বিচ্ছেদের পরে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো মানে একদিনে সব ভুলে যাওয়া না।বরং প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে আবার ফিরে পাওয়া।
নিজের কষ্টকে অস্বীকার না করে মেনে নিন।কান্না দুর্বলতা না,এটা সুস্থ হওয়ার অংশ।সব দোষ নিজের উপর চাপাবেন না। একটি সম্পর্ক ভাঙার পেছনে সাধারণত দুইজনেরই কিছু না কিছু ভূমিকা থাকে।পুরনো স্মৃতির মধ্যে ডুবে না থেকে নতুন রুটিন তৈরি করুন।ঘুম, কাজ, পড়াশোনা, হাঁটা, নামাজ বা মেডিটেশন।
একা হয়ে যাবেন না। বিশ্বাসের মানুষদের সাথে কথা বলুন। নীরবতা অনেক সময় ভেতরটা আরও ভেঙে দেয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার পুরনো মানুষটাকে খুঁজবেন না। এতে ক্ষত শুকাতে সময় আরও বেড়ে যায়।
ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করুন।নিজেকে ফিনানশিয়ালি, মানসিকভাবে ও আত্মবিশ্বাসে শক্ত করা।
মনে রাখুন, বিচ্ছেদ জীবনের শেষ না। অনেক সময় এটা নতুন এক জীবনের কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় শুরু।
শেষ পর্যন্ত মানুষ টিকে থাকে ভালোবাসার কারণে না,নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার সাহসের কারণে।
যে মানুষ ভেঙে গিয়েও আবার উঠে দাঁড়াতে পারে,
সে-ই আসলে জীবনের সবচেয়ে শক্ত মানুষ।
বিচ্ছেদের পরে আবার কি ঘুরে দাড়ানো সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব।
তবে আগের মানুষ হয়ে না।
বরং নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলে।বিচ্ছেদ মানুষকে ভেঙে দেয়,
কিন্তু অনেক সময় সেই ভাঙনই মানুষকে নিজের মূল্য,শক্তি আর বাস্তবতা চিনতে শেখায়।শুরুতে সবকিছু অন্ধকার লাগে,
কিন্তু সময়,সঠিক মানুষ, আত্মসম্মান আর নিজের প্রতি যত্ন,ধীরে ধীরে মানুষকে আবার বাঁচতে শেখায়।কিছু ক্ষত থেকে যায়,তবুও মানুষ হাসতে শেখে, স্বপ্ন দেখতে শেখে, আবার জীবন সাজাতেও শেখে।কারণ জীবন থেমে থাকে না।আর মানুষও না।
ভিতরের সবকিছু ঝেড়ে কাদুন:
সবচেয়ে কঠিন জায়গাটা হয়তো এটাই।ভেতরে ঝড় চলে, কিন্তু কাউকে বলা যায় না।মন খুলে কান্না করতেও ভয় লাগে, কারণ মানুষ দুর্বল ভাববে।এই ভয়টা অনেককে চুপ করিয়ে দেয়।কখনো কখনো মানুষ এতটাই ভেঙে যায় যে,কথা বলার ভাষাটাও হারিয়ে ফেলে।
চারপাশে মানুষ থাকে, তবুও নিজের কষ্টটা একদম একার মনে হয়।
কিন্তু চেপে রাখা কষ্ট নিঃশব্দে মানুষকে আরও ক্লান্ত করে দেয়।সব কথা সবাইকে বলতে হবে না,
তবে অন্তত একজন মানুষ, একটা ডায়েরি, একটা সিজদা, কিংবা নিজের সাথে নিজের সত্যি কথাগুলো,
কোথাও না কোথাও বের হতে দেওয়া দরকার।
কারণ কান্না সবসময় দুর্বলতার চিহ্ন না।
অনেক সময় এটা ভেঙে না পড়ে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা।
কি করবেন তাহলে?
তখন একসাথে পুরো জীবন ঠিক করার চেষ্টা না করে,শুধু আজকের দিনটা পার করার চেষ্টা করুন।
ভাঙা মনকে জোর করে শক্ত বানাতে গেলে মানুষ আরও ক্লান্ত হয়ে যায়।
কান্না পেলে কাঁদুন। নিজেকে থামাতে থামাতে ভেতরটা পাথর হয়ে যায়।
কারো সাথে কথা বলতে না পারলে লিখুন। অগোছালো শব্দেও কষ্ট একটু হালকা হয়।সারাদিন একা অন্ধকারে পড়ে থাকবেন না। একটু হাঁটুন, ছাদে যান, বাতাস নিন।খাওয়া-ঘুম একদম ছেড়ে দেবেন না। শরীর ভেঙে গেলে মনও আরও দ্রুত ভেঙে পড়ে।
পুরনো মেসেজ, ছবি, স্মৃতি বারবার দেখলে ক্ষতটা নতুন হয়।নিজেকে একটু দূরে রাখুন।আর যদি মনে হয় ভেতরের চাপটা অসহ্য হয়ে যাচ্ছে, বিশ্বাসের কাউকে বা কোনো মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সাথে কথা বলা খুবই দরকার।
সবচেয়ে বড় কথা—
এই অনুভূতিটা চিরদিন থাকবে না।আজ যে কষ্টটা বুক ফাটিয়ে দিচ্ছে,
একদিন সেটাকেই আপনি নিজের বেঁচে থাকার গল্প হিসেবে দেখবেন।
মানসিক চিকিৎসা নিলে লোকে পাগল বলবে নাতো?
