ভারতীয় সিনেমায় কিছু অভিনেতা থাকেন, যাঁদের শুধু ‘অভিনেতা’ বললে তাঁদের পরিচয়ের ব্যাপ্তি ধরা যায় না। তাঁরা চরিত্রের ভেতর ঢুকে সেটিকে এমনভাবে জীবন্ত করে তোলেন যে পর্দা শেষ হওয়ার পরও চরিত্রটি দর্শকের মনে থেকে যায়। নানা পাটেকর ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। তাঁর কণ্ঠ, চোখের দৃষ্টি, সংলাপ বলার ভঙ্গি—সবকিছুতেই ছিল আলাদা এক তীব্রতা।
সেই তীব্র কণ্ঠ আজ থেমে গেল। ৭৫ বছর বয়সে চলে গেলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই বরেণ্য অভিনেতা। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজের বাসভবনে গুরুতর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দিয়েও তাঁকে ফেরাতে পারেননি। সকাল ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
মঞ্চ থেকে সিনেমার পর্দায়
নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী অভিনয়ের যাত্রা শুরু করেন থিয়েটার দিয়ে। পরে সিনেমায় এসে নিজের জন্য তৈরি করেন সম্পূর্ণ আলাদা একটি জায়গা।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক। এরপর ধীরে ধীরে ‘পরিন্দা’, ‘অঙ্গার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘ইয়েশবন্ত’, ‘আব তক ছাপ্পান’সহ একের পর এক ছবিতে নিজের অভিনয়ক্ষমতার স্বাক্ষর রাখেন।
‘পরিন্দা’য় তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পর্দায় অপরাধজগতের কঠোর চরিত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম—বিভিন্ন চরিত্রে তিনি এমন বাস্তবতা তৈরি করতেন, যা দর্শককে অস্বস্তিতেও ফেলত, আবার মুগ্ধও করত।
‘ক্রান্তিবীর’-এর আগুন
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ‘ক্রান্তিবীর’। এই ছবির মাধ্যমে তাঁর সংলাপ ও অভিনয়ের শক্তি আরও ব্যাপক দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁর অভিনয়ে ছিল আবেগ, ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও মানবিকতার মিশেল।
তবে নানা কখনো শুধু ‘গম্ভীর অভিনেতা’ হয়ে থাকেননি। তাঁর অভিনয়ের আরেকটি জনপ্রিয় দিক সামনে আসে ‘ওয়েলকাম’ ছবিতে উদয় শেঠির চরিত্রে। একদিকে তীব্র, বাস্তবধর্মী চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পী; অন্যদিকে কমেডির মাধ্যমে দর্শককে হাসিয়ে তোলা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজকে সমান দক্ষতায় ধারণ করেছিলেন তিনি। উদয় শেঠি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় পপ সংস্কৃতিরও পরিচিত চরিত্র হয়ে ওঠে।
পুরস্কারের স্বীকৃতি, দর্শকের ভালোবাসা
নানা পাটেকরের ঝুলিতে রয়েছে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন সম্মাননা। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
কিন্তু একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো দর্শকের স্মৃতিতে টিকে থাকা। নানা পাটেকর সেই জায়গাটি অনেক আগেই অর্জন করেছিলেন।
তাঁর সংলাপ উচ্চারণের নিজস্ব ধরন ছিল। কখনো খুব নিচু স্বর, কখনো বিস্ফোরণের মতো উচ্চারণ—কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন চরিত্রের ভেতর থেকে উঠে আসত। এ কারণেই তাঁর অভিনয় আলাদা করে মনে রাখতেন দর্শকেরা।
পর্দার বাইরেও অন্য এক নানা
নানা পাটেকরকে ঘিরে নানা ধরনের গল্পও রয়েছে। কৃষক পরিবারের প্রতি তাঁর সহায়তা, সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি ঝোঁক এবং চলচ্চিত্রজগতের চাকচিক্য থেকে দূরে থাকার প্রবণতা তাঁকে অন্যরকম পরিচিতি দিয়েছে। সম্প্রতি তাঁর সহকর্মী ও লেখকেরা তাঁর সরলতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নানা স্মৃতিও তুলে ধরেছেন।
মাত্র এক দিন আগেও তাঁর পুরোনো থিয়েটারজীবনের একটি ঘটনা নতুন করে সামনে এসেছিল। অভিনেতা অশোক সরাফ স্মরণ করেছিলেন, কীভাবে এক নাটকের সময় নানা তাঁকে বিপদ থেকে নিরাপদে বের হতে সাহায্য করেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণের পরদিনই এল তাঁর মৃত্যুসংবাদ।
একজন অভিনেতা চলে গেলেন, চরিত্রগুলো থেকে গেল
নানা পাটেকরের চলে যাওয়া শুধু একজন তারকার মৃত্যু নয়; এটি ভারতীয় অভিনয়জগতের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সমাপ্তি। কারণ তিনি এমন এক অভিনয়ভাষা তৈরি করেছিলেন, যা অনুকরণ করা যায়, কিন্তু হুবহু ধারণ করা কঠিন। কখনো তিনি ছিলেন ক্রুদ্ধ মানুষ, কখনো ভেঙে পড়া বাবা, কখনো নির্মম অপরাধী, কখনো সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। আবার কখনো তাঁর সংলাপেই দর্শক খুঁজে পেয়েছে হাসির কারণ। পর্দার আলো নিভে যায়, সিনেমা শেষ হয়, চরিত্রও একসময় গল্পের ভেতরে ফিরে যায়। কিন্তু কিছু অভিনয় থেকে যায় দর্শকের স্মৃতিতে।