অনেক মানুষকে বাইরে থেকে দেখলে একদম স্বাভাবিক মনে হয়। কেউ হাসেন, কাজ করেন, সংসার সামল দেন। দেখলে বোঝার কোনো উপায় থাকে না, তাঁর ভেতরে হয়তো বছরের পর বছর ধরে একটি না-বলা গল্প চাপা পড়ে আছে।
শৈশবে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তেমনই একটি গভীর ক্ষত। শরীরের ক্ষত হয়তো একসময় সেরে যায়, কিন্তু মনের ভেতরের ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ আর প্রশ্নগুলো অনেক সময় থেকে যায় বছরের পর বছর।
শৈশবের নির্যাতনের কিছু সম্ভাব্য লক্ষণ:
প্রত্যেক মানুষ একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। কেউ প্রকাশ্যে কষ্ট প্রকাশ করেন, আবার কেউ বছরের পর বছর সবকিছু স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেন। তবে শৈশবের যৌন নির্যাতনের পর কিছু মানুষের মধ্যে দেখা যেতে পারে, অকারণ ভয়, উদ্বেগ বা সবসময় সতর্ক থাকার অনুভূতি।
দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের সমস্যা
নির্দিষ্ট মানুষ, জায়গা, পরিস্থিতি বা স্পর্শ নিয়ে তীব্র অস্বস্তি।
নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা বা ঘৃণা।
নিজেকে দোষী মনে করা বা বারবার ভাবা,
“আমারই কD দোষ ছিল?”
কোনো ঘটনা বা সময়ের স্মৃতি অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া, অথবা কিছু বিষয় মনে করতে না চাওয়া।
হঠাৎ খুব রেগে যাওয়া, কান্না পাওয়া বা আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা।
মানুষের ওপর বিশ্বাস করতে কষ্ট হওয়া।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভয়, দূরত্ব তৈরি করা বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারা।
নিজেকে মূল্যহীন বা খারাপ মনে করা।
একা থাকতে চাওয়া বা সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
শরীর বা যৌনতা নিয়ে অস্বস্তি, ভয় বা বিভ্রান্তি
কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করার চিন্তা বা আচরণ।
তবে মনে রাখা জরুরি : এসব লক্ষণের কোনো একটি বা একাধিক থাকলেই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে কেউ শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
অন্য অনেক মানসিক বা শারীরিক কারণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই নিজের বা অন্য কারও সম্পর্কে শুধু লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
অনেকেই বড় হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করেন-
“আমি কি কোনোভাবে দায়ী ছিলাম?”
“আমি তখন কিছু করতে পারিনি কেন?”
“আমি কাউকে বলিনি কেন?”
“আমার সঙ্গেই এমন হলো কেন?”
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মনে রাখা জরুরি,
যা ঘটেছিল, তার জন্য শিশুটির কোনো দায় ছিল না।
একটি শিশু কোনো প্রাপ্তবয়স্কের যৌন আচরণের জন্য কখনো দায়ী নয়। সে কী পরেছিল, কোথায় ছিল, কাকে বিশ্বাস করেছিল, প্রতিবাদ করতে পেরেছিল কি না, কোনোটিই নির্যাতনের দায় তার ওপর দেয় না।
দায় নির্যাতনকারীর
তবু অনেক মানুষ সেই দায় নিজের কাঁধে নিয়ে বড় হন। কেউ কাউকে বলতে পারেন না। কেউ ভয় পান বিশ্বাস করবে না। কেউ লজ্জায় চুপ থাকেন। কেউ ভাবেন, এ কথা জানাজানি হলে আমাকেই বিচার করা হবে।
আমি মুখ দেখাবো কি করে।
আমার প্রিয়জনই আমাকে ভুল বুঝবে।
তারপর শুরু হয় এক অদৃশ্য যুদ্ধ বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা, আর ভেতরে নিজের সঙ্গে প্রতিদিন লড়াই।
শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার অনেক মানুষ তাদের কষ্ট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য নিতে পারেন।
আবার অনেকেই পারেন না,সামাজিক ভয়, লজ্জা, পারিবারিক চাপ কিংবা নিজের ভেতরের অপরাধবোধ তাদের থামিয়ে দেয়।
এই কথাগুলো তাদের জন্য:
আপনার কষ্ট সত্যি।
আপনার অনুভূতিগুলো অস্বাভাবিক নয়।
আপনার চুপ করে থাকা সম্মতি ছিল না।
আপনি তখন শিশু ছিলেন।
এবং যা ঘটেছিল, তার জন্য আপনি দায়ী নন।
কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদুন। কষ্ট হলে কষ্টকে অস্বীকার করবেন না।
প্রয়োজন হলে এমন একজন নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষের কাছে বলুন, যিনি আপনাকে বিচার করবেন না।
প্রয়োজনে একজন মানসিক স্বাস্থ্য-পেশাজীবীর সহায়তা নিন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আপনার সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটি আপনার পরিচয় নয়। আপনি শুধু আপনার অতীতের একটি ঘটনা নন।
আপনি বেঁচে আছেন। আপনার অনুভূতির মূল্য আছে। আপনার জীবনের মূল্য আছে।আর যদি এতদিন ধরে নিজের ওপরই সেই ঘটনার দায় চাপিয়ে বেঁচে থাকেন আজ অন্তত নিজেকে একবার বলুন, এটা আমার দোষ ছিল না।
হয়তো এই একটি বাক্য দিয়েই শুরু হতে পারে নিজের প্রতি একটু কোমল হওয়ার পথ।