পরিবারের সঙ্গে ‘লো কন্টাক্ট’: সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা, নাকি দূরত্বের রাজনীতি?

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

“সংসারের সুখ-দুঃখের হাজারো ঢেউয়ের মাঝেও যে পরিবারটি একসঙ্গে হাসতে ও কাঁদতে জানে, সেখানেই প্রকৃত স্বর্গ নেমে আসে..” —এই কথার মধ্যে পরিবারের যে চিরন্তন সত্য লুকিয়ে আছে, তা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেন আরও বেশি করে আমাদের নাড়া দেয়। কারণ পরিবার শুধু একই ছাদের নিচে বসবাস করা কয়েকজন মানুষের সমষ্টি নয়; পরিবার মানে একে অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া, দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অভিমান করা, আবার সেই অভিমান ভেঙে কাছে ফিরে আসা। একসময় আমাদের সমাজে একান্নবর্তী পরিবার ছিল পরিচিত ছবি। বড় সংসারে ব্যক্তিগত পরিসর কম থাকলেও একাকিত্ব ছিল না। কারও অসুখে পুরো পরিবার চিন্তিত হতো, উৎসব মানেই ছিল সবার একসঙ্গে হওয়া।


পরবর্তীতে ছোট পরিবারে এসেছে স্বাচ্ছন্দ্য, তবে সম্পর্কেও এসেছে নতুন সমীকরণ। শারীরিক দূরত্বের সঙ্গে বদলেছে মানসিক যোগাযোগের ধরন। প্রতিদিনের দেখা এখন ফোনে সীমাবদ্ধ।


প্রযুক্তি যোগাযোগ বাড়ালেও ঘনিষ্ঠতার জায়গাটিতে কিন্তু স্পেস থেকেই যাচ্ছে। একজন মা সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত মেসেজে কথা বললেও তার জীবনের খবর নাও জানতে পারেন। পারিবারিক গ্রুপে ছবি ও শুভেচ্ছা বিনিময় হলেও গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো অনুচ্চারিত থেকে যায়। অর্থাৎ যোগাযোগ আছে, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা আগের মতো নেই।


এই পরিবর্তনের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে ‘লো কনট্যাক্ট’ (Low Contact) পরিবার বা পারিবারিক সম্পর্ক। শব্দটি সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো শোনালেও তা নয়। ‘নো কনট্যাক্ট’ যেখানে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, ‘লো কনট্যাক্ট’ সেখানে সম্পর্ক রেখে যোগাযোগ কমিয়ে আনে। অর্থাৎ, সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সীমারেখার ভেতরে।


পরিবার বদলেছে, বদলেছে সম্পর্কের ভাষা। এখন হয়তো দূরত্ব রেখেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই নতুন বাস্তবতা। কিন্তু সত্যিই কি দূরে থেকেও কি কাছের মানুষ থাকা যায়?


লো কনট্যাক্ট ফ্যামিলি আসলে কী?


সম্প্রতি দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক ফিচারে উঠে এসেছে এই প্রবণতার কথা, যার ধরণ হয়তো অনেকের কাছেই অচেনা ছিল না, তবু নামটা নতুন। সহজ বাংলায় লো কন্টাক্ট বা সীমিত যোগাযোগ  বলতে, সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে, ইচ্ছাকৃতভাবে যোগাযোগ ও মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া।


ধরুন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান তার বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন ফোন না করে সপ্তাহে একবার কথা বলছে, ব্যক্তিগত বিষয় আর শেয়ার করছে না, পারিবারিক অনুষ্ঠানে প্রয়োজন হলে যাচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘ সময় থাকছে না, নিজের জীবন, সম্পর্ক বা সিদ্ধান্তে বাবা-মায়ের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমাচ্ছে, মেসেজের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে না দিয়ে নিজের সুবিধামতো দিচ্ছে, দেখা করার সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ সম্পর্ক শেষ নয়, কিন্তু সম্পর্কের ভেতর এক্সেস বা প্রবেশাধিকার কমে যাচ্ছে।

 

গার্ডিয়ানের সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৪০-এর কোঠায় থাকা মেরির গল্প। সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের পর মায়ের ফোনই তার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করত। থেরাপির পর তিনি যোগাযোগ কমিয়ে দেন—ফোন ধরা বন্ধ করেন, মায়ের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করেন, প্রয়োজন ছাড়া নিজে থেকে যোগাযোগও করেন না। ব্যক্তিগত বিষয় শেয়ার করাও বন্ধ করেন। কিন্তু সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেননি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং সন্তানদের সঙ্গে নানির সম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছা থেকেই তিনি ‘নো কনট্যাক্ট’-এর বদলে বেছে নেন ‘লো কনট্যাক্ট’।


এখানে সম্পর্ক শেষ নয়, শুধু সম্পর্কের মধ্যবর্তী দরজাটা একটু ভেজানো।


কেন এমন হচ্ছে?


