কখনো কখনো একটি মানুষের কর্মজীবন শুধু তাঁর নিজের জীবনের গল্প হয়ে থাকে না। হয়ে ওঠে একটি সময়ের ইতিহাস। নাভি পিল্লাইয়ের জীবন তেমনই এক গল্প—যেখানে আদালত, মানবাধিকার, গণহত্যা, যৌন সহিংসতা, যুদ্ধাপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার সাহস এক সুতোয় গাঁথা।
আন্তর্জাতিক আইন যখন বারবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে, তখন নাভি পিল্লাইয়ের নাম সামনে আসা তাই কেবল একটি পুরস্কারের গল্প নয়। এটি সেই আইন ও বিচারব্যবস্থার গল্প, যার ভিত গড়ে তুলতে তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে। নাভি পিল্লাই নিজেই যেন সেই ব্যবস্থার নির্মাতা এবং একই সঙ্গে তার সংকটের প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
একটি রায়, যা বদলে দিয়েছিল আন্তর্জাতিক আইন
১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় মাত্র একশ দিনে আট লাখের বেশি মানুষ নিহত হন। সেই গণহত্যার বিচার করতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। বিচারক হিসেবে সেখানে দায়িত্ব পালন করেন নাভি পিল্লাই।
রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান আসে জঁ-পল আকায়েসুর মামলায়। আকায়েসু ছিলেন রুয়ান্ডার একটি এলাকার মেয়র। তাঁর বিচারে দেওয়া রায়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আদালতে স্বীকৃতি পায়—কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত যৌন সহিংসতা গণহত্যার অংশ হতে পারে। একই মামলায় আন্তর্জাতিক কোনো আদালতে গণহত্যার প্রথম দণ্ডও দেওয়া হয়।
এর গুরুত্ব ছিল গভীর। যুদ্ধের সময় নারীর ওপর যৌন সহিংসতাকে দীর্ঘদিন যুদ্ধের একটি ‘পার্শ্বক্ষতি’ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আকায়েসু রায় সেই ধারণা বদলে দেয়। বলা হয়, যৌন সহিংসতা যদি কোনো জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার পরিকল্পনার অংশ হয়, তাহলে সেটিও গণহত্যার হাতিয়ার।
আজ আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে যৌন সহিংসতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার পেছনে এই রায়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে।
রুয়ান্ডার বিচারব্যবস্থা গড়ার কঠিন সময়
১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের নেতৃত্ব দেন পিল্লাই। দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন সদ্য বর্ণবাদের অবসান হয়েছে। নিজের দেশের নতুন গণতন্ত্রের আনন্দের সময় ছেড়ে তিনি চলে যান তানজানিয়ার আরুশায়। সেখানে তাঁরা এমন এক বিচারব্যবস্থা তৈরি করছিলেন, যার কোনো প্রস্তুত নকশা ছিল না।
গণহত্যার মামলা কীভাবে পরিচালিত হবে, সাক্ষীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, হাজারো মানুষের হত্যার দায় কীভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে হয়েছে কাজ করতে করতেই।
প্রায় আট বছর তিনি এই ট্রাইব্যুনালে ছিলেন। শেষ চার বছর দায়িত্ব পালন করেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের যে কাঠামো আজ আমরা দেখি, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সেই আরুশাতেই।
অস্থায়ী ট্রাইব্যুনাল থেকে স্থায়ী আন্তর্জাতিক আদালত
রুয়ান্ডার পর নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন তাঁকে নিয়ে যায় হেগে। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত—আইসিসির বিচারক ছিলেন।
রুয়ান্ডা বা যুগোস্লাভিয়ার মতো ট্রাইব্যুনাল ছিল নির্দিষ্ট ঘটনার বিচারের জন্য তৈরি অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আইসিসি হলো স্থায়ী আন্তর্জাতিক আদালত—যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হতে পারে।
সেই আদালতের শুরুর দিকের বিচারকদের একজন ছিলেন পিল্লাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার একটি অস্থায়ী অধ্যায় থেকে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়েই তাঁর উপস্থিতি ছিল।
বিচারকের হাতুড়ি থেকে মানবাধিকারের কণ্ঠস্বর
২০০৮ সালে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে তাঁর হাতে কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, কাউকে গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা ছিল না, শাস্তি দেওয়ার সরাসরি কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল—কণ্ঠস্বর। অন্যায়কে অন্যায় বলে চিহ্নিত করার ক্ষমতা।
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ নিয়ে তিনি স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছিলেন। সিরিয়ার যুদ্ধের সময় তাঁর দপ্তর নিয়মিত মৃত্যুর হিসাব প্রকাশ করত। রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিয়েও তিনি সরব ছিলেন। এসব অবস্থান তাঁকে বিভিন্ন সরকারের সমালোচনার মুখে ফেললেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি।
