অসংখ্যবার ভেঙে গিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন রেখা

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬

রেখা
রেখা

বলিউডে কিছু মুখ শুধু তারকা হয়ে ওঠে না, তারা একসময় একটি রহস্য, একটি আবেগ, একটি গল্প হয়ে যায়। রেখা তেমনই এক নাম। তাঁর ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক, কপালে টিপ, শাড়ির ভাঁজে অভিজাত সৌন্দর্য—সব মিলিয়ে পর্দায় তিনি যেন পরিপূর্ণ এক নারী। অথচ সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক শৈশব, যেখানে ছিল অভাব, প্রত্যাখ্যান, অনিশ্চয়তা আর ভালোবাসার অপূর্ণতা।



আজকের রেখাকে দেখে হয়তো বিশ্বাস করা কঠিন—এই নারী একসময় ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চাইতেনই না। যে মেয়েটি বাবার ভালোবাসা চিনত না। ১৯৫৪ সালে জন্ম ভানুরেখা গণেশনের। বাবা তামিল চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা জেমিনি গণেশন, মা অভিনেত্রী পুষ্পাভাল্লী। কিন্তু বাবা-মায়ের সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। রেখা যখন খুব ছোট, তখনই তাঁর বাবা তাঁদের জীবন থেকে দূরে সরে যান। ফলে বাবাকে ঘিরে কোনো স্বাভাবিক শৈশবস্মৃতি তাঁর তৈরি হয়নি।



এক সাক্ষাৎকারে রেখা বলেছিলেন, তিনি বুঝতেই পারেননি ‘বাবাকে মিস করা’ বলতে কী বোঝায়। কারণ বাবার ভালোবাসা পাওয়ার অভিজ্ঞতাই তাঁর ছিল না। এই একটি বাক্যেই যেন তাঁর শৈশবের সবচেয়ে বড় শূন্যতাটি ধরা পড়ে। একই স্কুলে পড়া সৎ ভাইবোনদের বাবাকে স্কুলে পৌঁছে দিতে দেখেছেন তিনি। অথচ সেই মানুষটি তাঁর দিকে তাকাননি—রেখার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি মনে করতেন তাঁর বাবা তাঁকে খেয়ালই করেননি। একজন শিশুর কাছে এর চেয়ে নিঃশব্দ কষ্ট আর কী হতে পারে?



সিনেমায় আসা ছিল প্রয়োজন, স্বপ্ন নয় 


রেখা ছোটবেলা থেকেই অভিনেত্রী হতে চেয়েছিলেন—এমন গল্প তাঁর ক্ষেত্রে খাটে না। বরং আর্থিক সংকট তাঁকে খুব অল্প বয়সেই ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। পরিবারের আর্থিক দায়, মায়ের ঋণ এবং ভাইবোনদের দায়িত্বের কারণে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁকে স্কুল ছাড়তে হয়। চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করা ছিল তাঁর নিজের পছন্দ নয়; বরং পরিস্থিতির কাছে এক ধরনের আত্মসমর্পণ। পরে এক সাক্ষাৎকারে রেখা জানিয়েছিলেন, জীবনের প্রথম কয়েক বছর অভিনয়কে তিনি ভালোবাসতেন না। শুটিংয়ে যেতে তাঁর অনীহা ছিল, এমনকি তাঁকে জোর করে সেটে নিয়ে যাওয়া হতো বলেও তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন।



মুম্বাই—স্বপ্নের শহর, না কি এক অচেনা জঙ্গল?


দক্ষিণী চলচ্চিত্রে কাজ করার পর রেখা পাড়ি দেন মুম্বাইয়ে। ভাষা জানতেন না, ইন্ডাস্ট্রির নিয়মকানুন জানতেন না, কাউকে ভালোভাবে চিনতেন না। ছিলেন অল্পবয়সী, অনভিজ্ঞ এবং অর্থনৈতিকভাবে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। নিজের সেই সময়কে রেখা পরবর্তীতে অত্যন্ত ভয়ংকর অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, মুম্বাই তখন তাঁর কাছে ছিল এমন এক জায়গা যেখানে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত মনে করতেন। শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রতিদিন শুটিং, পোশাক, মেকআপ আর কাজের চাপের মধ্যে কাটত তাঁর জীবন। আর সেই সময় তাঁকে ঘিরে ছিল চেহারা নিয়ে কটূক্তি, পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন এবং নানা অপমান। 