একটা সময় ছিল, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে—এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত পছন্দের সুযোগ খুব কম ছিল। বাবা-মা মানেই শ্রদ্ধা, ভাই-বোন মানেই আজীবনের সম্পর্ক, পরিবার মানেই যত কষ্টই হোক মানিয়ে নেওয়া। কিন্তু এখন সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা বদলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমন হচ্ছে?


এখানে বিষয়টি বেশ গভীর। এর পেছনে অনেক কারণ হতে পারে—


- বারবার বাউন্ডারি ভাঙা। তুমি কী পরবে, কোথায় যাবে, কাকে বিয়ে করবে—এ ধরনের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ। নিজের ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অন্যের অযাচিত হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণ রোধ করার জন্য দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন হয়।

 

- বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈরী সম্পর্ক থেকে সচেতনতা বাড়ায় অনেকেই এই লো কন্ট্যাক্ট এর প্রতি ঝুঁকছেন।  অপরপক্ষ থেকে ক্রমাগত বিষাক্ত আচরণ, সমালোচনা বা মানসিক আঘাত পাওয়ার কারণে নিজেকে নিরাপদ রাখতে যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়।

 

- তিনি আমার মা-বাবা, এটা যেমন সত্য;  তেমনই এই সম্পর্ক আমাকে কেমন অনুভব করাচ্ছে?—এই প্রশ্নটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। এখন অনেক তরুণ-তরুণী “পরিবার মানেই সবকিছু সহ্য করতে হবে”—এই ধারণাকে প্রশ্ন করছে।

 

- মূল্যবোধের বড় পার্থক্য। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধর্ম, রাজনীতি, জীবনযাপন, বিয়ে, সন্তান নেওয়া তথা পারিবারিক দায়িত্ব এর পুরোনো ধারণার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সংঘাতও হতে পারে। ২০২৬ সালের একটি আলোচনাতেও এবিউজের পাশাপাশি পরস্পরবিরোধী মূল্যবোধ, জীবনধারা এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাতের মতো কারণগুলো সামনে এসেছে।

 

গবেষণা কি বলছে?

 

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা নিয়ে গবেষণা অবশ্য নতুন নয়। 


২০২২ সালে ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি-এর গবেষণায় দেখা যায়, গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের মধ্যে ৬ শতাংশ কোনো একসময় মায়ের সঙ্গে এবং ২৬ শতাংশ বাবার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ বাবা-সন্তানের বিচ্ছিন্নতা মায়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।


আরও সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা শুধু একটি হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের নিজের মতো জীবন বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াও ধীরে ধীরে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়াতে পারে।


বাবা-মায়ের ভালোবাসা কেউই প্রত্যাখ্যান করছেন না; বরং ভালোবাসার সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটিও রাখতে চাইছেন। আর সেখানেই এই সীমারেখা ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


একজন মানুষ বলতে পারেন—


‘তুমি আমার জীবনের অংশ, কিন্তু আমার পুরো জীবনটা তোমার নিয়ন্ত্রণে নয়।’


সব দূরত্ব কি তবে স্বাস্থ্যকর?


উত্তর হলো, না।


লো কন্ট্যাক্ট, শব্দটি শুনলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে সম্পর্কের অন্য পক্ষটি টক্সিক। ২০২৬ সালের গার্ডিয়ান ফিচারে একজন থেরাপিস্ট এই প্রসংগে বলেছেন যে, আজকাল পরিবার ও কাছের মানুষকে খুব সহজেই টক্সিক বা নার্সিসিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ প্রতিটি মতবিরোধ, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অপছন্দের আচরণই কিন্তু এবিউজের মধ্যে পড়ে না।


