একজন নারীর জীবনে সমাজ খুব সহজেই একটি পরিচয়ের তকমা লাগিয়ে দিতে চায়। কারও স্ত্রী, কারও সাবেক স্ত্রী, কারও মা কখনো কখনো তাঁর নিজের নামটিই যেন সেই পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু নারী আছেন, যারা সময়ের সঙ্গে নিজের পরিচয়ের পরিধি নিজেই বড় করে তোলেন।
রাফিয়াত রশিদ মিথিলা তেমনই একজন। অভিনয় ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ হিসেবে মিথিলাকে আমরা বহুদিন ধরেই চিনি। কিন্তু ক্যামেরার বাইরের মিথিলার গল্পটি আরও দীর্ঘ, আরও পরিশ্রমের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে Early Childhood Development বিষয়ে মাস্টার্স করেন এবং অর্জন করেন চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল। তাঁর রয়েছে B.Ed. ডিগ্রিও। এরপর সুইজারল্যান্ডের University of Geneva থেকে Early Childhood Education বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০২৫ সালে অর্জন করেন ‘ডক্টর’ উপাধি।
শিক্ষার এই পথের পাশাপাশি থেমে থাকেনি তাঁর কর্মজীবন। প্রায় দুই দশক ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কার্যক্রমে। Early Childhood Development ও Education নিয়ে তাঁর পেশাগত কাজ তাঁকে অভিনয়ের পরিচিত গণ্ডির অনেক বাইরে নিয়ে গেছে।
আর ২০২৬ সালে তিনি পা রেখেছেন আরও একটি নতুন অধ্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের Columbia University-এর Irving Institute for Clinical and Translational Research-এ Associate Research Scientist হিসেবে যোগ দিয়েছেন।
পাশাপাশি City University of New York (CUNY)-এ Adjunct Assistant Professor হিসেবে Nonprofit Management পড়াচ্ছেন।
একবার ভাবুন একজন পরিচিত অভিনয়শিল্পী একই সঙ্গে গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এই জায়গাটিই মিথিলার গল্পকে অনুপ্রেরণার গল্পে পরিণত করে। কারণ জীবনে পরিচিতি পাওয়া আর নিজের যোগ্যতায় নিজের পরিচয় তৈরি করা দুটো এক জিনিস নয়।
পরিচিতি মানুষকে আলোয় নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু সেই আলো ধরে রাখতে প্রয়োজন জ্ঞান, শ্রম, শৃঙ্খলা ও দীর্ঘ পথচলা।একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তাঁর সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত, অতীত সবকিছু নিয়েই সমাজের মতামত তৈরি হয়।
কিন্তু একজন মানুষের জীবনের ব্যক্তিগত অধ্যায় দিয়ে তাঁর পুরো সামর্থ্যকে বিচার করা কি সত্যিই ন্যায়সংগত? মিথিলার পথচলা যেন সেই প্রশ্নটিই আমাদের সামনে রাখে। জীবনে কী ঘটেছে, সেটি একজন মানুষের গল্পের একটি অংশ। কিন্তু তিনি এরপর কী করেছেন সেটিও তো তাঁর গল্পের অংশ।
কেউ যদি পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ান, সেটি তাঁর দুর্বলতার প্রমাণ নয় বরং তাঁর ভেতরের শক্তির প্রমাণ। কেউ যদি সমালোচনার মধ্যেও নিজের শিক্ষা, কাজ ও স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যান, তবে একসময় তাঁর হয়ে কথা বলতে শুরু করে তাঁর অর্জন।
মিথিলার গল্প থেকে নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি সম্ভবত এখানেই। নিজেকে এমনভাবে তৈরি করুন, যেন আপনার পরিচয় অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কিত না হয়ে আপনার নিজের কাজ ও যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
আপনার জীবনে কী ঘটেছে, তা নিয়ে মানুষ কথা বলবে। কেউ প্রশংসা করবে, কেউ সমালোচনা করবে। কিন্তু আপনি যদি নিজের শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বপ্নের ওপর কাজ করে যেতে পারেন, তাহলে একদিন সেই কথাগুলোর চেয়ে আপনার কাজের মূল্য অনেক বেশি হয়ে উঠবে।
কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষের মন্তব্য বদলায়। কিন্তু অর্জন থেকে যায়। মিথিলা তাই শুধু একটি পরিচিত মুখ নন,তাঁর বর্তমান পথচলা মনে করিয়ে দেয়। একজন নারী চাইলে একই জীবনে একাধিক স্বপ্নকে জায়গা দিতে পারেন। তিনি মা হতে পারেন, শিল্পী হতে পারেন, গবেষক হতে পারেন, শিক্ষক হতে পারেন, উন্নয়নকর্মী হতে পারেন এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের মতো করে নিজের পরিচয় তৈরি করতে পারেন।
তাই অন্যের চোখে নিজেকে মাপার আগে নিজের আয়নায় একবার তাকানো দরকার। হয়তো সেখানে আমরা দেখতে পাব
আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়টি হলো, আমরা প্রতিকূলতার পরেও থামিনি।
আর শেষ পর্যন্ত, নিন্দার জবাব নিন্দা দিয়ে নয়, নিজেকে আরও যোগ্য করে তোলাই সবচেয়ে সুন্দর উত্তর।