আজ যাঁকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সুন্দরী অভিনেত্রী হিসেবে দেখা হয়, সেই রেখাকেই ক্যারিয়ারের শুরুতে নিজের চেহারা নিয়ে অপমান সহ্য করতে হয়েছিল। তারপর বদলে গেলেন রেখা কিন্তু এখানেই রেখার গল্পের সবচেয়ে সুন্দর বাঁক। তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং নিজেকেই নতুন করে তৈরি করতে শুরু করলেন। শরীর, উচ্চারণ, অভিনয়, পোশাক, ব্যক্তিত্ব—সবকিছুতেই তিনি কঠোর পরিশ্রম করলেন। ধীরে ধীরে যে মেয়েটিকে একসময় ‘অযোগ্য’ মনে করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে উঠলেন বলিউডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী অভিনেত্রীদের একজন। ‘ঘর’, ‘মুকাদ্দর কা সিকন্দর’, ‘খুবসুরত’ থেকে ‘উমরাও জান’—প্রতিটি ছবির সঙ্গে যেন তিনি নিজের পুরোনো পরিচয়কে মুছে নতুন রেখাকে তৈরি করছিলেন।



১৯৮১ সালে ‘উমরাও জান’-এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান তিনি। একজন মেয়ের জন্য এর চেয়ে বড় উত্তর আর কী হতে পারে—যে মেয়েকে একদিন বলা হয়েছিল সে যথেষ্ট ভালো নয়, সেই মেয়েই একদিন অভিনয়ের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।



ভালোবাসা কী সত্যিই তাঁর কাছে সহজ ছিল?


পর্দায় রেখা যতটা প্রেমময়, বাস্তব জীবনে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ততটাই জটিল ও আলোচিত। অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কের প্রকৃত ব্যক্তিগত সত্যের অনেকটাই আজও জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। তাই গুজবকে সত্য হিসেবে না দেখে এটুকু বলা যায়—রেখার ব্যক্তিজীবন বরাবরই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে ছিল। তাঁর বিয়ে হয়েছিল ব্যবসায়ী মুকেশ আগরওয়ালের সঙ্গে ১৯৯০ সালে। বিয়েটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই করুণ পরিণতি পায়; মুকেশের আত্মহত্যার পর রেখাকে প্রবল জনসমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একজন নারী তখন স্বামী হারিয়েছেন। অথচ সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়ানোর বদলে প্রশ্ন তুলেছিল তাঁকে নিয়েই।



তারকার জীবনে যে একাকিত্ব


রেখাকে ঘিরে আজও ‘রহস্যময়ী’, ‘এনিগমা’, ‘চিরসবুজ সুন্দরী’—এমন কত শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে তাঁর জীবনকে দেখলে গল্পটি অন্যরকম। একটি মেয়ে ছোটবেলায় বাবাকে পায়নি। কৈশোরে নিজের ইচ্ছায় নয়, পরিবারের প্রয়োজনে কাজ শুরু করেছে। তারপর অপরিচিত এক শহরে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার যুদ্ধ করেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের চেহারা, পরিচয় ও অতীত নিয়ে মানুষের মন্তব্য শুনেছে। ভালোবাসা পেয়েছে কি না, তা নিয়েও জীবনভর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। আর শেষ পর্যন্ত নিজের চারপাশে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য দেয়াল। হয়তো সেই কারণেই রেখা আজও এত রহস্যময়। তিনি তাঁর জীবনের সব দরজা সবার জন্য খুলে দেননি।



রেখার গল্প কী শুধু অভিনেত্রীর নাকি সংগ্রামী নারীর?


রেখার গল্প শুধু একজন অভিনেত্রীর গল্প নয়। এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি জীবনের শুরুতেই বুঝে গিয়েছিলেন—সবাইকে পাওয়া যায় না, সব ভালোবাসা ভাগ্যে লেখা থাকে না, আর সব ক্ষত কাউকে দেখানো যায় না। তিনি হারিয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন, একা হয়েছেন—কিন্তু প্রতিবারই নিজেকে নতুন করে গড়েছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো কোনো পুরস্কার নয়, কোনো সিনেমার সাফল্যও নয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো— যে জীবন তাঁকে বারবার ভেঙে দিতে চেয়েছিল, সেই জীবনকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় শিল্পে পরিণত করেছেন।



আজও যখন কোনো পুরস্কার অনুষ্ঠানের মঞ্চে রেখা উপস্থিত হন, ক্যামেরা তাঁর দিকে ফিরে যায়। সবাই তাকিয়ে থাকে সেই অপরূপ নারীর দিকে। কিন্তু ক্যামেরার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির গল্পটি হয়তো আরও গভীর। সেই মেয়েটি, যে একদিন বাবার ভালোবাসা কী—সেটাই জানত না, যে মেয়েটি স্কুল ছেড়ে জীবিকার জন্য সিনেমায় এসেছিল, যে মেয়েটি অচেনা শহরে প্রতিদিন কেঁদেছে—সে-ই একদিন হয়ে উঠেছে ‘রেখা’। একটি নাম, যার পাশে আজ আর পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।



তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও পুরোনো সাক্ষাৎকার


sidebar ad