গার্ডিয়ান -এর মূল ফিচারে এই লো কন্ট্যাক্ট প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক দিন পরই একটি পাল্টা মতামত প্রকাশিত হয়। যেখানে বলা হয়, লো কন্ট্যাক্ট কখনো কখনো হিলিং-এর বদলে নিজেকে সবার মাঝে একাকী বা বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্য হাতিয়ারও হতে পারে।


তবে এখানে একটা বিষয় রয়েছে।


“আমার বাউন্ডারি দরকার”—এবং “আমি সম্পর্কের কোনো সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে সবাইকে বাদ দিচ্ছি”— দুটো কিন্তু এক জিনিস নয়।


মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যেও এ বিষয়ে সতর্কতা আছে। সাইকোলজি টুডে-এর ২০২৬ সালের একটি বিশ্লেষণ বলছে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা- কে নিছক “ট্রেন্ড” হিসেবে দেখা ঠিক নয়; অনেকের জন্য এটি দীর্ঘদিনের কষ্ট ও আত্মরক্ষার সিদ্ধান্ত।


কখনো দূরত্ব সত্যিই প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে যদি সম্পর্কের মধ্যে সহিংসতা, নির্যাতন বা গুরুতর ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। আবার কখনো সামান্য বিরতি, স্পষ্ট সীমারেখা এবং খোলামেলা কথোপকথনেই সম্পর্কের অনেকটা মেরামত সম্ভব। তাই নিজের কাছে নিজের আগে প্রশ্নটি হওয়া উচিত—


‘কেন দূরে যেতে চাই?’


প্রযুক্তি কি পরিবারকে কাছাকাছি এনেছে, নাকি দূরত্ব বাড়িয়েছে?


আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা না হলে কেউ হয়তো সপ্তাহে একবার ফোন করতেন। সেটাই স্বাভাবিক ছিল। এখন হোয়াটস অ্যাপ, ম্যাসেঞ্জার, ভিডিও কল, পারিবারিক গ্রুপ—সব মিলিয়ে যোগাযোগের সুযোগ অসীম। তাই বেশি যোগাযোগ মানেই যে বেশি ঘনিষ্ঠতা তা কিন্তু নয়। প্রযুক্তি যোগাযোগকে এত সহজ করে দেওয়ার আগে পরিবারে অপেক্ষাকৃত কম যোগাযোগকেও স্বাভাবিক ধরা হতো। অর্থাৎ সপ্তাহে একবার ফোন করা মানেই সম্পর্ক খারাপ—এমন নয়। কখনো একটু দূরত্বই সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখতে পারে।


তাহলে কীভাবে সীমারেখা তৈরি করা যায়?


যে কোন সম্পর্কটাকে ‘সব অথবা কিছুই নয়’ হিসেবে না দেখা। সম্পর্কের কিছু নিয়ম ঠিক করা যায়, কথা বলার সময় নির্দিষ্ট করা যায়, প্রয়োজনে দেখা করার সময় কমানো যায়। প্রয়োজনীয় খবর আদান-প্রদান করা যায়, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি নয়।


আর সবচেয়ে জরুরি—সীমারেখা টানা মানে শাস্তি নয়। আগে কাছাকাছি থাকা ছিল ভালো সম্পর্কের প্রধান প্রমাণ। এখন অনেকের কাছে নিরাপদ দূরত্বও ভালো সম্পর্কের অংশ হতে পারে।


পরিশেষে বলা যায় যে, লো কন্ট্যাক্ট কোনো সর্বজনীন ব্যবস্থাপত্র নয়। কারও জন্য এটি সঠিক পন্থা, কারও জন্য সাময়িক বিরতি, আবার কারও জন্য সম্পর্ক ভাঙার আগের ধাপ। দূরে সরে গেলে সব সমস্যা মিটে যায়—এমন নয়। বরং অনেকের ক্ষেত্রে মনের মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, জাগে অপরাধবোধ। তাই পরিবার থেকে দূরে যাওয়ার আগে কিংবা কাউকে কাছে টানার আগে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হয়তো একটাই—


‘এই দূরত্ব কি আমাকে সুস্থ রাখছে, নাকি শুধু একটি কঠিন কথোপকথন এড়িয়ে যেতে সাহায্য করছে?’


কারণ কখনো দূরে সরে যাওয়া নিজেকে বাঁচানো। আবার কখনো একটু থেমে, সীমারেখা এঁকে, কথা বলার সাহস করাটাই হতে পারে সম্পর্কটাকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad