শায়লা জাহান:
একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো। আপনাকে যদি ১০ সেকেন্ড সময় দেওয়া হয়, এই অল্প সময়টুকুতে আপনি কী করতে পারবেন? একটি গাছে পানি দিতে পারবেন, প্রিয় মানুষটিকে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাতে পারবেন, গভীর একটি শ্বাস নিতে পারবেন কিংবা কারও দিকে তাকিয়ে একটি আন্তরিক হাসি উপহার দিতে পারবেন। খুব সহজ, তাই না?
কিন্তু জানেন কি, এই ১০ সেকেন্ডেই আপনার নেওয়া একটি ছোট্ট সিদ্ধান্ত হতে পারে কারও নিরাপদ ভবিষ্যতের শুরু। প্রতি বছর ২১ জুলাই পালিত ‘ন্যাশনাল বি সামওয়ান ডে’ আমাদের প্রত্যেককে একটি শিশুর জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে মাত্র ১০ সেকেন্ড ব্যয় করার আহ্বান জানায়।
কী এই দিন? আর এর বিশেষত্বই বা কী? আসুন, জেনে নিই।
‘ন্যাশনাল বি সামওয়ান ডে’ হলো শিশু নির্যাতন ও অবহেলা প্রতিরোধের লক্ষ্যে পালিত একটি বার্ষিক সচেতনতামূলক দিবস। এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়—‘কারও জন্য বিশেষ কেউ হওয়ার দিন’। ‘বি সামওয়ান’ বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে এমন একজন মানুষ হওয়া, যার উপস্থিতি অন্য কারও জীবনকে নিরাপদ, সুন্দর বা আশাব্যঞ্জক করে তোলে।
এই দিবসটি প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে শিশু নির্যাতনের লক্ষণগুলো শনাক্ত করতে, কোনো অন্যায় বা সমস্যা দেখলে তা নিয়ে কথা বলতে এবং কোনো অসহায় বা ঝুঁকিপূর্ণ শিশুর জন্য একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাশীল মানুষ হয়ে উঠতে আহ্বান জানায়। তৃণমূল পর্যায়ের এই আন্দোলনটি মূলত শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
নেব্রাস্কার ওমাহাভিত্তিক শিশু সুরক্ষা ও সহায়তা কেন্দ্র ‘প্রজেক্ট হারমনি’ এবং ‘ন্যাশনাল ডে ক্যালেন্ডার’-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২১ সালে এই দিবসটি চালু করা হয়। এই প্রচারণার মূল বার্তা ছিল—কোনো শিশুর সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের প্রয়োজন হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের কাছে এই কাজে অংশগ্রহণকে সহজ ও সাধ্যের মধ্যে বলে মনে করানো।
এখানে ১০ সেকেন্ডের বিষয়টি শুধুমাত্র একটি প্রতীকী সংখ্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে প্রতি প্রায় ১০ সেকেন্ডে একটি করে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। এই কঠিন বাস্তবতাই দিবসটির মূল বার্তাকে আরও গভীর করে তোলে।
‘ন্যাশনাল বি সামওয়ান ডে’ বা ‘কারও জন্য বিশেষ কেউ হয়ে ওঠার দিন’-এর ধারণাটি প্রজেক্ট হারমনির বৃহত্তর উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট বি সামওয়ান’ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। প্রজেক্ট হারমনি হলো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহত্তম শিশু সুরক্ষা ও সহায়তা কেন্দ্র। এটি এমন সব শিশুকে সহায়তা করার জন্য কাজ করে, যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করার প্রচেষ্টাও চালায়।
এই প্রকল্পটি এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে কেবল বিশেষজ্ঞরাই নন, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসতে পারেন।
এই দিবসটির অন্যতম পথিকৃৎ ও অনুপ্রেরণা হিসেবে মেরি এলেন উইলসনের নামটিই সবার আগে আসে। তিনি ছিলেন এমন এক শিশু, যার ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনাটি ১৮৭৪ সালে নিউইয়র্কে শিশুদের আইনি সুরক্ষার অভাবের বিষয়টি সবার নজরে নিয়ে আসে। তাঁর এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির কারণে ‘আমেরিকান সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু অ্যানিম্যালস’ হস্তক্ষেপ করতে এগিয়ে আসে এবং শেষ পর্যন্ত ‘নিউইয়র্ক সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু চিলড্রেন’ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়। যা শিশু সুরক্ষার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
ন্যাশনাল বি সামওয়ান ডে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
শিশু নির্যাতন একটি গুরুতর এবং প্রায়শই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সমস্যা। প্রজেক্ট হারমনির এই প্রচারণামূলক কার্যক্রম একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শিশু নির্যাতনের অনেক ঘটনাই প্রকাশ্যে আসে না, কারণ অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নির্যাতনের লক্ষণগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত নন অথবা এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে বা জড়াতে ভয় পান।
ন্যাশনাল বি সামওয়ান ডে-এর উদ্দেশ্য হলো এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো। এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, সামান্য একটু মনোযোগ বা একটিমাত্র ফোন কলই কোনো শিশুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। গবেষণা ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় বারবার এটিই উঠে এসেছে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া কোনো শিশুর জীবনে একজন যত্নশীল ও স্থিতিশীল প্রাপ্তবয়স্কের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
কীভাবে এই উদ্যোগে শামিল হবেন?
এই উদ্যোগে শামিল হওয়ার এবং সমর্থন জানানোর অনেক উপায় রয়েছে। প্রজেক্ট বি সামওয়ান নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য পাঁচটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছে—
তথ্য ও বিষয়গুলো সম্পর্কে জানুন
ঝুঁকির বা সুযোগের ক্ষেত্র কমিয়ে আনুন
এ বিষয়ে কথা বলুন
নির্যাতন ও অবহেলার শারীরিক ও আচরণগত লক্ষণগুলো সম্পর্কে জেনে নিন
দায়িত্বশীল আচরণ করুন
এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইলে শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত পরিসংখ্যান, হেল্পলাইন নম্বর এবং অন্যান্য তথ্য শেয়ার করার মাধ্যমেও দিনটি পালন করা যেতে পারে।
পৃথিবী বদলাতে সব সময় বড় কোনো পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি সিদ্ধান্ত, একটি প্রশ্ন কিংবা একটি সাহসী প্রতিবাদ বদলে দিতে পারে একটি শিশুর পুরো জীবন।
এই দিনটি আমাদের শেখায়, জীবনে শুধু কেউ একজন হয়ে নয়, কারও জন্য একজন হয়ে বেঁচে থাকাই সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা/শায়লা/লিপি