বাংলাদেশে মেয়েরা বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী যার যতটুকু অধিকার, তা তার প্রাপ্য। কিন্তু বাস্তব জীবনের গল্পটা অনেক সময় কাগজের আইনের মতো সুন্দর নয়। অধিকাংশ পরিবারে মেয়েরা বাবার সম্পত্তির ভাগ চাইতে গিয়ে এক অদ্ভুত মানসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়।
‘তুমি তো মেয়ে, তুমি আবার সম্পত্তি দিয়ে কী করবে? ভাই তো সংসার করবে, ওরই থাক।’
‘তোমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করো না।’—এই কথাগুলো শুনতে শুনতে অনেক মেয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের ন্যায্য অধিকারটুকুও ছেড়ে দেয়।
কেউ স্বেচ্ছায় ছাড়ে, কেউ পারিবারিক শান্তির জন্য ছাড়ে, কেউ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছাড়ে, আবার কেউ এত বছর ধানাই-পানাইয়ের মধ্যে পড়ে থাকে যে একসময় অধিকার আদায়ের শক্তিটুকুও আর থাকে না।
কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, মেয়ের নিজের বাবার সম্পত্তির অধিকার চাইতে তাকে এতটা অসহায় হতে হবে কেন? বাবা যখন ছেলের জন্য ভবিষ্যৎ ভাবেন, তখন মেয়েটিও তো তার সন্তান।
বাবা যেমন ছেলের বাবা, মেয়েরও বাবা
তাহলে বাবার মৃত্যুর পর মেয়ের প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে তাকে কেন ভাইয়ের অনুগ্রহের অপেক্ষায় থাকতে হবে?
কেন?
আমি অবশ্য এমন পরিবারও দেখেছি, যেখানে ভাইয়েরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমার নিজের বাবার পরিবারেও দেখেছি,আমার দাদীর ব্যবহার্য জিনিসপত্র পর্যন্ত বোনদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে কেউ বোনের অধিকারকে বোঝা মনে করেনি। সমস্যাটা তাই ভাই বনাম বোন নয়। সমস্যাটা হলো, কেউ যেন কারও ন্যায্য অংশ আত্মসাৎ করতে না পারে।
একজন ভাইয়ের নিজের উপার্জন বা নিজের সম্পত্তি থাকলে, সেটি তার। সেখানে বোনের কোনো দাবি নেই। কিন্তু বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে যে যার আইনগত অংশ পাওয়ার কথা, সেটা যেন কেউ কৌশলে আটকে রাখতে না পারে।
আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর উত্তরাধিকারীদের সম্পত্তি বণ্টন দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে সম্পন্ন হবে।
যেখানে মেয়েকে বছরের পর বছর ভাইয়ের পেছনে ঘুরতে হবে না। যেখানে বোন তো নিজের ঘরে চলে গেছে,এই যুক্তি দিয়ে তার অধিকার আটকে রাখা যাবে না। যেখানে কোনো উত্তরাধিকারী অন্যের অংশ নিজের নামে করে নেওয়ার সুযোগ পাবে না।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অধিকার চাইতে গিয়ে একজন মেয়েকে যেন নিজের ভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে না হয়।
কারণ সম্পত্তির ভাগ শুধু জমি, বাড়ি কিংবা টাকা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ।
অনেক নারী সারা জীবন সংসার করেছেন, নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন, বাবা-মায়ের জন্য করেছেন, ভাইদের জন্য করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বাবার সম্পত্তির ন্যায্য অংশ চাইলে তাকে লোভী বলা কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।
আবার একইভাবে, নিজের সম্পত্তি না থাকায় কোনো ভাইকে বঞ্চিত করার কথাও বলা হচ্ছে না। যার যা আইনগত অধিকার, সে যেন তা পায় এইটুকুই ন্যায়।
আমাদের প্রয়োজন এমন আইন ও তার কার্যকর প্রয়োগ, যা উত্তরাধিকারীর অধিকারকে কেবল কাগজে স্বীকৃতি দেবে না,বাস্তবেও দ্রুত নিশ্চিত করবে।
কারণ, মেয়ের অধিকার ভাইয়ের দয়া নয়। মেয়ের অধিকার বাবার ভালোবাসার প্রমাণও নয়। এটি তার ন্যায্য অধিকার। আর একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো,কেউ তার অধিকার চাইলে তাকে ধাক্কা খেয়ে বেড়াতে না হয়।
বাবার সম্পত্তিতে মেয়ে যেন মেহমান না হয়। সে-ও এই পরিবারের সন্তান। তার অধিকারটুকু যেন তাকে সম্মানের সঙ্গে দেওয়া হয়।
ঢাকা/আরএস