বিষাক্ত দাম্পত্য, মানসিক নির্যাতন এবং একজন বাবার নীরব আর্তনাদ
আমাদের সমাজে পারিবারিক নির্যাতনের কথা উঠলেই সাধারণত নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি সামনে আসে। বাস্তবতা হলো, নির্যাতন কখনোই শুধু একটি লিঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারী যেমন নির্যাতনের শিকার হতে পারেন, তেমনি অনেক পুরুষও বছরের পর বছর মানসিক নির্যাতন, অপমান, ভয়ভীতি এবং অস্থিরতার মধ্যে জীবন কাটান। কিন্তু সামাজিক লজ্জা, পুরুষত্বের প্রচলিত ধারণা এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে অধিকাংশ পুরুষই মুখ খুলতে পারেন না।
সম্প্রতি রোদসীর কাছে একজন পাঠক তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্ত্রীর মানসিক নির্যাতনের শিকার তিনি। তাদের দেড় বছরের একটি সন্তান রয়েছে। কিন্তু সামান্য বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হলেই স্ত্রী সন্তানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন, কখনো মারধর করেন, কখনো সময়মতো খাওয়ান না বা অবহেলা করেন। বাচ্চার বিষয়টি নিয়ে কিছু বললেই শুরু হয় চিৎকার, ভাঙচুর, হুমকি এবং রাতভর অশান্তি। এমনকি স্ত্রী কখনো কখনো সন্তানকে হত্যা বা নিজের ক্ষতি করার হুমকিও দেন।
এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজে নীরবে বেড়ে ওঠা একটি সংকটের প্রতিচ্ছবি।
মানসিক নির্যাতন আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, নির্যাতন মানেই শারীরিক আঘাত। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক নির্যাতন মানুষের আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রাকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা অনেক সময় শারীরিক আঘাতের চেয়েও গভীর।
মানসিক নির্যাতনের কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো—
নিয়মিত অপমান বা হেয় করা
ভয়ভীতি প্রদর্শন
চিৎকার-চেঁচামেচি
হুমকি দেওয়া
অন্যকে অপরাধী অনুভব করানো
সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা
সন্তানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা
আত্মহত্যা বা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো
যখন এসব আচরণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন ভুক্তভোগীর মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা, আতঙ্ক এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট তৈরি হতে পারে।
সন্তানের ওপর এর প্রভাব কতটা ভয়াবহ?
অনেক দম্পতি মনে করেন, তারা সন্তানের সামনে ঝগড়া না করলে বা শিশুটি ছোট হলে সে কিছু বোঝে না। বাস্তবে গবেষণা বলছে, শিশুরা জন্মের পর থেকেই পারিপার্শ্বিক পরিবেশের আবেগীয় সংকেত অনুভব করতে শুরু করে।
একটি দেড় বছরের শিশু হয়তো ঝগড়ার ভাষা বোঝে না, কিন্তু সে ভয়, রাগ, কান্না, চিৎকার এবং নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করতে পারে।
এ ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে দেখা দিতে পারে—
অতিরিক্ত ভয় বা উদ্বেগ
আচরণগত সমস্যা
ঘুমের সমস্যা
ভাষা ও মানসিক বিকাশে বিলম্ব
আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি
ভবিষ্যতে সম্পর্ক নিয়ে অনিরাপত্তা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যখন কোনো অভিভাবক নিজের রাগ বা হতাশা সন্তানের ওপর প্রকাশ করেন, তখন শিশুর শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা দুটোই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
স্ত্রী কেন এমন আচরণ করতে পারেন?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। কারও আচরণ ক্ষতিকর হলেও তার পেছনে কোনো মানসিক বা আবেগীয় কারণ থাকতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা (Postpartum Depression), উদ্বেগজনিত সমস্যা, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, দাম্পত্য অসন্তোষ, ব্যক্তিত্বগত জটিলতা বা অমীমাংসিত ট্রমা থেকে এমন আচরণ তৈরি হতে পারে।
তবে কারণ যাই হোক না কেন, সন্তানের প্রতি সহিংসতা বা সঙ্গীর প্রতি মানসিক নির্যাতন কখনো গ্রহণযোগ্য নয়।
তাই প্রথম ধাপ হওয়া উচিত সমস্যাটিকে “স্বাভাবিক রাগ” হিসেবে না দেখে একটি গুরুতর পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা।
সমাধানের পথ কোথায়?