মানসিক চিকিৎসা নেওয়া একদম ঠিক।জ্বর হলে যেমন ডাক্তার দেখানো স্বাভাবিক,তেমনি দীর্ঘদিনের কষ্ট, ভাঙন, আতঙ্ক বা ঘুমহীনতার জন্য সাহায্য নেওয়াও স্বাভাবিক।সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে এখনো অনেকেই মানসিক কষ্টকে নাটক বা পাগলামি ভেবে ভুল করে।কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে সাহসী কাজগুলোর একটা হলো,
নিজের ভেতরের ভাঙনটা স্বীকার করা এবং সাহায্য চাওয়া।সবাইকে জানাতেও হবে না।আপনার মানসিক শান্তি অন্য মানুষের মন্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।কারণ মানুষ কয়েকদিন কথা বলবে,
কিন্তু আপনার কষ্টটা তো আপনাকেই বহন করতে হয়।আর একটা কথা মনে রাখবেন,যে মানুষ নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়,সে দুর্বল না।
সে নিজের জীবনটাকে গুরুত্ব দিতে শিখেছে।
জীবন নতুন করে সাজান:
এর মানে সব ভুলে যাওয়া না।বরং ভাঙা অংশগুলো নিয়েই আবার বাঁচতে শেখা।ছোট থেকে শুরু করুন।প্রতিদিনের ঘুম, খাওয়া, নিজের যত্ন,এগুলোই নতুন জীবনের ভিত্তি।নিজেকে দোষ দেওয়া কমান।একটা সম্পর্ক ভেঙেছে মানেই আপনার পুরো জীবন ব্যর্থ না।নতুন কোনো অভ্যাস গড়ুন।পড়াশোনা, কাজ, বই, হাঁটা, কিছু শেখা। ব্যস্ততা সব কষ্ট মুছে দেয় না,কিন্তু মানুষকে ধীরে ধীরে টিকতে শেখায়।
যাদের কাছে গেলে শান্তি লাগে, তাদের কাছাকাছি থাকুন।নিজের স্বপ্নগুলো আবার খুঁজে বের করুন। অনেক সময় সম্পর্কের ভেতর মানুষ নিজের ইচ্ছাগুলো হারিয়ে ফেলে।
ফিনানশিয়ালি ও মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করুন। নিজের উপর ভরসা ফিরে আসা খুব বড় পরিবর্তন আনে।সময়কে সময় দিন। জোর করে ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে না।
একদিন হঠাৎ বুঝবেন,
যে মানুষটা শুধু কষ্টে ডুবে ছিল,সে আবার হাসছে…
আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে।নতুন জীবন শুরু হয় না কোনো জাদুতে,
শুরু হয় প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে না হারানোর সিদ্ধান্ত থেকে।
বাস্তবতা মেনে নিন:
বাস্তবতা মেনে নেওয়া মানে কষ্ট না পাওয়া না।বরং কষ্টটা আছে জেনেও ধীরে ধীরে তার সাথে বাঁচতে শেখা।কিছু সত্য খুব নিষ্ঠুর হয়।সব মানুষ থেকে যায় না,সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টিকে না।আর সব স্বপ্নও পূরণ হয় না।এই সত্যগুলো প্রথমে বুক ভেঙে দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা এড়িয়ে গেলে কষ্টটা কমে না,
উল্টো মানুষ ভেতরে ভেতরে আরও আটকে যায়।তাই নিজেকে বলতে হয়।“হ্যাঁ, এটা আমার জীবনে ঘটেছে। কষ্ট দিচ্ছে। তবুও আমাকে বাঁচতে হবে।
মেনে নেওয়া একদিনে আসে না।কখনো কান্নার মধ্যে আসে,কখনো একা রাত পার করতে করতে আসে,কখনো খুব প্রিয় কাউকে হারিয়ে ফেলার পরও সকাল হলে উঠে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে আসে।
আর একটা সময় পরে মানুষ বুঝে।
বাস্তবতা কঠিন ঠিকই,
কিন্তু মানুষ তার চেয়েও বেশি সহ্য করতে পারে।
কিছু টিপস,
*যা বদলানো সম্ভব না, সেটা নিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ না করে ধীরে ধীরে মেনে নেওয়ার অভ্যাস করুন।
*নিজের কষ্টকে ছোট করবেন না।"আমি ঠিক আছি"বলতে বলতে মানুষ ভেতরে ক্লান্ত হয়ে যায়।
*প্রতিদিন একটা ছোট কাজ ঠিক করুন।ঘর গুছানো, হাঁটা, পড়া, নামাজ, বা নিজের যত্ন। ছোট রুটিন মনকে স্থির করে।
