"এখন তো সময় ভালোবাসার,
এ দুটি হৃদয় কাছে আসার…”
কত বছর হয়ে গেল গানটি শোনা হয় না নতুন করে? অথচ কোথাও যেন পুরোনো হয় না তার সুর। গানটি বেজে উঠলেই গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এই গানের সুরে চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে সেই মুখ—চোখে দুষ্টু-মিষ্টি চাহনি, ঠোঁটের কোণে সেই চেনা হাসি, এলোমেলো চুল আর এক অদ্ভুত তারুণ্যের দীপ্তি।
বলছি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘রাজপুত্র’ হিসেবে খ্যাত সালমান শাহর কথা।
মনে হয়, এই তো সেদিন, বাংলা সিনেমার পর্দায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক তরুণ। তাঁর চোখে ছিল স্বপ্ন, মুখে ছিল হাসি, আর অভিনয়ে ছিল এমন এক স্বতঃস্ফূর্ততা, যা খুব সহজেই জায়গা করে নিয়েছিল দর্শকের হৃদয়ে।
কিন্তু বাস্তবে কালের স্রোতে সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
তিন দশক!
এতটা সময়ে একটি প্রজন্ম বড় হয়ে যায়। বদলে যায় সিনেমার ভাষা, বদলে যায় নায়ক হওয়ার সংজ্ঞা, বদল ঘটে মানুষের রুচিতেও। নতুন নতুন নায়ক আসেন, নতুন গল্প আসে, পর্দার রং বদলায়।
কিন্তু সালমান শাহ?
অনন্তকাল ধরে তিনি যেন দাঁড়িয়ে আছেন সেই একই জায়গায়, সেই একই বয়সে, সেই একই তারুণ্যে।
আজ ১৯ সেপ্টেম্বর, সালমান শাহ'র জন্মদিন। আজ তিনি বেঁচে থাকলে ৫৫-তে পা দিতেন, কিন্তু দর্শকের স্মৃতিতে তিনি সেই তরুণ সালমান—চিরসবুজ, চিরতরুণ হয়ে বেঁচে আছেন আজো আমাদের প্রজন্মের আবেগে।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল ৭টায় সিলেটের জকিগঞ্জে জন্মেছিলেন শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন, যাঁকে পর্দার মানুষ চিনেছিল সালমান শাহ নামে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সালমানের জন্ম। তার ডাক নাম ইমন। নামটি রেখেছিলেন তার মা নীলা চৌধুরী।
বাল্যকাল খুলনাতে কাটানোর দরুন পড়াশুনা করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। একই স্কুলে চিত্রনায়িকা মৌসুমী তার সহপাঠী ছিলেন। পরবর্তীতে ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ থেকে বি.কম পাস করেন।
অভিনয় জগতে নক্ষত্রের উত্থান
সালমান শাহ সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে পাবলিক টেলিভিশন বিটিভি তে হানিফ সংকেত এর ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদি-এর জন্য একটি মিউজিক ভিডিওর মডেল হিসেবে পর্দায় আবির্ভাব ঘটান। পরে বেশ কয়েকটি টিভি বিজ্ঞাপনে কাজ করেন এবং বিভিন্ন স্টেজ শোতে মডেল হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
চলচ্চিত্র নয়, টেলিভিশন নাটক দিয়েই তার অভিনয়জীবনের শুরু। মঈনুল আহসান সাবেরের লেখা ধারাবাহিক 'পাথর সময়'-এ ছোট একটি চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের নজরে আসেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে সালমান শাহ চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পান।