গাজা: আশি পেরিয়েও থামেননি
নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবনের সাম্প্রতিকতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় গাজা। আশি পেরোনোর বয়সেও তিনি জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল নিয়ে তদন্ত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে কমিশন গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছায় এবং এর দায় ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর আরোপ করে। এমন একটি সিদ্ধান্ত দেওয়া সহজ ছিল না। কারণ ‘গণহত্যা’ শব্দটির আইনি ও নৈতিক ওজন অত্যন্ত বেশি—আর রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার করা একজন বিচারক সেই ওজন সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবগত।
এই সিদ্ধান্তের পর পিল্লাইকে পক্ষপাতিত্ব ও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি।
এখানেই তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালী পক্ষের বিরোধিতার আশঙ্কা তাঁর সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেনি।
রোহিঙ্গাদের জন্যও তাঁর লড়াই গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের জন্য নাভি পিল্লাইয়ের কাজের সবচেয়ে কাছের অধ্যায় সম্ভবত রোহিঙ্গা সংকট। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলায় অ্যাডহক বিচারক হিসেবে যুক্ত। মামলার মূল প্রশ্ন—রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের দমন-পীড়ন ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে কি না।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভবিষ্যতের সঙ্গে এই মামলার ফলাফলের সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যাবাসন, ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
একজন বিচারক হিসেবে রুয়ান্ডার গণহত্যা থেকে যাত্রা শুরু করে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগের বিচারিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া—এ যেন তাঁর কর্মজীবনের একটি বেদনাদায়ক কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বৃত্ত।
আলুর গুদাম থেকে আন্তর্জাতিক আদালত
নাভি পিল্লাইয়ের সাফল্যের গল্প বুঝতে হলে তাঁর শৈশবের দিকে তাকানো জরুরি। ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর দাদা-দাদিকে একসময় ভারত থেকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বাবা ছিলেন বাসচালক, মা গৃহিণী। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকায় অশ্বেতাঙ্গ, দরিদ্র ও নারী—এই তিন পরিচয় তাঁর সামনে তৈরি করেছিল কঠিন বাধা।
পাড়ার মানুষের চাঁদায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। সে সময় অশ্বেতাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা জায়গায় ক্লাস হতো। তাঁর ক্লাস বসত একটি গুদামঘরের ওপরতলায়, নিচে রাখা থাকত আলুর বস্তা।
সেই জায়গা থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর আইন পড়ার যাত্রা। পরে তিনি পৌঁছেছেন হার্ভার্ড পর্যন্ত। একজন প্রান্তিক পরিবারের নারী, যাঁর সামনে সমাজ ও বর্ণবাদের একাধিক দেয়াল ছিল, তিনিই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে ওঠেন।
সত্য বলতে আবার সাহস লাগবে কেন?
নাভি পিল্লাইয়ের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—আইন শুধু আদালতের বইয়ে লেখা কোনো বিধান নয়। আইন তখনই অর্থবহ হয়, যখন কেউ অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সেটিকে প্রয়োগ করার সাহস দেখায়।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায় সবসময় সঙ্গে সঙ্গে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে না। কোনো রাষ্ট্র রায় অমান্য করতে পারে, ক্ষমতাবান দেশ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। তবু একটি রায় ইতিহাসে থেকে যায়। একটি অপরাধকে আইনের ভাষায় সংজ্ঞায়িত করে। ভবিষ্যতের বিচারের ভিত্তি তৈরি করে।
নাভি পিল্লাইয়ের জীবন তাই শুধু বিচারকের জীবন নয়; এটি আইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আইনের প্রয়োজনীয়তার গল্প।
ঘোষণার দিন তিনি একটি সরল প্রশ্ন তুলেছিলেন—সত্য বলতে আবার সাহস লাগবে কেন?
সম্ভবত এই প্রশ্নের মধ্যেই তাঁর পুরো জীবনকর্মের সারাংশ লুকিয়ে আছে।
যখন সত্য বলা কঠিন হয়ে যায়, তখন সত্য বলার মানুষ আরও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেন। আর যখন আন্তর্জাতিক আইন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন নাভি পিল্লাইয়ের মতো মানুষের দীর্ঘ লড়াই মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার হয়তো সবসময় দ্রুত আসে না, কিন্তু তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা কখনোই অর্থহীন নয়।