‘একটি পাখি কখনো এক ডানায় উড়তে পারে না। একটি জাতিও পারে না।’
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের যে গল্প বিশ্বকে শোনায়, সেই গল্পের অর্ধেক লিখেছেন এ দেশের নারীরা। কৃষকের মাঠ থেকে তৈরি পোশাক কারখানা, গবেষণাগার থেকে আদালত, হাসপাতাল থেকে সংসদ, উদ্যোক্তার কার্যালয় থেকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বোর্ডরুম—সবখানেই আজ নারীর উপস্থিতি দৃশ্যমান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমান উপস্থিতিই কি প্রকৃত অগ্রগতি? নাকি আমরা কেবল সংখ্যার হিসাব করছি, অথচ সমতার প্রকৃত ভিত্তি এখনো নির্মাণ করতে পারিনি?
নারীর অগ্রযাত্রা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই দুটি চরম অবস্থানে দাঁড়াই। একদল শুধু সাফল্যের গল্প বলে, আরেকদল শুধু বঞ্চনার কথা বলে। অথচ বাস্তবতা এই দুইয়ের মাঝখানে। বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রা যেমন এক অনন্য অর্জনের ইতিহাস, তেমনি অসম সুযোগ, সামাজিক মানসিকতা, নিরাপত্তাহীনতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামেরও ইতিহাস।
প্রশ্নটি তাই নারী কত দূর এগিয়েছেন—এটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, তিনি কি তাঁর সক্ষমতার সর্বোচ্চ বিকাশের সমান সুযোগ পাচ্ছেন?
উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়, পরিবর্তনের গভীরতায় নারীর অগ্রযাত্রা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নারীর সামাজিক অবস্থান এবং আজকের অবস্থানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একসময় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, কর্মক্ষেত্রে উপস্থিতি ছিল ব্যতিক্রম, আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য।
আজ সেই চিত্র বদলেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে লাখো নারী শুধু শ্রমিক নন; তাঁরা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম শক্তি। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, সাংবাদিকতা, উদ্যোক্তা খাত—সবখানেই নারীর পদচারণা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকেও বাংলাদেশের নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে।
কিন্তু এই অগ্রগতি কি সমাজের প্রতিটি স্তরের নারীর জীবনে সমানভাবে পৌঁছেছে?
উত্তরটি সহজ নয়।
ঢাকার একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী নারীর বাস্তবতা যেমন, একটি প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র নারীর বাস্তবতা তেমন নয়। শহরের একজন উদ্যোক্তার সম্ভাবনা যেমন, পাহাড় বা চরাঞ্চলের একজন নারীর সম্ভাবনা তেমন নয়। তাই নারীর অগ্রযাত্রার মূল্যায়ন করতে হলে আমাদের শুধু সফল মানুষের গল্প নয়, পিছিয়ে থাকা মানুষের গল্পও শুনতে হবে।
সবচেয়ে বড় বাধা অর্থের নয়, মানসিকতার
আমরা প্রায়ই মনে করি নারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক। বাস্তবে অর্থনৈতিক সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর শিকড় আরও গভীরে।
একটি মেয়ে জন্মের পর থেকেই তাকে অদৃশ্য কিছু নিয়মের মধ্যে বড় হতে হয়। কী পড়বে, কোথায় যাবে, কখন ফিরবে, কী পোশাক পরবে, কোন পেশা বেছে নেবে—এসব সিদ্ধান্তের ওপর তার নিজের চেয়ে পরিবারের প্রভাবই বেশি থাকে।
একজন ছেলে যখন সফল হয়, সমাজ বলে—সে পরিশ্রম করেছে। একজন নারী সফল হলে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে—কীভাবে সম্ভব হলো?
