বাংলাদেশে দুর্নীতির কথা উঠলেই আমরা সাধারণত একটি উত্তর খুঁজে নিই—“বেতন কম”, “সুযোগ কম”, “চাহিদা বেশি”। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সব দরিদ্র দেশ কি দুর্নীতিগ্রস্ত? আবার সব ধনী দেশ কি দুর্নীতিমুক্ত?
উত্তর—না।
তাহলে দুর্নীতির মূল কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়। এর শিকড় মানুষের মনস্তত্ত্বে,
সামাজিক সংস্কৃতিতে, রাষ্ট্রের কাঠামোতে এবং নৈতিক শিক্ষার ভিতরে গভীরভাবে প্রোথিত।
দুর্নীতি আসলে ঘুষ নেওয়া বা টাকা আত্মসাৎ করার নাম নয়। দুর্নীতি হলো
নিজের ন্যায্য ক্ষমতার বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা।
এটি একটি মানসিক অবস্থান, যেখানে ব্যক্তি মনে করে—“আমি পারছি, তাই করছি।”
অভাব কি মানুষকে দুর্নীতিবাজ করে?
অনেকেই বলেন, মানুষ অভাবের কারণে দুর্নীতি করে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল।
যে ব্যক্তি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করে, সে যদি ঘুষ নেয়, আমরা বলি—অভাব।
কিন্তু যে ব্যক্তি মাসে তিন লাখ টাকা বেতন নিয়েও কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ
করে, তাকে কী দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়?
এখানে অভাব নয়, কাজ করে “অতৃপ্তির মনোবিজ্ঞান”।
মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হলো—যা আছে, তার চেয়ে আরও বেশি চাওয়া। এই চাওয়া যখন নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে, তখনই জন্ম নেয় দুর্নীতি।
ক্ষমতা মানুষকে এমন এক অনুভূতি দেয়, যেখানে সে নিজেকে নিয়মের ঊর্ধ্বে
ভাবতে শুরু করে।
একজন কর্মকর্তা যখন দেখেন, তার একটি স্বাক্ষরে কোটি টাকার কাজ আটকে বা
ছেড়ে দেওয়া যায়, তখন সেই ক্ষমতার সঙ্গে অর্থের প্রলোভন যুক্ত হয়।
যদি সেখানে জবাবদিহি না থাকে, তবে ক্ষমতা ধীরে ধীরে নৈতিকতাকে গ্রাস করে।
তখন দুর্নীতি আর ব্যতিক্রম থাকে না; সেটাই হয়ে ওঠে স্বাভাবিক আচরণ।
সামাজিক স্বীকৃতির ফাঁদ
আমাদের সমাজে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা আছে।
আমরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করি না—“টাকাটা কীভাবে এলো?”
বরং দেখি—বাড়ি কত বড়, গাড়ি কত দামি, সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, বিয়েতে কত খরচ
হলো।
সৎ মানুষকে সম্মান করার বদলে আমরা অনেক সময় সম্পদশালী মানুষকে সম্মান
করি, সম্পদের উৎস যাই হোক না কেন।
এই সামাজিক স্বীকৃতি দুর্নীতিকে নীরবে বৈধতা দেয়।
যখন সমাজ সম্পদের উৎসের চেয়ে সম্পদের প্রদর্শনকে বেশি মূল্য দেয়, তখন
সততা ধীরে ধীরে অলাভজনক মনে হতে শুরু করে।
“সবাই করছে”—সবচেয়ে বিপজ্জনক
যুক্তি
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হলো—নিজেকে নির্দোষ
মনে করা।
“আমি না নিলে অন্য
কেউ নেবে।”
“সবাই তো করছে।”
“একজন মানুষ সৎ থেকে
কী পরিবর্তন আনবে?”
এই যুক্তিগুলো মানুষের অপরাধবোধ কমিয়ে দেয়।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় moral disengagement—অর্থাৎ নিজের অনৈতিক
কাজকে মানসিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।
একসময় মানুষ আর নিজেকে অপরাধী মনে করে না।
শাস্তির ভয় নয়, ধরা পড়ার ভয় এবং আরেকটি বড় সত্য হলো— অনেক দুর্নীতিবাজ মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায় না; তারা শুধু ধরা পড়তে ভয় পায়।
অর্থাৎ নৈতিকতা তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং ঝুঁকির হিসাব করে।
যেখানে আইনের প্রয়োগ দুর্বল, বিচার দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ এবং শাস্তি অনিশ্চিত,
সেখানে দুর্নীতির ঝুঁকি কমে যায়।
মানুষ তখন মনে করে— “কিছু হবে না।”
এই মানসিক নিরাপত্তাই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
পরিবার কী শেখাচ্ছে?
একটি শিশু যখন দেখে—
তার বাবা ট্রাফিক পুলিশকে টাকা দিয়ে ছেড়ে আসেন,
স্কুলে ভর্তি হতে সুপারিশ লাগে,
সরকারি সেবা পেতে “ম্যানেজ” করতে হয়,
তখন সে শেখে—
নিয়ম নয়, প্রভাবই আসল শক্তি।
অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু অফিসে শেখা হয় না; অনেক সময় তা পরিবার ও সমাজ থেকেই
শেখা হয়।
সততা কোনো জন্মগত গুণ নয়, এটি একটি সামাজিক শিক্ষা।
শুধু আইন কি সমাধান?
না।
পৃথিবীর অনেক দেশে কঠোর আইন আছে, কিন্তু দুর্নীতি কমেনি। আবার কিছু দেশে আইনের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ এত শক্তিশালী যে মানুষ সুযোগ থাকলেও অনৈতিক কাজ করতে দ্বিধা করে।
অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের তিনটি স্তম্ভ রয়েছে—
প্রথমত, কার্যকর ও নিরপেক্ষ আইন।
দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী জবাবদিহি।
তৃতীয়ত, নৈতিক সংস্কৃতি।
এই তিনটির একটি দুর্বল হলে বাকি দুটি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর থাকে না।
বাংলাদেশের বাস্তবতা-
বাংলাদেশে দুর্নীতির পেছনে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে— অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বচ্ছতার ঘাটতি, দুর্বল জবাবদিহি, সামাজিকভাবে অবৈধ সম্পদের গ্রহণযোগ্যতা এবং সর্বোপরি দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবল মানসিক চাপ।
আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কিন্তু এর বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে—
ঢাকা/টিএ