প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আনন্দ মেলা তিনটি হিন্দি ছবি সনম বেওয়াফা, দিল ও কেয়ামত সে কেয়ামত তক এর মেধাস্বত্ব নিয়ে সোহানের কাছে আসে এর যে-কোনো একটির বাংলা পুনঃনির্মাণ করার জন্য। কিন্তু তিনি উক্ত ছবিগুলোর জন্য উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা খুঁজে না পেয়ে সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। নায়িকা হিসেবে মৌসুমীকে নির্বাচিত করলেও নায়ক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে সালমান শাহ এর সন্ধান পেলে, প্রথম দেখাতেই তাঁকে পছন্দ করে ফেলেন পরিচালক এবং সনম বেওয়াফা ছবির জন্য প্রস্তাব দেন। কিন্তু 'কেয়ামত সে কেয়ামত তক' ছবিটি সালমান শাহের এতোই প্রিয় ছিলো যে, সেখানে অভিনেয়র জন্য সালমান অনুরোধ করলে শেষ পর্যন্ত পরিচালক সোহানুর রহমান তাঁকে নিয়ে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' সিনেমাটি মুক্তি পায় — সেটি ছিল এক বিস্ফোরণ। ড্যাশিং লুকের সালমান শাহ ও মিষ্টি মেয়ে মৌসুমী জুটির সেই ছবি রাতারাতি বাংলা চলচ্চিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে মৌসুমীর বিপরীতে তিনি আরও তিনটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ছবি তিনটি হলো 'অন্তরে অন্তরে', 'স্নেহ' ও 'দেনমোহর।'
চলচ্চিত্রে সাফল্য
তাঁর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জহিরুল হক ও তমিজউদ্দিন রিজভী পরিচালিত "তুমি আমার" চলচ্চিত্রটি ব্যবসাসফল হয়। এই চলচ্চিত্রে প্রথমবারের মতো তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন শাবনূর। শাবনূরের সাথে তার সাথে জুটি বেঁধে একে একে "সুজনসখি", "বিক্ষোভ", "স্বপ্নের ঠিকানা", "বিচার হবে", "তোমাকে চাই", "স্বপ্নের পৃথিবী", "চাওয়া থেকে পাওয়া", "আনন্দ অশ্রু" সহ মোট ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সবকটি ছবি ব্যবসাসফল হয়। শাবনূরের সঙ্গে জুটি বেঁধে উপহার দেয়া ছবিগুলো আজও দর্শকের মনে গেঁথে আছে।
তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যবসাসফল ছবির মধ্যে শাবনাজ এর সাথে "আশা ভালবাসা" ও "মায়ের অধিকার", লিমা এর সাথে "প্রেমযুদ্ধ" ও "কন্যাদান", শিল্পী এর সাথে "প্রিয়জন", শাহনাজ এর সাথে "সত্যের মৃত্যু নেই" এবং বৃষ্টি এর সাথে "এই ঘর এই সংসার" অন্যতম।
বাণিজ্যিকভাবে সফল একাধিক চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজেকে বাংলাদেশী সিনেমার অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার তিনটি চলচ্চিত্র, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং ‘কেয়মত থেকে কেয়মত’ ঢালিউড বক্স অফিসের সর্বকালের শীর্ষ দশ সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে।
সালমান শাহ মৃত্যুর আগে 'মন মানে না' ছবির ৫০ শতাংশ কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর চিত্রনায়ক রিয়াজ কে দিয়ে ছবিটি করানো হয়। এছাড়াও 'কে অপরাধী', 'তুমি শুধু তুমি', 'প্রেমের বাজি' সহ একাধিক মুভি সালমান শাহ অর্ধেক শুটিং করে মারা যান। পরবর্তীতে 'প্রেমের বাজি' ব্যতীত বাকি সিনেমাগুলি অন্য নায়কদের দিয়ে নতুন করে শুটিং করা হয়। সালমানের অসমাপ্ত সিনেমার মধ্যে একমাত্র 'প্রেমের বাজি' সিনেমার কাজ পরে আর শেষ হয় নি।
