লেখা- ইশরাত জাহান ইনা
সম্পর্ক, পরিবার বা সমাজ সব জায়গাতেই একটা অদৃশ্য সংঘর্ষ লুকিয়ে থাকে, আর সেটা হলো কে কী করবে? এই অনির্দিষ্ট প্রত্যাশা। একজন ভাবে সে যা করছে সেটাই যথেষ্ট, আরেকজন ভাবে তার চেয়েও বেশি কিছু হওয়া উচিত ছিল।এখান থেকেই শুরু হয় ছোট ছোট হতাশা, আর সেই ছোট ছোট হতাশাই একসময় বড় দূরত্ব তৈরি করে।
কিন্তু যখন মানুষ নিজের নিজের রোলটা পরিষ্কারভাবে বুঝে নেয়, কে কোন দায়িত্বে, কোথায় তার সীমা, আর কোথায় তার অবদান, তখন আর অকারণে প্রত্যাশার চাপ বাড়ে না।সম্পর্কটা তখন যুদ্ধক্ষেত্র না হয়ে হয়ে ওঠে একটা সুন্দর সমন্বয়, যেখানে বোঝাপড়াই সবচেয়ে বড় শক্তি।
সংসারে রোল মানে শুধু দায়িত্ব না,এটা আসলে একে অপরকে সামলানো, বুঝে নেওয়া আর একসাথে জীবন চালানোর একটা টিমওয়ার্ক।একটা সাধারণ পরিবারের ভেতরে প্রধান কিছু রোলস এমনভাবে দেখা যায়, স্বামী / বাবা পরিবারের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক দিক সামলানো, সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দেওয়া, আর মানসিকভাবে পরিবারকে ভরসা দেওয়া। এই জায়গাগুলো সাধারণত তার ওপর থাকে।
স্ত্রী / মা- পরিবারের আবেগ,যত্ন, সন্তান লালন-পালন,ঘরের ভেতরের শৃঙ্খলা আর সম্পর্কগুলোকে সুন্দরভাবে ধরে রাখা।এই ভূমিকাটা অনেক গভীর।
সন্তান- শেখা,শৃঙ্খলা মানা,ধীরে ধীরে দায়িত্ব বোঝা এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করা,এটাই তাদের প্রধান রোল।
শ্বশুর-শাশুড়ি (যদি যৌথ পরিবার হয়)অভিজ্ঞতা দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া, পরিবারকে একসাথে রাখার সেতুবন্ধন হওয়া, আর অনেক সময় নতুন সদস্যদের মানিয়ে নিতে সাহায্য করা।
ভাই-বোন / আত্মীয়রা- সহযোগিতা,মানসিক সাপোর্ট,আর সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখা। এই জায়গায় তাদের ভূমিকা আসে।
আসল কথা হলো, রোলগুলো আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই পরিবারকে শান্তি, বোঝাপড়া আর স্থিতিশীলতায় রাখা। যখন সবাই নিজের দায়িত্বটা বুঝে নেয়, তখন কে কতটা করলো এই হিসাব কমে গিয়ে আমরা একসাথে আছি এই অনুভূতিটাই বড় হয়ে ওঠে।
সংসারে প্রত্যেকটা রোলের ভেতরেই কিছু না কিছু অদৃশ্য এক্সপেকটেশন থাকে,যেগুলো ঠিকমতো বোঝা না গেলে সম্পর্কেই টানাপোড়েন শুরু হয়। সহজভাবে ভাগ করে বললে,
স্বামী / বাবার কাছ থেকে এক্সপেকটেশন, দায়িত্বশীল হওয়া (অর্থনৈতিক ও সিদ্ধান্তে) পরিবারকে নিরাপদ রাখা আবেগগত সাপোর্ট দেওয়া কঠিন সময়ে স্থির থাকা পরিবারকে সময় দেওয়া।
স্ত্রী / মায়ের কাছ থেকে এক্সপেকটেশন, যত্নশীল ও সহানুভূতিশীল হওয়া। ঘর ও সম্পর্ক ম্যানেজ করা। সন্তানদের ভালোভাবে গাইড করা।মানসিক শান্তি তৈরি করা।পরিস্থিতি সামলাতে ধৈর্য রাখা।
সন্তানের কাছ থেকে এক্সপেকটেশন, শৃঙ্খলা মানা। পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের জন্য মনোযোগী হওয়া। বড়দের সম্মান করা। ধীরে ধীরে দায়িত্ব নেওয়া শেখা। ভুল থেকে শেখার মানসিকতা রাখা।
শ্বশুর-শাশুড়ির কাছ থেকে এক্সপেকটেশন, সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়া পরিবারে সমন্বয় বজায় রাখা।নতুন সদস্যদের মানিয়ে নেওয়া। অভিজ্ঞতা দিয়ে গাইড করার সুযোগ পাওয়া।
অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ কম পাওয়া।
ভাই-বোন / আত্মীয়দের কাছ থেকে এক্সপেকটেশন, পারস্পরিক সহযোগিতা বিপদে পাশে দাঁড়ানো সম্পর্ক বজায় রাখা অহংকার কম রাখা যোগাযোগ ঠিক রাখা।
সমস্যা তখনই হয় যখন এক্সপেকটেশন বলা হয় না, কিন্তু ধরে নেওয়া হয় সবাই বুঝে যাবে।
আর সমাধান শুরু হয় তখনই,যখন প্রত্যেকে নিজের রোল + অন্যের সীমা দুটোই বুঝতে শেখে।
মানিয়ে চলা মানে নিজের ইচ্ছা গিলে ফেলা না।এটা হলো সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে স্মার্ট ব্যালান্স শেখা।বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন কিছু টিপস দিচ্ছি,
সবকিছু আমি বুঝি মনোভাব বাদ দাও। সবাই সবসময় একভাবে চিন্তা করবে না। এটা মেনে নিলেই অর্ধেক ঝামেলা কমে যায়।
কথা না জমিয়ে ছোট করে বলো। অভিমান বা সমস্যা জমে গেলে পরে সেটা বড় হয়। সময়মতো শান্তভাবে বললে সম্পর্ক হালকা থাকে।
তুমি কেন এমন? না বলে আমি কেমন অনুভব করছি, বলো। অভিযোগের ভাষা বদলালে মানুষ ডিফেন্সে যায় না, শুনতে চায়।
ছোট ছোট ছাড় দেওয়ার অভ্যাস গড়ো।সব বিষয়ে জেতা জরুরি না।কিছু জায়গায় ছাড় দেওয়াই সম্পর্ককে জিতে রাখে।
অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করো।তুমি যেটা স্বাভাবিক ভাবো,অন্যের কাছে সেটা কঠিন হতে পারে। এই জায়গাটা বুঝতে পারাই ম্যাচিউরিটি।
সীমা (বাউন্ডারি ) পরিষ্কার রাখো।মানিয়ে চলা মানে নিজেকে হারানো না।কোথায় না বলতে হবে সেটা জানা জরুরি।
রেসপেক্টকে প্রাধান্য দাও, ইগোকে না।ইগো সম্পর্ক ভাঙে, সম্মান সম্পর্ক বাঁচায়।
মানিয়ে চলা মানে নিজেকে ছোট করা না। এটা হলো সম্পর্ককে বড় করার জন্য নিজের আচরণকে স্মার্টভাবে অ্যাডজাস্ট করা।