয়ার জন্য সবসময় সন্তানের পাশে থাকা জরুরি নয়। বরং সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটানো, নিয়মিত ও ইতিবাচকভাবে দায়িত্ব পালন করা, পরিবারের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং নিজের মানসিক সুস্থতার যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।


কর্মজীবী প্যারেন্ট হওয়ার ইতিবাচক দিক বাসুবিধা-


সন্তানরা স্বাবলম্বী হয়: কর্মজীবী প্যারেন্টদের সন্তানরা নিজের কাজ নিজে করতে শেখে এবং অল্প বয়সেই দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।




দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা পায়: সন্তানরা নানা অভিজ্ঞতার কারনে বুঝতে শেখে, বড়দের জীবনে বিভিন্ন ধরণের কাজ এবং দায়িত্ব থাকে যা সময় অনুযায়ী করতে হয়।


নিজের পরিচয় ও আত্মতৃপ্তি: বাবা-মা তাদের কর্মজীবনে নিজস্ব পরিচয় ধরে রাখতে পারেন এবং মানসিক তৃপ্তি পান। যা ইতিবাচকভাবে সন্তানকে প্রভাবিত করে। সন্তান আত্মবিশ্বাসী হয়।


আর্থিক সচ্ছলতা: আয় বেশি হওয়ায় সন্তানরা নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায়; যেমন, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, ভালো চিকিৎসা, বয়স উপযোগী খেলনা বা এডুকেশনাল ম্যাটেরিয়াল ইত্যাদি।


রোল মডেল হওয়া: কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সন্তানদের সামনে কঠোর পরিশ্রম, কাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং দায়িত্বশীলতা মেনে চলার আদর্শ উদাহরণ তৈরি করে।


কর্মজীবী বাবা-মায়েরা সাধারণত যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হোন: সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারা: দিনের বেশ কিছুটা সময় বাসার বাইরে থাকা এবং কর্মজীবন ও ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকার কারনে অনেক মা- বাবা সন্তানদের সাথে ভালো বা কোয়ালিটি সময় কাটাতে পারে না।




অপরাধবোধ: সন্তানকে একা বা দূরে রেখে আসার কারণে মনে সারাক্ষণ খারাপ লাগা বা অপরাধবোধ তৈরি হয়। সন্তানের সামান্য অসুবিধায় অনেক কর্মজীবী মায়েরা নিজেদের বাইরে থাকাকে দায়ী করে।


কাজ ও পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব: অফিসের কাজ এবং পরিবারের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হোন।


ক্লান্তি এবং ধৈর্য কমে যাওয়া: সারাদিন বাইরের কাজ থেকে আসার পর, বাসার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করার পর প্যারেন্টরা শারীরিক ক্লান্তি অনুভব করে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে। অফিসের দায়িত্ব ও পরিবারের দায়িত্ব একসাথে পালন করতে কর্মজীবী প্যারেন্টরা মানসিক চাপে থাকে।


দৈনন্দিন কাজ সামলানো কঠিন হয়ে যায়: রুটিন মেনে চলা, সন্তানের পড়ালেখা, পরিবারের খাবার এবং নিজের ঘুমানোর সময় ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়া।


একেকজনের একেক রকম নিয়ম: বাচ্চার দেখাশোনা করা একেকজন মানুষের (যেমন: নানি-দাদি, ন্যানি বা গৃহকর্মী) নিয়ম একেক রকম হওয়ায় অনেক সময় নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম মেনে চললে সন্তানও দ্বিধায় থাকে কার নিয়ম অনুসরণ করবে।


নিজের জন্য সময় না থাকা: শত ব্যস্ততার মাঝে কর্মজীবী প্যারেন্টরা নিজেদের যত্ন নেওয়ার বা জীবনসঙ্গীর সাথে আলাদা করে সময় কাটানোর সুযোগ কম পায়।


সন্তানের উপরে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রভাব: কর্মজীবী বাবা-মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তারা যখন দিনের একটা লম্বা সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকেন, ঠিক তখনই বাসায় টিনএজার সন্তানরা একা একা সোশ্যাল মিডিয়ার জালে জড়িয়ে পড়ে বা ভুল সঙ্গের দিকে পা বাড়ায়।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (সোশ্যাল মিডিয়া) বর্তমান যুগে শিশুদের, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের (টিনএজার) জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়া টিনএজারদের মানসিক বিকাশ এবং আচরণের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