স্টাইলের রাজপুত্র
সালমান শাহ ছিলেন নব্বই দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমন এক ধূমকেতু, যিনি তৎকালীন চেনা ফ্যাশন ও লুকের ব্যাকরণ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে বেশিরভাগ নায়কই চলচ্চিত্রের প্রযোজনা সংস্থা বা পরিচালকদের দেওয়া পোশাক পরতেন। কিন্তু সালমান শাহ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। শোনা যায়, তিনি নিজের সিনেমার পোশাকের কাপড় নিজে কিনতেন এবং দর্জিবাড়িতে বসে মনের মতো ডিজাইন করিয়ে নিতেন। ফলে তার পোশাকে থাকতো আধুনিক ওয়েস্টার্ন কাটিং ও নিজস্ব রুচির ছাপ।
তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা ট্রেন্ডসেটার। যখন ঢালিউডের নায়কেরা চওড়া কলারের শার্ট বা গতানুগতিক ফরমাল পোশাকে অভ্যস্ত ছিলেন, সালমান সেই পরিচিত ছাঁচে নিজেকে আটকে রাখেননি। পর্দায় নিয়ে আসেন বিশ্বমানের ফ্যাশন। তার পরনে দেখা যেত ছেঁড়া বা ফেডেড জিন্স (Ripped/Faded Jeans), স্লিভলেস ডেনিম জ্যাকেট এবং রঙিন গ্রাফিক্স টি-শার্ট।
সালমান শাহই প্রথম বাংলাদেশের পর্দায় ছেলেদের সাজগোজের অনুষঙ্গকে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে যান। মাথায় রঙিন ব্যান্ডানা (Bandana) বা স্কার্ফ পেঁচানো, মধ্যপ্রাচ্যের হাজি রুমালকে ফ্যাশনেবল উপায়ে মাথায় বা গলায় জড়ানো, কানে ছোট রিং পরা এবং জিন্স প্যান্টের হাঁটুতে রুমাল বাঁধার আইকনিক স্টাইলগুলো তিনিই চালু করেছিলেন।
সব ধরনের ফ্রেমের চশমাই তার মুখে দারুণ মানাতো। ছবিতে তিনি রাউন্ড ফ্রেমের কালো রোদচশমা, অ্যাভিয়েটর বা ক্লাব মাস্টার সানগ্লাস ব্যবহার করতেন। পোশাকের সাথে ম্যাচ করে ভিন্ন রঙের কন্ট্যাক্ট লেন্স (Contact Lense) ব্যবহারের সাহসও তিনি ওই সময়ে দেখিয়েছিলেন।
তাঁর ব্যাক ব্রাশ করা চুল, মাথায় ব্যান্ডনা, ডান হাতে ঘড়ি, বাহারি ডিজাইনের টুপি বা হ্যাট, এবং ট্রেন্ডি চশমা সে সময় ফ্যাশনের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিল।
শুধু পর্দায় নয়, তাঁর চলাফেরা, জীবনযাপনের স্টাইল এবং নিজেকে উপস্থাপনের ধরন পুরো একটি প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
প্রেমের নায়ক
সালমান শাহ'র কথা উঠলে প্রেমের কথা আসবে না, তা তো হতেই পারেনা। রোমান্টিক ঘরানার ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল এক কথায় দুর্দান্ত। মৌসুমীর সঙ্গে প্রথম ছবি 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত', তারপর 'অন্তরে অন্তরে' দুটোই ছিল ব্যাক টু ব্যাক হিট। এরপর শাবনূরের সঙ্গে একের পর এক জনপ্রিয় জুটি। ‘তুমি আমার’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘আনন্দ অশ্রু’—সিনেমাগুলোর নাম উচ্চারণ করলেই যেন নব্বইয়ের দশকের সেই রঙিন সময়টা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সিনে পর্দায় তিনি শুধু নায়িকার প্রেমে পড়তেন না; দর্শকও তাঁর চরিত্রের প্রেমে পড়ে যেত। কখনো অভিমানী, কখনো দুরন্ত, কখনো রোমান্টিক—চরিত্রের ভেতরের আবেগকে তিনি চোখে-মুখে অভিব্যক্তির মাধ্যমে খুব স্বাভাবিকভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতেন।
আর তাঁর হাসি?