*বাস্তবতা থেকে পালানোর জন্য সারাদিন স্মৃতি বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুবে থাকবেন না। এতে কষ্ট দীর্ঘ হয়।
*নিজের তুলনা অন্য কারো জীবনের সাথে করবেন না। সবাই নিজের অদৃশ্য যুদ্ধ লড়ছে।
*"সব শেষ" এই চিন্তার বদলে ভাবুন,আমার জীবনের একটা অধ্যায় শেষ হয়েছে।
*বিশ্বাসের একজন মানুষের সাথে নিয়মিত কথা বলুন। চুপচাপ সব সহ্য করা সবসময় শক্ত হওয়ার লক্ষণ না।
*শরীরের যত্ন নিন। ঠিকমতো না খাওয়া,না ঘুমানো মানসিক কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন। এটা দুর্বলতা না, নিজের প্রতি দায়িত্ব।
*আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে সময় দিন। কিছু ক্ষত সময় ছাড়া আর কিছুতেই পুরোপুরি শুকায় না।
*জীবন সবসময় সহজ হবে না,তবুও মানুষ ধীরে ধীরে আবার বাঁচতে শিখে যায়।
সন্তানের জন্য দুশ্চিন্তা :
এটা একটা খুব ভারী দুশ্চিন্তা।বোঝা যায়। বিচ্ছেদের সময় অনেকেই সবচেয়ে বেশি ভাঙে এই চিন্তায় যে বাচ্চাদের কী হবে?কিন্তু একটা কথা আগে পরিষ্কার করি,
বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি জিনিস হলো নিরাপত্তা,ভালোবাসা আর স্থিরতা।শুধু একসাথে থাকা পরিবার না।
কিছু বাস্তব টিপস দিচ্ছি:
*তাদের দোষ না বোঝানো। বাবা-মায়ের সমস্যা বাচ্চার উপর চাপাবেন না। "তুমি কারণ না"এটা বারবার বুঝাতে হবে।
*ভালোবাসা দুই দিক থেকেই নিশ্চিত করা।একজন দূরে থাকলেও, শিশুর মনে যেন ধারণা থাকে।দুইজনই তাকে ভালোবাসে।
*রুটিন ঠিক রাখা।স্কুল, খাওয়া, ঘুম।এগুলো যতটা সম্ভব আগের মতো রাখুন। এতে তাদের ভেতরের অস্থিরতা কমে।
*খোলামেলা কিন্তু বয়স অনুযায়ী কথা বলা।সব বিস্তারিত না,কিন্তু সত্যটা সহজভাবে বলা।
আমরা একসাথে থাকছি না, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসা কমেনি।
*শান্ত পরিবেশ রাখা।বাচ্চার সামনে ঝগড়া, অপমান, দোষারোপ না করা।এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
*শোনা শিখুন।তারা কষ্ট পেলে চুপ না করিয়ে, শুনুন। অনেক সময় বাচ্চারা কথা না বলেও ভেঙে পড়ে।
*নিজেও স্থির থাকার চেষ্টা: আপনি যতটা মানসিকভাবে স্থির থাকবেন,তারা ততটা নিরাপদ অনুভব করবে।
আর একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য,বাচ্চাদের পারফেক্ট পরিবার দরকার না,
তাদের দরকার এমন একজন অভিভাবক যিনি ভেঙেও তাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকেন।
শেষ কথা,
বিচ্ছেদ জীবনকে ভেঙে দেয়,কিন্তু জীবনকে শেষ করে না।সময়ের কঠিন সত্য হলো,সব সম্পর্ক একসাথে চলার জন্য নয়, কিন্তু সব দায়িত্ব একসাথে থেকেই শেষ হয় না।তবুও সন্তানের চোখে পৃথিবীটা যেন নিরাপদ থাকে,সেটাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।তারা হয়তো সব বুঝে না,কিন্তু অনুভব করে।কে পাশে আছে,কে স্থির হয়ে তাদের হাত ধরে রাখছে।
তাদের কাছে পারফেক্ট পরিবার না থাকলেও চলবে,যদি থাকে ভালোবাসায় ভরা একটা শান্ত আশ্রয়।যেখানে ঝগড়ার শব্দ নেই,আছে শুধু বুঝে নেওয়ার নীরবতা।যেখানে হারানোর গল্প নেই,আছে শুধু নতুন করে গড়ে ওঠার সাহস।
বাস্তবতা কঠিন,কিন্তু সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও আপনি যদি নিজের ভেতরের কোমলতাটা ধরে রাখতে পারেন,তাহলেই সন্তানের জন্য আপনি হয়ে উঠবেন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।কারণ শেষ পর্যন্ত তারা ঘর খোঁজে না,তারা খোঁজে এমন একটা হৃদয়, যেখানে ফিরে এলে কষ্টটা একটু হলেও কম লাগে।