থাইল্যান্ডের বন্যা: পানির নিচে জনজীবন, বাংলাদেশের জন্যও যে বার্তা

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

থাইল্যান্ডের বন্যা: পানির নিচে জনজীবন, বাংলাদেশের জন্যও যে বার্তা

থাইল্যান্ড থেকে জামাল হোসেন বিন্দু


ব্যাংককের যে রাস্তায় প্রতিদিন হাজার হাজার গাড়ি চলাচল করে, সেই রাস্তাতেই এখন পানি। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তার চেয়েও বেশি। কোথাও গাড়ি পানিতে আটকে আছে, কোথাও ঘরের ভেতরে পানি ঢুকেছে। স্কুল ও সরকারি স্থাপনাগুলোকে কোথাও কোথাও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়েছে। কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে থাইল্যান্ডের রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বদলে গেছে স্বাভাবিক জনজীবনের চিত্র।


সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে টানা ভারী বৃষ্টিতে থাইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়। রাজধানী ব্যাংককসহ কয়েকটি এলাকায় সড়ক, আবাসিক এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢোকে। যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং অনেক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়।


বন্যার প্রভাব শুধু সড়কে পানি জমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পানি বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্য সরবরাহ, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও জরুরি সেবার ওপরও প্রভাব পড়ে। ব্যাংককের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এসব ব্যবস্থার ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি হওয়ার চিত্র দেখা গেছে।


যখন শহরের রাস্তা পানির নিচে


ব্যাংকক বন্যার সঙ্গে অপরিচিত নয়। শহরটির অবস্থান, জলপথ, বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত এবং নগর অবকাঠামোর কারণে জলাবদ্ধতা ও বন্যা ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই নগর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে ব্যাংককের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কিছু এলাকায় গাড়ি পানিতে আটকে যায় এবং কোথাও ব্যক্তিগত গাড়ি দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে পড়ে থাকে। পানি ঢুকে গাড়ির ইঞ্জিন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।


তবে পানিতে ডুবে যাওয়া গাড়ি বা বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়ক বন্যার সামগ্রিক প্রভাবের একটি অংশ মাত্র।


ঘর যখন বসবাসের উপযোগিতা হারায়


বন্যার পানি ঘরে ঢুকলে বাসিন্দাদের আসবাব, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, পোশাক, কাগজপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়। পানি দ্রুত বাড়লে অনেক ক্ষেত্রেই সবকিছু সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না।


বন্যাকবলিত এলাকার কিছু বাসিন্দা দীর্ঘ সময় ঘরে পানি থাকার কথা জানিয়েছেন। কোথাও মানুষ ঘরের উঁচু জায়গায় অবস্থান করেছেন। ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


বন্যার সময় পানির সঙ্গে ঘরে সাপসহ বিভিন্ন প্রাণী ঢুকে পড়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই পানি নেমে যাওয়ার পর ঘর পরিষ্কার করা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন।


খাবার, পানি ও আশ্রয়ের প্রয়োজন


বন্যার কারণে কোনো এলাকার স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। বন্যাকবলিত এলাকায় বোতলজাত পানি, শুকনো খাবারসহ জরুরি পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। একই সময়ে দোকান ও বাজারে পণ্য পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।


এ কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী নৌযান, সামরিক যান বা অন্যান্য পরিবহন ব্যবহার করে ত্রাণ ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দিতে হয়।


স্কুল ও সরকারি স্থাপনাকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, অসুস্থ মানুষ এবং নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন এমন ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।


মানুষের অভিযোগ এবং প্রশাসনের কার্যক্রম


বন্যার সময় বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা, উদ্ধার ও সহায়তার বিষয়ে অভিযোগ ওঠে। কোথাও খাবার, পানি, স্যানিটেশন ও দ্রুত উদ্ধার সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানানো হয়েছে।


