যুদ্ধের ইতিহাস লিখতে গেলে সাধারণত সামনে আসে সৈনিক, অস্ত্র, রণক্ষেত্র আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের গল্প। কিন্তু যুদ্ধের আরেকটি বড় গল্প লেখা হয়েছে ঘরের ভেতর—নারীদের জীবনে। পুরুষেরা যখন যুদ্ধের ময়দানে গেছেন, তখন ঘর, কর্মক্ষেত্র, কারখানা, হাসপাতাল, কৃষি, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুদ্ধের সম্মুখভাগেও নারীদের ভূমিকা বদলেছে।
কখনো যুদ্ধ নারীদের ঘরের বাইরে এনে কাজের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, কখনো তাদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের পথকে ত্বরান্বিত করেছে। আবার কোনো কোনো যুদ্ধে নারী হয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, বাস্তুচ্যুত মানুষ কিংবা সহিংসতার শিকার। অর্থাৎ যুদ্ধ নারীর জীবনকে একদিকে যেমন বদলেছে, অন্যদিকে সেই পরিবর্তনের মূল্যও কম ছিল না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: ঘর থেকে কর্মক্ষেত্রে
১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের সমাজব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। পুরুষেরা বিপুলসংখ্যায় যুদ্ধে চলে যাওয়ায় তাদের জায়গায় নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়। যুক্তরাজ্যে যুদ্ধের সময় প্রায় ২০ লাখ নারী পুরুষদের ছেড়ে যাওয়া চাকরিতে প্রবেশ করেন। ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে মোট কর্মরত মানুষের মধ্যে নারীর অংশ ছিল প্রায় ২৪ শতাংশ; ১৯১৮ সালের নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ শতাংশে।
কারখানা, পরিবহন, কৃষি, সরকারি দপ্তর, পুলিশ ও অস্ত্র উৎপাদনের মতো কাজেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। আগে যে কাজগুলোকে ‘পুরুষের কাজ’ বলা হতো, সেসব কাজও নারীরা করতে সক্ষম—এ ধারণা সমাজে দৃশ্যমান হয়।
এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রভাবও ছিল। ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যের Representation of the People Act-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট শর্তে ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীরা ভোটাধিকার পান। তবে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, শুধু যুদ্ধের অবদানকে এর একমাত্র কারণ বলা ঠিক নয়; দীর্ঘদিনের নারী ভোটাধিকার আন্দোলনও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নারীদের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরে—নারী শুধু ঘরের মানুষ নন, রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও জনজীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: ‘পুরুষের কাজ’ ধারণায় বড় ধাক্কা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নারীদের কর্মজীবনে আরও বড় পরিবর্তন আনে। পুরুষেরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় কারখানা ও কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিকের সংকট তৈরি হয়। সেই ঘাটতি পূরণে নারীরা অস্ত্র কারখানা থেকে কৃষি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেন।
শুধু যুক্তরাজ্যেই যুদ্ধের সময় প্রায় ৭০ লাখ নারী যুদ্ধ-সম্পর্কিত কাজে যুক্ত ছিলেন। রাসায়নিক ও বিস্ফোরক শিল্পের অর্ধেকের বেশি কর্মী ছিলেন নারী; প্রকৌশল ও ধাতব শিল্পেও প্রায় ১৫ লাখ নারী কাজ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘রোজি দ্য রিভেটার’ হয়ে ওঠে কর্মজীবী নারীর প্রতীক। যুদ্ধের সময় নারীরা কারখানায় কাজ করেছেন, অর্থনীতি সচল রেখেছেন, সামরিক বাহিনীতেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। যুদ্ধ শেষে অনেক নারীকে আবার ঘরে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হলেও, কাজের অভিজ্ঞতা তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ধারণাকে বদলে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামরিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ। সোভিয়েত ইউনিয়নে আট লাখের বেশি নারী রেড আর্মিতে যোগ দেন; তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি সম্মুখযুদ্ধে ছিলেন। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও আগের সেই প্রশ্নটি আর সহজে টিকিয়ে রাখা যায়নি—নারী কি শুধু ঘর সামলানোর জন্য?