সেটা যেন আলাদা একটা গল্প। তাঁর ভুবনভুলানো হাসিতে তরুনীরা কুপোকাত হয়নি এমন মেলা ভার।
যে সালমান শাহ নিজের ক্রেজ তৈরি করেছিলেন রোমান্টিক ছবির নায়ক হিসেবে, সেই এরপর হাজির হলেন অ্যাকশন ছবির নায়ক হয়ে। পরিচালক মোহাম্মদ হান্নান সুপারহিট রোমান্টিক ছবির নায়ক সালমান কে নিয়ে তৈরি করেন বাংলাদেশের অন্ধকার ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ ‘বিক্ষোভ’ ছবিটি। বরাবরের মতো বক্স অফিসেও হিটের তকমা পায় ছবিটি।
শুধু তাই নয়, শহুরে ফ্যাশন ও রোমান্টিক নায়কের ইমেজ ভেঙে তিনি গ্রামীণ চরিত্রের সহজ-সরল জীবন ফুটিয়ে তুলেছিলেন 'সুজন সখী', 'দেনমোহর' ছবিতে। পারিবারিক বন্ধন ও আবেগভিত্তিক গল্পগুলোতেও সালমান শাহ তাঁর সাবলীল অভিনয় দক্ষতা দেখিয়েছেন 'এই ঘর এই সংসার', 'জীবন সংসার', 'মায়ের অধিকার', 'আনন্দ অশ্রু' ছবির মাধ্যমে।
খুব অল্প সময়ের স্বল্প গল্প
১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬।
পঁচিশ বছরের জীবনে কাজ করেছেন মাত্র চার বছরের মতো। এই অল্প সময়েই তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন বলে বিভিন্ন চলচ্চিত্র-তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হয়। সেই স্বল্প সময়েই একজন বাংলাদেশী প্রধান অভিনেতা কেমন হতে পারেন, তিনি তার সংজ্ঞা নতুন করে দিয়েছিলেন।
রঙিন পর্দায় নিজের জায়গা করে নিতে একজন শিল্পীকে কত কাঠখড়ই না পোড়াতে হয়! বছরের পর বছর কত অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়- তারপরও সাফল্যের নিশ্চয়তা থাকে না। সেখানে সালমান শাহ এর আবির্ভাব যেন এক ধুমকেতুর মতো- হঠাৎ, উজ্জ্বল এবং চোখ ধাঁধানো। প্রথম সিনেমা থেকেই এমন সাড়া, যা অনেক শিল্পীর দীর্ঘ ক্যারিয়ারেও আসে না। এতো অল্প সময়ে এই পজিশনে আসা যেন তিনি চলচ্চিত্রে এসেছিলেন নিজের জন্য জায়গা তৈরি করতে নয়, বরং এসে জায়গাটার সংজ্ঞাটাই বদলে দিতে।
মাত্র তিন বছর, অথচ রেখে গেলেন তিন দশকের স্মৃতি। তাঁর ক্যারিয়ার ১৯৯৩-১৯৯৬; ভয়ংকর রকম ছোট। কিন্তু সেই সময়ের মধ্যেই এত গভীর ছাপ যেন প্রশ্ন করে যায়,
“একজন শিল্পীকে অমর হতে কত বছর লাগে?”
তিন দশক পরও কেন তিনি আমাদের?
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার ইস্কাটনের বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে থেমে যায় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের যাত্রা। তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিয় নায়কের মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক তরুণ-তরুণী ও ভক্ত চরম মানসিক আঘাত পান এবং আত্মহনন করেন। ভাবা যায়!
মানুষটি চলে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু যত সময় গেছে, ততই যেন তিনি আরও গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছেন আমাদের মনের ভেতর। কারও শৈশবের নায়ক হয়ে, কারও কৈশোরের স্বপ্ন হয়ে, কারও প্রথম প্রেমের গান হয়ে। আর কারও কাছে হয়তো মায়ের মুখে শোনা সেই নায়কের গল্প, যাঁকে নিজে বড় পর্দায় দেখার সুযোগই পায়নি। এভাবেই একজন শিল্পী এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যান।
সময় বদলেছে, চলচ্চিত্রের রূপরেখাতেও পরিবর্তন ঘটেছে। নায়ক তো অনেক এসেছেন, কিন্তু সালমান শাহ কেন একজনই? কেন তিন দশক পরে এসেও তাঁর আবেদন কমেনি?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অভিনয় প্রতিভা এবং বৈপ্লবিক শৈলীর মধ্যে, যা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাপটকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
নব্বই দশককে প্রায়শই 'সালমান শাহের যুগ' হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তরুণ দর্শকরা তাঁকে ভালোবাসত, তাঁর মতো করে পোশাক পরত, তাঁকে অনুসরণ করত, তাঁর মতো হতে চাইতো।
ফ্যাশন আইকন ছাড়াও, পর্দায় তিনি ছিলেন এক সহজাত অভিনেতা। প্রথম চলচ্চিত্র 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত'-এ তাঁর সাবলীল অভিনয় দেখে মনেই হয়নি, বড় পর্দায় এটাই তাঁর প্রথম অভিনয়। প্রতিটি চরিত্রে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করার অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল তাঁর মধ্যে। সব ধরনের দর্শকের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল নতুন, তাঁর অভিনয়ের ধরন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, আর তাঁর চেহারা ও স্টাইল যেন নব্বইয়ের দশকের দর্শকের সামনে হাজির করেছিল নায়ক হওয়ার এক নতুন সংজ্ঞা।
নিজের অভিনয়শৈলী, পরিশ্রম আর কাজের প্রতি গভীর নিবেদনের মধ্য দিয়ে দর্শকদের জন্য নিজেকে উজাড় করে কাজ করে গেছেন সালমান শাহ। দর্শকরাও তাঁকে বিমুখ করেননি। বরং তাঁর প্রতিটি নতুন উপস্থিতি যেন দর্শকের ভালোবাসাকে আরও গভীর করেছে। যে জায়গায় পৌঁছাতে অনেক শিল্পীর বছরের পর বছর লেগে যায়, সালমান শাহ সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন মাত্র কয়েক বছরের পথচলায়। আর সেই পথচলা থেমে গেলেও, দর্শকের ভালোবাসার পথটি আর কখনো থামেনি।
এখনো সিলেটের হযরত শাহজালালের দরগাহ সংলগ্ন কবরস্থানে ভক্তদের ভিড় লেগে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে তার অগণিত ফ্যান ক্লাবের সংখ্যা। প্রতিবছর ১৯ সেপ্টেম্বর এলেই ভক্তদের মনে ফিরে আসে প্রিয় নায়কের স্মৃতি; ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি, সিনেমার দৃশ্য আর গান।
সালমান শাহ তাই শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়। একটি প্রজন্মের আবেগের নাম। একটি সময়ের নাম। এমন এক তারুণ্যের নাম, যার বয়স ক্যালেন্ডারে বাড়েনি—থেমে গেছে ২৪-এ।
আজ তাঁর জন্মদিনে, সেই স্বপ্নের নায়ককে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। আর মনের অজান্তেই যেন বেজে ওঠে তাঁরই সেই গান—
“ভালো আছি, ভালো থেকো,
আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও…”
কত অদ্ভুত! যে গান ঘিরে ছিল ভালোবাসার, আজ তাঁর স্মৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে লাইনগুলো যেন অন্য এক অর্থ বহন করে। তিনি চলে গেছেন এমন এক ঠিকানায়, যেখানে আমাদের কোনো চিঠি পৌঁছায় না। তবু ভালোবাসার মানুষরা কি সত্যিই দূরে চলে যান? তিনি আছেন তাঁর সিনেমার গানে, পুরোনো দৃশ্যের হাসিতে, প্রজন্মের স্মৃতিতে; আছেন সেইসব মানুষের হৃদয়ে, যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছিলেন, আর আজও ভালোবাসেন।
সময় তাঁকে থামিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা থামাতে পারেনি।