দিনের কোন সময়টাতে বিষণ্নতা কমে সুখী অনুভব বাড়ে? গবেষণার তথ্য জেনে নিন

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

সকালের সঙ্গে মানুষের মানসিক ভালো থাকার অনুভূতির একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক থাকতে পারে। সাম্প্রতিক এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সকালে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার অনুভূতি তুলনামূলক ভালো থাকে। বিপরীতে, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব ইতিবাচক অনুভূতি কমতে থাকে এবং মধ্যরাতের দিকে মানসিক সুস্থতার সূচকগুলো সবচেয়ে নিচে নেমে আসে।


গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের (UCL) গবেষকেরা। ‘Will things feel better in the morning? A time-of-day analysis of mental health and wellbeing from nearly 1 million observations’ শিরোনামের গবেষণাটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে BMJ Mental Health-এ প্রকাশিত হয়।


গবেষকেরা UCL COVID-19 Social Study-এর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। এতে ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ৪৯ হাজার ২১৮ জন প্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে দুই বছর ধরে নেওয়া প্রায় ৯ লাখ ৯ হাজার পর্যবেক্ষণ বা survey response বিশ্লেষণ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের সময়কাল ছিল ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত।


সকালে কেন মন ভালো থাকে?


গবেষণায় দিনের বিভিন্ন সময়ে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের কয়েকটি দিক পরিমাপ করা হয়। এর মধ্যে ছিল বিষণ্নতার উপসর্গ, উদ্বেগ, সুখের অনুভূতি, জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি, নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে হওয়া এবং একাকিত্ব।


ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণভাবে মানুষ ঘুম থেকে ওঠার পর সকালে সবচেয়ে ভালো মানসিক অবস্থায় থাকার কথা জানিয়েছেন। এ সময় বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ তুলনামূলক কম ছিল। একই সঙ্গে সুখ, জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি এবং জীবনের কর্মকাণ্ডকে অর্থপূর্ণ মনে হওয়ার অনুভূতিও ছিল বেশি।


অন্যদিকে, দিন যত গড়িয়েছে, বিশেষ করে রাতের দিকে এসব সূচকে অবনতি দেখা গেছে। মধ্যরাতের দিকে মানুষের স্ব-প্রতিবেদিত মানসিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার অনুভূতি সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।


তবে গবেষণায় পার্থক্যগুলো সব ক্ষেত্রে খুব বড় ছিল না। বরং গবেষকেরা দিনের বিভিন্ন সময়ের মধ্যে একটি ধারাবাহিক কিন্তু তুলনামূলক ছোট পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন। ভালো থাকার কয়েকটি সূচকে সকাল ও মধ্যরাতের মধ্যে পার্থক্য ছিল তুলনামূলক বেশি।


শুধু সুখ নয়, আরও অনেক কিছু


গবেষণাটির বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু মানুষ কখন বেশি ‘সুখী’ বোধ করে, তা দেখা হয়নি। মানসিক সুস্থতাকে কয়েকটি ভিন্ন মাত্রায় বিবেচনা করা হয়েছে। সুখ ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি গবেষকেরা দেখেছেন বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ, জীবনের অর্থপূর্ণতা এবং একাকিত্বের অনুভূতিও।


ফলে গবেষণার ফলাফল থেকে বলা যায়, দিনের সময়ের সঙ্গে মানুষের সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার একটি ছন্দ থাকতে পারে।


সপ্তাহের দিনেও কী পার্থক্য আছে?


দিনের সময়ের পাশাপাশি সপ্তাহের বিভিন্ন দিনের প্রভাবও গবেষণায় দেখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ফলাফল ছিল তুলনামূলকভাবে মিশ্র। কিছু সূচকে সোমবার ও শুক্রবারের অবস্থান রবিবারের তুলনায় ভালো ছিল। আবার উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ক্ষেত্রে সপ্তাহের মাঝামাঝি কিছু দিনে ভিন্ন ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। সপ্তাহান্তে দিনের সময়ের সঙ্গে সুখ ও জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির পরিবর্তনও তুলনামূলক বেশি ছিল।


অর্থাৎ শুধু ‘সকাল না রাত’ নয়, সপ্তাহের কোন দিন—সেটিও মানুষের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।


ঋতুর প্রভাবও রয়েছে


গবেষণায় বছরের বিভিন্ন ঋতুর প্রভাবও বিশ্লেষণ করা হয়। শীতের তুলনায় বসন্ত, গ্রীষ্ম ও শরতে মানুষের বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ এবং একাকিত্ব তুলনামূলক কম ছিল। একই সঙ্গে সুখ, জীবন নিয়ে সন্তুষ্টি এবং জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে হওয়ার অনুভূতিও বেশি ছিল। সব সূচক মিলিয়ে গ্রীষ্মকালেই মানসিক স্বাস্থ্য ও ভালো থাকার মাত্রা সবচেয়ে ভালো ছিল।


তাহলে কী সকালে উঠলেই মন ভালো থাকবে?


এখানে গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা মনে রাখা দরকার। গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় এর মাধ্যমে বলা যায় না যে ‘সকাল’ সরাসরি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো করে।


গবেষকেরা নিজেরাও সতর্ক করেছেন যে, দিনের কোন সময়ে মানুষ অনলাইনে প্রশ্নের উত্তর দিতে বসছেন, তার সঙ্গে তাদের মানসিক অবস্থার সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন—যারা সকালে তুলনামূলক ভালো অনুভব করেন, তারা হয়তো সকালে জরিপে অংশ নেওয়ার জন্য বেশি আগ্রহী ছিলেন।


এ ছাড়া গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ঘুমের চক্র, আবহাওয়া বা ভৌগোলিক অক্ষাংশের মতো কিছু বিষয় বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করা সম্ভব হয়নি। তাই এই ফলাফলকে কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।


গবেষকেরা মনে করেন, শরীরের নিজস্ব circadian rhythm বা জৈবিক ঘড়ি দিনের বিভিন্ন সময়ে মানসিক অবস্থার ওঠানামার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর কর্টিসলের মাত্রা সাধারণত বাড়ে এবং দিনের পরবর্তী সময়ে কমতে থাকে—এ ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দিনের সময়ের সঙ্গে মানসিক সুস্থতার সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।


সব মিলিয়ে গবেষণাটি একটি আকর্ষণীয় বিষয় সামনে এনেছে—মানুষের মানসিক সুস্থতা হয়তো সারাদিন একই রকম থাকে না। অনেকের ক্ষেত্রে সকালের শুরুটা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে, আর গভীর রাত হতে হতে ইতিবাচক অনুভূতিগুলো কিছুটা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।


তবে এটি কোনো সার্বজনীন নিয়ম নয়। ব্যক্তির ঘুমের অভ্যাস, কাজের সময়সূচি, সামাজিক সম্পর্ক, জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে মানসিক অবস্থার দৈনিক ছন্দ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে।

sidebar ad