লাইক ও কমেন্টের আসক্তি (ডোপামিন লুপ): সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো ছবি বা পোস্ট করার পর যখন লাইক বা কমেন্ট আসে, তখন মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামের একটি হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সাময়িক আনন্দ দেয়। কিশোর-কিশোরীরা এই আনন্দের নেশায় বুঁদ হয়ে যায় এবং সারাক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে।


অন্যের সাথে তুলনা ও হীনম্মন্যতা: সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই তাদের জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো বা সুন্দর করে সাজানো ছবি শেয়ার করে। এগুলো দেখে টিনএজাররা নিজেদের রূপ, গায়ের রঙ, পোশাক বা পারিবারিক সচ্ছলতাকে অন্যের সাথে তুলনা করতে শুরু করে এবং তীব্র হীনম্মন্যতা বা হতাশায় ভোগে।


সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হেনস্থা: ইন্টারনেটে একে অপরকে ট্রল করা, কুৎসিত মন্তব্য করা বা ব্যক্তিগত ছবি-তথ্য নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা এখন খুব সাধারণ। এই সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে অনেক শিশু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।


ঘুমের ব্যাঘাত ও মনোযোগের অভাব: গভীর রাত পর্যন্ত স্ক্রল করার কারণে ঘুমের সাইকেল নষ্ট হয়। পর্যাপ্ত ঘুম হয় না। এর ফলে দিনের বেলা পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায় এবং মেজাজ সারাক্ষণ খিটখিটে থাকে।


সোশ্যাল ভ্যালিডেশন বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাই গ্যাং ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার মূল কারণ: মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, টিনএজারদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো "সমবয়সীদের গ্রুপে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া"। এই বয়সে তারা বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুদের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সমবয়সীদের কাছ থেকে বাহবা বা 'সোশ্যাল ভ্যালিডেশন' পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাই তাদের অনেক সময় গ্যাং বা অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।


হিরোইজম বা বীরত্ব দেখানোর সস্তা চেষ্টা: কিশোর গ্যাংগুলোর ভেতরের নিয়ম হলো—যে যত বেশি আইন ভাঙতে পারবে, মারামারি করতে পারবে বা দামি বাইক নিয়ে বিপজ্জনক স্টান্ট করতে পারবে, গ্রুপে তার সম্মান তত বেশি হবে। এই সস্তা "হিরো" সাজতে গিয়ে তারা বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।


লাইক-ভিউসের জন্য অপরাধের ভিডিও শেয়ার: আজকাল কিশোর গ্যাংগুলো তাদের মারামারি, টিকটক বা রিলস ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে। যখন সেই ভিডিওতে হাজার হাজার ভিউ এবং "ভাই", "বস" বলে কমেন্ট আসে, তখন তাদের মস্তিষ্ক এটিকে 'স্বীকৃতি' বা বাহবা হিসেবে ধরে নেয়। এই ভিউ ও লাইকের লোভ তাদের আরও বড় অপরাধ করতে উস্কানি দেয়।


ফলোয়ারদের সামনে ক্ষমতা প্রদর্শন: সোশ্যাল মিডিয়ায় শক্তিশালী বা ক্ষমতাশালী হিসেবে নিজেকে জাহির করার একটা নোংরা প্রতিযোগিতা চলে। গ্রুপিং করা বা নিজেদের গ্যাং-এর শক্তি প্রদর্শন করার মাধ্যমে তারা নিজেদের এক ধরণের কাল্পনিক "ডন" মনে করতে শুরু করে।


একাকীত্ব ও একাত্মতার অভাব: যে সন্তানরা পরিবারে অবহেলিত হয় বা বাবা-মায়ের সাথে যাদের দূরত্ব বেশি, তারা একাকীত্ব দূর করতে ইন্টারনেটে বা বাস্তবে এই ধরণের গ্যাং-এর সাথে জড়িয়ে পড়ে। কারণ এই গ্রুপগুলো তাকে একটা "মিথ্যা আপন অনুভূতি" দেয়।


কিভাবে কর্মজীবী প্যারেন্টরা এই পরিস্থিতি থেকে সন্তানকে বাঁচাতে পারবে (বাবা-মায়ের করণীয়):


১. ডিজিটাল নজরদারি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার: যেহেতু কর্মজীবী প্যারেন্টরা দিন বড় একটা সময় কর্মক্ষেত্রে থাকেন, তাই প্রযুক্তির সাহায্য নিয়েই সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সন্তানের ফোনে গুগল ফ্যামিলি লিংক বা এপেল ফ্যামিলি শেয়ারিং-এর মতো অ্যাপ ব্যবহার করুন। এর মাধ্যমে আপনি অফিসে বসেই দেখতে পারবেন সন্তান কোন অ্যাপে কতক্ষণ সময় কাটাচ্ছে এবং ক্ষতিকর কোনো সাইট বা অ্যাপ লক করে দিতে পারবেন।


২. ওয়াই-ফাই রাউটার নিয়ন্ত্রণ: আজকাল আধুনিক রাউটারগুলোতে দূর থেকে অ্যাপের মাধ্যমে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আপনার অফিসের সময় বা সন্তানের পড়ার সময়ে নির্দিষ্ট কিছু ডিভাইসের ইন্টারনেট কানেকশন বন্ধ বা সীমিত করে রাখুন।


৩. সোশ্যাল মিডিয়ার বিকল্প দিন: সন্তানকে শুধু মোবাইল থেকে দূরে থাকতে বললে কাজ হবে না। তাকে এমন কোনো কাজে ব্যস্ত রাখুন যেখানে সে বাস্তব জীবনের মানুষের কাছ থেকে বাহবা পেতে পারে। যেমন: খেলাধুলা, গান-বাজনা, ছবি আঁকা, স্কাউটিং বা মার্শাল আর্ট। এই ক্ষেত্রগুলোতে ভালো করলে যখন সে প্রশংসা পাবে, তখন তার মোবাইলের লাইকের প্রতি লোভ কমে যাবে।


৪. ঘরের ভেতরেই বা পারিবারিক পরিবেশে 'গ্রহণযোগ্যতা দিন' বা প্রশংসা করুন: সন্তানকে ঘরের ভেতরে গুরুত্ব দিন। সে কোনো ভালো কাজ করলে প্রাণখুলে প্রশংসা করুন। সে যখন জানবে যে তার বাবা-মা তাকে ভালোবাসে এবং তার ছোট ছোট অর্জনেও গর্ববোধ করে, তখন সে বাইরের সস্তা গ্যাং বা সোশ্যাল মিডিয়ার লাইকের পেছনে ছুটবে না। পারিবারিক অনুষ্ঠানে বা সন্তানের পছন্দের মানুষদের সামনে তার প্রশংসা করুন।


৫. বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ ও নজরদারি: আপনার সন্তানের বন্ধু কারা, সে কার সাথে মিশছে, কার সাথে আড্ডা দিচ্ছে সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা রাখুন। মাঝেমধ্যে তার বন্ধুদের আপনার বাসায় দাওয়াত দিন, তাদের সাথে কথা বলুন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন সন্তান কোনো ভুল পথে যাচ্ছে কি না।


৬. স্ক্রিন টাইমের নিয়ম ও ডিজিটাল ডিটক্স: বাসায় একটি নিয়ম তৈরি করুন—যেমন রাতে খাবার টেবিলে কেউ ফোন ব্যবহার করবে না এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ফোন ড্রয়িংরুমে জমা থাকবে। সন্তানকে একা রুমে দীর্ঘ সময় ফোনসহ লকডাউন হয়ে থাকতে দেবেন না।




৭. সহমর্মিতার সাথে কথা বলুন, জেরা করবেন না: কিশোর বয়সের এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনগুলো সামলানো কঠিন, তবে সঠিক সময়ে ভালোবাসা এবং সঠিক গাইডেন্স পেলে যেকোনো সন্তানকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।


ঢাকা/টিএ 

sidebar ad