প্রথমত, পরিস্থিতি যদি সন্তানের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। “সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে” ভেবে বসে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ঘটনাগুলো লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। কখন কী ঘটেছে, কী ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে, সন্তানের প্রতি কী আচরণ করা হয়েছে—এসব নোট রাখা ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিবারের বিশ্বাসযোগ্য সদস্য বা প্রবীণ কাউকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে, যদি তিনি নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হন।
চতুর্থত, দাম্পত্য কাউন্সেলিং বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি আত্মহত্যার হুমকি, আত্মক্ষতির প্রবণতা বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে পেশাদার সহায়তা জরুরি।
পঞ্চমত, ভুক্তভোগী ব্যক্তিকেও নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে। দীর্ঘদিনের নির্যাতন মানুষকে এমনভাবে ক্লান্ত করে ফেলে যে তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন।
সন্তানের জন্য সংসার টিকিয়ে রাখা, নাকি আলাদা হওয়া?
এ প্রশ্নের কোনো একক উত্তর নেই।
অনেকেই মনে করেন, সন্তানের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশ।
যদি সংসারে প্রতিদিন চিৎকার, হুমকি, ভয়, সহিংসতা এবং অস্থিরতা থাকে, তাহলে সেই পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হয়, তাহলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত।
তবে যখন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়মিতভাবে ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তখন বিচ্ছেদের সম্ভাবনাসহ সব বিকল্প বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের আইনি দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের আইনে একজন পুরুষও সাধারণ ফৌজদারি আইনের আওতায় হুমকি, ভাঙচুর, আঘাত, সন্তানের প্রতি নির্যাতন বা আত্মহত্যার প্ররোচনার মতো বিষয় নিয়ে আইনি সহায়তা চাইতে পারেন।
যদি সন্তানের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকে, তাহলে পারিবারিক আদালতে সন্তানের হেফাজত ও অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। গুরুতর পরিস্থিতিতে পুলিশ, আইনজীবী বা শিশু সুরক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তাও নেওয়া যেতে পারে।
তবে আইনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিস্থিতির বাস্তবতা স্বীকার করা এবং সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া।
আমাদের সমাজে পুরুষের কান্না শোনা যায় না। কারণ তাকে শেখানো হয় শক্ত থাকতে, সহ্য করতে, মুখ বন্ধ রাখতে। কিন্তু নির্যাতন নারী বা পুরুষ দেখে আসে না। নির্যাতন শুধু একজন মানুষকে ভেঙে দেয়।
যে বাবা প্রতিদিন সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ঘরে ফেরেন, কিন্তু ঘরে ফেরার আগেই ভয়ে বুক কেঁপে ওঠে—তার কষ্টও বাস্তব। একই সঙ্গে যে শিশু প্রতিদিন অস্থিরতা, রাগ আর ভয়ের মধ্যে বড় হচ্ছে, তার ভবিষ্যৎও আমাদের ভাবতে হবে।
একটি বিষাক্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাই সবসময় সমাধান নয়। আবার বিচ্ছেদও সব সমস্যার উত্তর নয়। প্রকৃত সমাধান হলো—নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থকে সামনে রেখে সাহসী ও সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
কারণ একটি শিশুর সবচেয়ে বড় অধিকার হলো ভালোবাসা নয় শুধু, নিরাপদ একটি শৈশব।
সাবিনা ইয়াসমীন
সম্পাদক-রােদসী