একই সময়ে কর্তৃপক্ষ পানি নিষ্কাশন, পাম্পিং, উদ্ধার, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং জরুরি সেবা চালু রাখার কাজ করেছে। কোথাও সামরিক যান ও নৌযান ব্যবহার করে মানুষ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহন করা হয়েছে।


বন্যার মতো পরিস্থিতিতে মানুষের প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে দ্রুত পানি বাড়লে স্থানীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা, উদ্ধার এবং সরবরাহব্যবস্থার সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।


বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্যও প্রাসঙ্গিক


থাইল্যান্ড বাংলাদেশের মানুষের কাছে পর্যটন, চিকিৎসা, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত ভ্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। তাই সেখানে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য স্থানীয় পরিস্থিতি জানা প্রয়োজন।


বিমানবন্দর চালু থাকলেও বিমানবন্দরমুখী সড়কে পানি জমলে যাত্রার সময় বেড়ে যেতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে নির্দিষ্ট এলাকার আবহাওয়া, সড়ক যোগাযোগ, গণপরিবহন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা ভালো।


জরুরি প্রয়োজনে থাইল্যান্ডের পর্যটন কর্তৃপক্ষের ১৬৭২ এবং ট্যুরিস্ট পুলিশের ১১৫৫ নম্বরে যোগাযোগ করা যায়।


এর অর্থ পুরো থাইল্যান্ড ভ্রমণের জন্য অনুপযুক্ত—এমন নয়। বন্যার প্রভাব এলাকা ও সময়ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই ভ্রমণকারীদের নির্দিষ্ট গন্তব্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করাই গুরুত্বপূর্ণ।


বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?


থাইল্যান্ডের এই বন্যা বাংলাদেশের জন্যও প্রাসঙ্গিক। দুই দেশেই বর্ষাকালীন ভারী বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার অভিজ্ঞতা রয়েছে।


ঢাকার জলাবদ্ধতার ক্ষেত্রে খাল, জলাধার, ড্রেনেজ এবং পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। দ্রুত নগরায়ণের ফলে পানি প্রবাহ ও পানি ধারণের জায়গার ব্যবহারও নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।


তাই থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


ঢাকার খালগুলো কতটা কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখছে? অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে বর্তমান ড্রেনেজ ও পাম্পিং ব্যবস্থা কতটা পানি সরাতে পারে? প্রধান সড়কে পানি জমলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা কী? বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে হাসপাতাল ও জরুরি সেবাগুলো কীভাবে সচল থাকবে? বড় সংখ্যক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও আশ্রয় কত দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব?


এসব বিষয় দুর্যোগ প্রস্তুতি ও নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।


অতিবৃষ্টি ও নগর ব্যবস্থাপনা


একটি নির্দিষ্ট বন্যার জন্য একক কোনো কারণ নির্ধারণ করা সবসময় সম্ভব নয়। বৃষ্টির পরিমাণ, বৃষ্টির সময়কাল, ভূমির ব্যবহার, নগরায়ণ, খাল ও জলাধারের অবস্থা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং আশপাশের এলাকা থেকে পানির প্রবাহ—সবগুলো বিষয় পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে।


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বৃষ্টিপাতের ধরন ও তীব্রতায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যার ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা ছিল, তা নির্ধারণের জন্য আলাদা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।


থাইল্যান্ডের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাই শুধু একটি দেশের বন্যার ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে।


কারণ বন্যা শুধু রাস্তার ওপর পানি জমার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে মানুষের ঘরবাড়ি, যানবাহন, খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যোগাযোগ।


একটি শহরের সক্ষমতা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক স্থাপনা দিয়ে বোঝা যায় না। অতিবৃষ্টির সময় পানি কীভাবে সামলানো হয়, মানুষকে কীভাবে নিরাপদ রাখা হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কত দ্রুত সেবা ও যোগাযোগ পুনরুদ্ধার করা যায়—নগর ব্যবস্থাপনার মূল্যায়নে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

sidebar ad