সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) চ্যাটবট—তথ্য জানার নতুন দুনিয়া খুলে দিয়েছে তরুণদের সামনে। কিন্তু এই দুনিয়ায় খবর খোঁজা, মত প্রকাশ ও নিজের পরিচয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে নারীরা কি সমান নিরাপদ? অনলাইন হয়রানি, নারীবিদ্বেষ, বিকৃত ছবি ও মিথ্যা তথ্যের বিস্তার সেই প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলছে।
একটি খবর জানার জন্য এখন আর সংবাদপত্রের পাতা ওলটানো কিংবা টেলিভিশনের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েকটি ক্লিক, একটি ভিডিও কিংবা এআই চ্যাটবটকে করা একটি প্রশ্নেই মিলছে নানা ঘটনার বিবরণ। তরুণ প্রজন্মের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাসে এই পরিবর্তন এখন বিশ্বজুড়ে স্পষ্ট।
রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৫২ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও নেটওয়ার্ক ও এআই চ্যাটবটকে খবর জানার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন। ৪৮টি বাজারে প্রায় এক লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ক্রমবর্ধমান প্রভাব উঠে এসেছে।
তবে এই ৫২ শতাংশের পরিসংখ্যান নারী ও পুরুষের আলাদা হিসাব নয়। এটি তরুণদের সামগ্রিক প্রবণতা নির্দেশ করে। নারীদের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে সংবাদ পাওয়ার সুযোগের পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং অনলাইন সহিংসতার বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
ডিজিটাল জগতে নারীর প্রবেশ, সঙ্গে নতুন ঝুঁকি
সামাজিক মাধ্যম নারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একজন নারী শিক্ষার্থী এখান থেকে শিক্ষার সুযোগ সম্পর্কে জানতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা নিজের পণ্যের প্রচার করতে পারেন, আর একজন নারী সাংবাদিক বা অধিকারকর্মী নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে।
কিন্তু এই একই পরিসর নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমও হয়ে উঠতে পারে। কোনো নারী সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে মত প্রকাশ করলে তাঁর বক্তব্যের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে অনেক সময় তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, হুমকি কিংবা চরিত্রহননের মুখে পড়তে হয়। কারও ছবি অনুমতি ছাড়া ব্যবহার, বিকৃত ছবি তৈরি, ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং এআই দিয়ে ভুয়া যৌন ছবি বা ভিডিও বানানোও এই সমস্যার অংশ।
জাতিসংঘের নারী সংস্থা (ইউএন উইমেন) বলছে, প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত সহিংসতা নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং জনপরিসরে অংশগ্রহণের অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এআইয়ের অপব্যবহার এই ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ফলে ডিজিটাল জগতে নারীর উপস্থিতি বাড়লেই যে তাঁর স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হবে, এমন নয়। তিনি কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারছেন, তাঁর বক্তব্য কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে এবং হয়রানির শিকার হলে প্রতিকার পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের নারীরা কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন?
বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানির বিষয়টি কেবল আশঙ্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক তথ্যেও এর প্রতিফলন রয়েছে।
ইউএন উইমেনের বাংলাদেশবিষয়ক ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে একটি অপ্রকাশিত গবেষণার ফল উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ও পরবর্তী সময়ে সামাজিক মাধ্যমে স্পষ্ট যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা হুমকিমূলক বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ৬৬ শতাংশ নারী অংশগ্রহণকারী। এই তথ্য নির্দিষ্ট একটি গবেষণার অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে; একে বাংলাদেশের সব নারীর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় হার হিসেবে দেখা উচিত নয়।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপে প্রযুক্তির মাধ্যমে সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশ কার্যালয়ের ২০২৬ সালের একটি প্রকাশনা অনুযায়ী, জাতীয় জরিপে পাঁচ শতাংশের বেশি নারী এ ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে হারটি প্রায় ছয়জনের একজন।
এই দুটি তথ্যের গবেষণার ধরন, নমুনা ও সংজ্ঞা এক নয়। তাই এগুলোকে সরাসরি তুলনা করা যাবে না। তবে উভয় তথ্যই দেখায়, ডিজিটাল পরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।