‘আমরা অনেক সময় গাইলে মনে হয়, মুখ থেকে গাই; কিন্তু ফরিদার লালনের গান শুনলে মনে হতো, একেবারে ভেতর থেকে গায়।’—অগ্রজ সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে লালনসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ফরিদা পারভীনের গায়কির গভীরতা। তাঁর কাছে গান ছিল কেবল সুর-তাল আর শব্দের সমন্বয় নয়; গান ছিল অনুভবের বিষয়, আত্মার সঙ্গে কথোপকথন।
আজ ফরিদা পারভীনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এক বছর পেরিয়ে গেল তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতির। কিন্তু তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা লালনের দর্শন, তাঁর গায়কির স্বতন্ত্রতা আর সংগীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠা এখনো শ্রোতাদের মনে অমলিন।
ফরিদা পারভীন ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি গানকে শুধু গাইতেন না, উপলব্ধি করতেন। ফেরদৌসী রহমানের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সেই কথাই—‘গানের কথা উপলব্ধি করে গাইত। প্রতিটি লাইনের সারমর্ম বুঝে, গভীর থেকে, একদম হৃদয় দিয়ে গাইত ফরিদা।’
লালনসংগীতের ক্ষেত্রে এই উপলব্ধিই ছিল ফরিদা পারভীনের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাউলসম্রাট লালন শাহের দর্শননির্ভর গানকে তিনি এমনভাবে কণ্ঠে তুলে আনতেন, যেখানে শব্দের পাশাপাশি শ্রোতা অনুভব করতেন জীবনের প্রশ্ন, আত্মঅনুসন্ধান, মানবতাবোধ আর দর্শনের গভীরতা।
ফরিদা পারভীনের সঙ্গে ফেরদৌসী রহমানের সম্পর্কও ছিল বিশেষ। পাঁচ দশকের বেশি সময়ের সেই সম্পর্ক কেবল সহকর্মী বা সংগীতজগতের দুই শিল্পীর সম্পর্ক ছিল না; ছিল বড় বোন ও ছোট বোনের মতো আন্তরিক এক বন্ধন। দীর্ঘ সময়ের পথচলায় তাঁরা দেখেছেন সংগীতজগতের নানা পরিবর্তন, অর্জন ও উত্থান-পতন। সেই দীর্ঘ সম্পর্কের স্মৃতিতে তাই ফরিদা পারভীন শুধু একজন শিল্পী নন, একজন আপন মানুষও।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে লালনসংগীতকে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান পেয়েছে আলাদা এক আবেগ, আলাদা এক ব্যঞ্জনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, লোকসংগীত কেবল গ্রামবাংলার মাটির সঙ্গে যুক্ত কোনো ধারাই নয়; সঠিক উপস্থাপনায় তা হয়ে উঠতে পারে মানুষের অন্তর্জগতের ভাষা।
ফরিদা পারভীনের গায়কির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সরলতা। কণ্ঠে অযথা কারুকাজের চেয়ে তিনি গুরুত্ব দিতেন গানের ভাব ও বাণীকে। ফলে তাঁর পরিবেশনায় লালনের গান কখনো কেবল গান হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে একেকটি অনুভবের মুহূর্ত।
তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। কারণ শিল্পী অনেকেই আসেন, গানও অনেকেই করেন; কিন্তু এমন কিছু কণ্ঠ থাকে, যাদের গায়কির সঙ্গে মানুষের স্মৃতি, আবেগ ও সংস্কৃতির একটি দীর্ঘ অধ্যায় জড়িয়ে যায়। ফরিদা পারভীন ছিলেন তেমনই একজন।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই বারবার ফিরে আসে তাঁর গান। ফিরে আসে তাঁর কণ্ঠের সেই গভীরতা। আর ফিরে আসে ফেরদৌসী রহমানের সেই মূল্যায়ন—ফরিদা গান গাইতেন ‘একেবারে ভেতর থেকে’।
শরীরী উপস্থিতি নেই, কিন্তু গান তো থেমে থাকে না। লালনের দর্শন যতদিন মানুষের মনে প্রশ্ন তুলবে, মানবতার কথা বলবে, ততদিন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠও ফিরে ফিরে শোনা যাবে। তাঁর গাওয়া গানেই তিনি থেকে যাবেন—শ্রোতার হৃদয়ে, বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে এবং লালনের দর্শনের অনুরণনে।