এই প্রশ্নই প্রমাণ করে, বৈষম্যের শুরু আইন থেকে নয়, মানসিকতা থেকে। নারীর স্বাধীনতাকে এখনো অনেক পরিবার ‘অনুমতি’ হিসেবে দেখে, ‘অধিকার’ হিসেবে নয়। এই মানসিক পরিবর্তন না এলে আইন, প্রকল্প কিংবা অর্থায়ন—কোনোটিই স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের চেয়ে টিকে থাকা কঠিন
আজ বহু নারী চাকরি করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করাই শেষ কথা নয়। একজন কর্মজীবী নারীকে অফিস শেষে আরেকটি পূর্ণকালীন কাজ করতে হয়—সংসার। সন্তান, পরিবার, বয়স্ক সদস্য, সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর বড় অংশ এখনো নারীর ওপরই বর্তায়। ফলে একই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই কর্মজীবন থেকে সরে দাঁড়ান।
এটি শুধু একজন নারীর ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রেরও ক্ষতি। কারণ একজন দক্ষ মানুষকে হারিয়ে দেশ তার সম্ভাবনাও হারায়।
শিক্ষা যথেষ্ট নয়, দক্ষতা জরুরি
আজকের পৃথিবী শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ চায় না; চায় দক্ষ মানুষ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে নারীদের নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। শুধু প্রচলিত শিক্ষা নয়—ডিজিটাল দক্ষতা, আর্থিক জ্ঞান, উদ্যোক্তা দক্ষতা, যোগাযোগ, গবেষণা, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধান এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা আগামী দিনের মূল সম্পদ। যে দেশ নারীদের দক্ষ করে তুলবে, সেই দেশই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবে।
নারী উদ্যোক্তা: সাহায্যের নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্র
বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এখনো অধিকাংশ নারী ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা করেন। মূল বাধা পুঁজি নয়; আস্থা। একজন পুরুষ উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, একজন নারী উদ্যোক্তাকে অনেক সময় সহানুভূতির চোখে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
নারী উদ্যোক্তা মানে শুধু একটি ব্যবসা নয়; একটি পরিবার, একটি কর্মসংস্থান এবং একটি অর্থনৈতিক চক্রের জন্ম। তাই নারী উদ্যোক্তার উন্নয়ন কোনো সামাজিক দান নয়; এটি অর্থনৈতিক বিনিয়োগ। নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা নয়, প্রভাব বাড়াতে হবে
আজ অনেক প্রতিষ্ঠানে নারী রয়েছেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে তাঁদের সংখ্যা এখনো সীমিত। নারী নেতৃত্বের অর্থ শুধু পদে থাকা নয়; নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখা। স্থানীয় সরকার, করপোরেট বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজ—সবখানেই দক্ষ নারী নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
কারণ নেতৃত্ব জন্মগত নয়; নেতৃত্ব গড়ে তোলা যায়। আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারেন নারীরা। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, যদি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো না যায়।
নারীর উন্নয়নকে এখন আর সামাজিক কল্যাণের বিষয় হিসেবে দেখার সময় শেষ। এটি এখন অর্থনীতি, মানবসম্পদ, উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। যে রাষ্ট্র নারীর শিক্ষা, দক্ষতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং নেতৃত্বে বিনিয়োগ করবে, সেই রাষ্ট্রই ভবিষ্যতের বিশ্বে টিকে থাকবে।
আমাদের কী করতে হবে?
প্রথমত, পরিবার থেকেই ছেলে ও মেয়ের মধ্যে সমান মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নারীর জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
চতুর্থত, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, বাজারসংযোগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, জেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত নারী নেতৃত্ব বিকাশের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
নারীর অগ্রযাত্রা কোনো একক লিঙ্গের বিজয়ের গল্প নয়; এটি একটি জাতির সভ্য হয়ে ওঠার গল্প।
একটি মেয়ে যখন শিক্ষিত হয়, তখন শুধু একজন মানুষ নয়, একটি পরিবার আলোকিত হয়। একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হন, তখন শুধু তাঁর আয় বাড়ে না; বাড়ে পরিবারের নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা। আর একজন নারী যখন নেতৃত্বে আসেন, তখন সিদ্ধান্তের টেবিলে যোগ হয় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন সংবেদনশীলতা এবং নতুন সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি নারীদের শুধু এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেব, নাকি তাঁদের সঙ্গে নিয়ে এগোব?
কারণ উন্নয়নের প্রকৃত সংজ্ঞা তখনই পূর্ণ হয়, যখন নারী ও পুরুষ প্রতিযোগী নয়, সহযাত্রী হন। আর সেই দিনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে উন্নত হবে, যেদিন একজন নারীর স্বপ্নকে আর ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক বলে মনে হবে।
নারীর অগ্রযাত্রা তাই কোনো বিশেষ কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় জাতীয় বিনিয়োগ।
সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী