ঘুম শুধু নারীর বেলাতেই কী বিলাসিতা?

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ঘুমকে আমরা অনেক সময় বিলাসিতা মনে করি। মনে করি, কাজ শেষ হলে, দায়িত্ব শেষ হলে, সময় পেলে ঘুমাব। বিশেষ করে একজন নারী সংসার, সন্তান, চাকরি, পড়াশোনা, পরিবার—সবকিছু সামলাতে গিয়ে নিজের ঘুমকেই সবার আগে বিসর্জন দেন। অথচ সত্যিটা হলো, ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শরীর ও মস্তিষ্কের মৌলিক প্রয়োজন।


ঘুমের ইতিবাচক দিক


পর্যাপ্ত ঘুম শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্ককে পুনরায় সতেজ হতে সাহায্য করে। ভালো ঘুম হলে মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও কাজের দক্ষতা ভালো থাকে।


শরীরও দৈনন্দিন চাপ থেকে কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়। পর্যাপ্ত ঘুম আমাদের মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে। ফলে অল্পতেই বিরক্ত হওয়া, রাগ, অস্থিরতা বা মানসিক ক্লান্তি কিছুটা কমতে পারে।


একজন মা, কর্মজীবী নারী কিংবা শিক্ষার্থী—সবার ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত ঘুম পরের দিনের কাজকে সহজ করে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া স্বার্থপরতা নয়; বরং এটি নিজের যত্ন নেওয়ার একটি অংশ।


ঘুম কম হলে নেতিবাচক দিক


অন্যদিকে, নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে শরীর ও মন—দুটোর ওপরই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সারাদিন ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ এবং কাজের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে।


দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। মানসিক চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যায় এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট সমস্যাগুলোও অনেক বড় মনে হতে পারে। একজন পুরুষ রাতে ৭–৮ ঘণ্টা ঘুমালে বলা হয়, শরীরের জন্য ভালো, বিশ্রাম দরকার।


কিন্তু একজন নারী একটু বেশি ঘুমালে প্রশ্ন আসে—


“এত ঘুমাও কেন?”


“ঘরের কাজ করবে কখন?”


“বাচ্চাদের দেখবে কে?”


“সংসারের দায়িত্ব কি শেষ?”


কিন্তু কেন এতো প্রশ্ন?


নারীর শরীর কী বিশ্রাম চায় না?


নারীর কী ক্লান্তি হয় না?


নারীর মস্তিষ্ক কী সারাদিন কাজ করে না?


একজন নারী সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্না করেন, সন্তানকে প্রস্তুত করেন, ঘর সামলান, অফিস করেন বা পড়াশোনা করেন, পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করেন এবং মানসিকভাবেও সবার পাশে থাকেন। অথচ দিনের শেষে তার নিজের ঘুমের সময়টুকুও অনেক সময় অন্যের প্রয়োজন মেটাতে চলে যায়।


আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত দায়িত্বকে আমরা নারীর কর্তব্য বলে স্বাভাবিক করে ফেলেছি।


নারী একটু বিশ্রাম নিলে সে অলস।


নারী নিজের জন্য সময় নিলে সে স্বার্থপর।


নারী বেশি ঘুমালে সে দায়িত্বজ্ঞানহীন।


কিন্তু নারী ক্লান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন সবাই বলে, “নিজের যত্ন নাও।” এই দ্বৈত মানসিকতা বদলাতে হবে। ঘুম কোনো পুরস্কার নয়, যা সব কাজ শেষ করার পর একজন নারী পাবে। কারণ একজন নারীর জীবনে সব কাজ শেষ বলে কোনো সময়ই হয় না।


সংসারের দায়িত্ব যেমন সবার, বিশ্রামের অধিকারও সবার


একজন মা যদি পর্যাপ্ত ঘুমান, তাহলে তার সন্তানের সঙ্গে ভালোভাবে সময় কাটানোর এবং যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। একজন স্ত্রী যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান, তাহলে তিনি আরও সুস্থভাবে সংসারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একজন কর্মজীবী নারী যদি পর্যাপ্ত ঘুমান, তাহলে তার কাজের দক্ষতাও বাড়তে পারে।


আর সবচেয়ে বড় ভুল হলো, ঘুমের সময় কমিয়ে আমরা যে অতিরিক্ত সময় পাই, সেটাকেই উৎপাদনশীলতা মনে করা। কারণ ক্লান্ত শরীর ও অবসন্ন মস্তিষ্ক নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করলেই যে কাজের মান ভালো হবে, এমন নয়।


তাই রাত জেগে কাজ করা, সবার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের ঘুম বাদ দেওয়া কিংবা “ঘুম পরে হবে” বলে প্রতিদিন নিজেকে বঞ্চিত করা—এসবকে আত্মত্যাগের গৌরব হিসেবে দেখার সময় এসেছে। ঘুম মানে সময় নষ্ট করা নয়। ঘুম হলো পরের দিনের জন্য শরীর ও মনকে প্রস্তুত করা।


নিজের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের শরীরের প্রতিও দায়িত্ব আছে। কারণ সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন ছাড়া কোনো দায়িত্বই দীর্ঘদিন সুন্দরভাবে পালন করা সম্ভব নয়।


তাই ঘুমান। বিশ্রাম নিন। নিজেকে সময় দিন। কারণ আপনি অলস নন—আপনার শরীর তার প্রাপ্য বিশ্রাম চাইছে।

sidebar ad