উদ্বোধনের পর থেকেই পিংক বাসে ওঠার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠেনি। আজ কারওয়ান বাজার থেকে দূরে বাসটি চোখে পড়তেই আর দেরি করলাম না। পায়ের সমস্যার কথাও ভুলে দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়লাম পিংক বাসে।
বাসের পেছনের দরজা দিয়ে উঠে প্রথমেই চোখে পড়ল এক মধ্যবয়সী নারীকে। বাসের
সিটে তিনি এমন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলেন, যেন বাইরের কোলাহল কিংবা যাত্রাপথের কোনো দুশ্চিন্তাই
তাঁকে স্পর্শ করছে না। দৃশ্যটি দেখে মনে হলো, নারীদের জন্য আলাদা এই বাস হয়তো তাঁর
মনে নিরাপত্তার একটি অনুভূতি তৈরি করেছে। সেই ভরসা থেকেই হয়তো এমন নিশ্চিন্ত ঘুম।
বাসের একেবারে সামনের দিকে গিয়ে বসলাম। মাথায় সবুজ স্কার্ফ, পরনে লাল শার্ট
ও সবুজ প্যান্ট। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পায়ে কেডস। এভাবেই যাত্রীদের হ্যান্ডহেল্ড টিকিট
প্রিন্টার থেকে টিকিট দিচ্ছিলেন পিংক বাসের নারী কন্ডাক্টর। পোশাকে ছিল রঙের উজ্জ্বলতা,
আর দায়িত্ব পালনে ছিল বেশ তৎপরতা।
নারী কন্ডাক্টর এসে টিকিট দিয়ে ১০ টাকা ভাড়া নিলেন। এরপর তিনি দোতলায় যাচ্ছেন
জানিয়ে দেখে আসতে চাইলেন, বাসে কোনো পুরুষ যাত্রী উঠেছেন কি না। ফিরে এসে চালককে জানালেন,
তিনজন পুরুষ উঠেছেন। তাঁরা নাকি ফার্মগেটে নেমে যাবেন।
এরপর বাসের চালকের পাশে এক মধ্যবয়সী পুরুষকে দেখে কিছুটা অবাক হলাম। কৌতূহল
সামলাতে না পেরে চালকের আসনের কাছে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এখানে কেন? ’
তিনি জানালেন, সড়কে পিংক বাস নতুন। নারী চালক দেখে অনেকে বাসের সঙ্গে ধাক্কা
লাগানোসহ নানা ঝামেলা করেন। আবার গাড়ির চাকা পরিবর্তন করার মতো কাজও থাকে। সেসব কাজে
তিনি সহায়তা করেন।
তাঁর কথা শুনে বুঝলাম, নারী চালকেরা শুধু গাড়ি চালানোর দায়িত্বই পালন করছেন
না; নতুন এই ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাঁদের নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে
হচ্ছে।
এদিকে নারী চালককে দেখলাম বেশ আনন্দের সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছেন। তাঁর মুখে
ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। হাসিমুখে বললেন, ‘ড্রাইভিং পেশায় এসে আমার খুব ভালো লাগছে।
আমি এখন গাড়ির চাকাও পরিবর্তন করতে পারি।’
জানালেন, সকাল আটটা-নয়টার দিকে কাজে আসেন। তাঁর কথা শুনে মনে হলো, গাড়ি
চালানো তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা নয়; নিজের সক্ষমতা আবিষ্কার করারও একটি অভিজ্ঞতা।
চালকের সঙ্গে কথা শেষ করে নিজের আসনে ফিরে এলাম। এরই মধ্যে এক পুরুষ হকার
পানি বিক্রি করতে বাসে উঠে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে নারী কন্ডাক্টর তাঁকে নামিয়ে দিলেন।
বললেন, ‘এটা মহিলা বাস, এখানে পুরুষ উঠতে পারবেন না।’
হকার জানতে চাইলেন, তাহলে কি হকারও উঠতে পারবেন না? কন্ডাক্টরের উত্তর,
‘না।’
ঘটনাটি কয়েক মুহূর্তের হলেও পিংক বাসের নিয়মকানুন সম্পর্কে একটি ধারণা
দিল। বাসটির নারী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পরিবেশ বজায় রাখতে কন্ডাক্টর যে সচেতন,
তা তাঁর আচরণেই বোঝা গেল।
সাধারণ লোকাল বাসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হলো, এই বাসটি সড়কে অন্য
বাসের মতো ঘন ঘন থামছে না। নির্দিষ্ট বাস স্টপে থামছে। ফলে দেখতে দেখতে ফার্মগেটে পৌঁছে
গেলাম। সেটিই ছিল আমার গন্তব্য। নেমে পড়লাম বাস থেকে।
যাত্রীদের নামানোর সময় কন্ডাক্টরের আচরণ ছিল সুন্দর ও আন্তরিক। আমি বাসের
ছবি তুলছিলাম। তা দেখে তিনি মিষ্টি হেসে চলে গেলেন।
পিংক বাসে আমার যাত্রার সময় খুব বেশি নয়-মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট। কিন্তু
এই অল্প সময়েই দেখা হলো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকা এক নারী, দায়িত্বশীল এক নারী কন্ডাক্টর
এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গাড়ি চালানো এক নারী চালকের সঙ্গে। কথা হলো বাসের নিরাপত্তা
ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও।
একটি বাসযাত্রা কখনো কখনো শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা
থাকে না। সেই যাত্রা হয়ে ওঠে মানুষের আচরণ, নিরাপত্তাবোধ এবং সম্ভাবনার নতুন দিক দেখার
সুযোগ।
পিংক বাসে এই অল্প সময়ের ভ্রমণ আমার কাছে তেমনই এক অভিজ্ঞতা। বাস থেকে
নেমে মনে হচ্ছিল, মনের মধ্যে বিশেষ এক অনুভূতি তৈরি হয়েছে। হয়তো এই অনুভূতির নাম স্বস্তি,
হয়তো ভরসা-অথবা নারীদের জন্য আরও নিরাপদ যাতায়াতব্যবস্থাপনা
গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখে ভালো লাগা।
ঢাকা/টিএ