ভিয়েতনাম যুদ্ধ: নারীর নতুন সামরিক ও পেশাগত পরিচয়
ভিয়েতনাম যুদ্ধেও নারীরা শুধু নার্স হিসেবে নয়, সামরিক ও বেসামরিক নানা পেশায় কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১১ হাজার নারী ভিয়েতনামে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন; তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ ছিলেন নার্স। পাশাপাশি চিকিৎসক, গোয়েন্দা কর্মকর্তা, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ও প্রশাসনিক দায়িত্বেও নারীরা ছিলেন।
এ ধরনের যুদ্ধ নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলে। নারী যে সংকটময় পরিস্থিতিতে চিকিৎসা, প্রশাসন, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সামরিক দায়িত্ব পালন করতে পারেন—এই বাস্তব অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে নারীর পেশাগত ও সামরিক অধিকার নিয়ে আলোচনাকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: যুদ্ধ, নারী ও বদলে যাওয়া পরিবার
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের নারীদের জীবনেও গভীর পরিবর্তন আনে। কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, কেউ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, খাদ্য ও তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন, কেউ চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হন। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নারী যুদ্ধকালীন যৌন সহিংসতার শিকার হন।
স্বাধীনতার পর তাঁদের সামাজিক অবস্থান, পরিচয় ও পুনর্বাসনের প্রশ্নটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। যুদ্ধ শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেয়নি; অসংখ্য পরিবারে নারীর ভূমিকা, দায়িত্ব ও জীবনের গতিপথও বদলে দেয়।
যুদ্ধের সময় পুরুষেরা অনুপস্থিত থাকলে নারীরা অনেক সময় পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন। জাতিসংঘের নারী ও শান্তিবিষয়ক গবেষণাতেও দেখা যায়, সংঘাতের কারণে নারীরা নতুন অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন; অনেক নারী প্রথমবারের মতো শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন বা পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন।
কিন্তু এই পরিবর্তন সবসময় স্থায়ী ক্ষমতায়নে পরিণত হয় না। যুদ্ধ শেষ হলে অনেক নারীকে আবার পুরোনো সামাজিক ভূমিকায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রেও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নারীর কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
আর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্যও নারীরাই বহন করেন—স্বামী বা সন্তান হারানো, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও নিরাপত্তার সংকট, পরিবারের অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং যৌন ও অন্যান্য সহিংসতা।
জাতিসংঘও স্বীকার করে যে যুদ্ধ ও সংঘাত নারী ও পুরুষকে একইভাবে প্রভাবিত করে না। ২০০০ সালের নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ১৩২৫-এ প্রথমবারের মতো যুদ্ধ নারীদের ওপর ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলে—এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় এবং সংঘাত প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
যুদ্ধের পর যে নারী আর আগের জায়গায় ফেরেন না
ইতিহাসের বড় যুদ্ধগুলো তাই নারীদের জীবনকে এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধ তাঁদের কষ্ট দিয়েছে, আবার নতুন কিছু দরজাও খুলেছে। ঘর থেকে কারখানা, হাসপাতাল থেকে সেনাবাহিনী, পরিবার থেকে রাজনীতি—নারীর চলার পরিসর অনেক ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনকে শুধু যুদ্ধের কৃতিত্ব দেওয়া যাবে না। নারীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন, শ্রম, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুদ্ধের পরিস্থিতি মিলে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে—যুদ্ধ নারীর শ্রমকে দৃশ্যমান ও মূল্যবান করেছিল, কিন্তু ভোটাধিকার অর্জনের পেছনে দীর্ঘদিনের নারী আন্দোলনও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: পার্লামেন্ট ইউক, হিস্টি ডটকম অবলম্বনে