একদিকে বাবার রক্তচক্ষু, অন্যদিকে বুকের ভেতর গান গাওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। একদিকে সামাজিক অনুশাসনে চার দেয়ালে বন্দি জীবন, অন্যদিকে সুর-তার-লয়ের ডানায় ভর করে দূর আকাশে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন। পনের বছরের ইনসিয়ার কাছে গান গাওয়া শুধু শখ নয়, যেন নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার লড়াই।
এমনই এক কাহিনী অবতারণা করে ২০১৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল বলি সিনেমা 'সিক্রেট সুপারস্টার'। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা ইনসিয়া ছোট্ট এক শহরে বাবা, মা, ছোট ভাই আর দাদির সাথে বসবাস করতো। আর আট-দশটা মেয়ের মতোই সাধারণ জীবন ছিল তার। তবে এই সাধারণ জীবনের মাঝে অসাধারণ ছিল তার প্রতিভা, তার স্বপ্ন।
ছয় বছর বয়স থেকে গিটার বাজানো মেয়েটার চোখে ছিল একদিন অনেক বড় গায়িকা হবার স্বপ্ন। কিন্তু রক্ষণশীল বাবার ভয়ে নিজের স্বপ্নের কথা প্রকাশ্যে বলার সাহস ছিল না তার। তাই একদিন সে নেয় এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। মুখে নিকাব, হাতে গিটার—নিজের পরিচয় আড়াল করে ইন্টারনেটে গান প্রকাশ করতে শুরু করে কিশোরীটি। পৃথিবী তখন তাকে চেনে না, জানে না; শুধু শোনে তার কণ্ঠ। আর সেই কণ্ঠই ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। কিন্তু স্বপ্ন যত বড় হতে থাকে, বিপদের আশঙ্কাও তত বাড়ে। এরপর জীবনের অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে অবশেষে একদিন সক্ষম হয় তার স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে আনতে পারার।
ইনসিয়ার গল্প কাল্পনিক। কিন্তু তার লড়াইয়ের প্রশ্নটি বাস্তব। এই মুভিটি যেন আমাদের প্রশ্ন করে, মেয়েটির স্বপ্ন কি সত্যিই তার নিজের? নাকি ছোটবেলা থেকেই সে কোন পথে হাঁটবে, কত দূর এগোবে, কোথায় গিয়ে থেমে যাবে-তার পরিবার, সমাজ আর প্রচলিত ধারণাই ঠিক করে দেবে এই স্বপ্নের সীমানা?
প্রতিবছর পালিত হওয়া ১১ অক্টোবর "আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস" আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দিনটি কেবল কন্যাশিশুদের নিয়ে উদ্যাপনের নয়; বরং তাদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার দিন।
কেন এই দিবস?
১৯৯৫ সালে বিশ্ব নারী সম্মেলনে প্রায় ২০০টি দেশ থেকে প্রায় ৩০,০০০ মানুষ চীনের বেইজিং-এ সমবেত হয়েছিলেন। এটি ছিল এই ধরনের চতুর্থ বিশ্ব সম্মেলন। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ব্যাপক একটি মঞ্চ তৈরি করেন।
২০১১ সালে, বিশ্বজুড়ে দেখা যাওয়া প্রচারণার ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ডিসেম্বরে ৬৬/১৭০ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে, এবং ২০১২ সাল থেকে ১১ অক্টোবর ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই দিবসের মূল লক্ষ্য — কন্যাশিশুদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা এবং তাদের ক্ষমতায়নের জন্য সচেতনতা তৈরি করা।
জন্মের মুহূর্ত থেকেই একটি শিশু বড় হয়ে বিজ্ঞানী, লেখিকা, ব্যবসায়ী নেত্রী, মা, শিক্ষিকা বা নিজের পছন্দের যেকোনো কিছু হতে পারে। তাকে নিজের পছন্দ বেছে নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর বিকল্প, শিক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অর্থ হলো তার সম্মুখীন হওয়া কিছু বাধা দূর করা।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক অংশগ্রহণে মেয়েদের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সুযোগের এই বিস্তার সবার জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি। সে কোথায় বাস করে তার উপর নির্ভর করে একজন কিশোরীর প্রতিবন্ধকতাগুলো ভিন্ন হয় এবং সেই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। পৃথিবীর বহু জায়গায় এখনো একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা, সামাজিক রীতিনীতি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ কিংবা লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের মধ্য দিয়ে।
ইউনিসেফের ২০২৬ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য, "কন্যাশিশুদের অধিকার রক্ষা এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে বিনিয়োগ করা" (End child marriage and invest in girls' rights).
এই প্রতিপাদ্যটি শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি জরুরি আহ্বান। এই আহ্বান মনে করিয়ে দেয়, মেয়েদের ভবিষ্যৎ বদলাতে শুধু সচেতনতার কথা বললেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, প্রয়োজনীয় সেবা, শিক্ষার সুযোগ এবং তাদের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক উদ্যোগ।
পরিসংখ্যানের আয়নায় কন্যাশিশুর বাস্তবতা
কন্যাশিশুদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বৈশ্বিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো জরুরি। ইউনিসেফের ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে জীবিত প্রায় ৬৫ কোটি নারী ও কন্যাশিশুর ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক প্রতি পাঁচজন মেয়ের একজন শৈশবে বিয়ের শিকার হয়েছে। প্রতিবছর আরও ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। যা গড়ে প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বিশ্বে ১২২ মিলিয়ন(১২ কোটি ২০ লাখ) কন্যাশিশু এখনও শিক্ষার বাইরে আছে। ১০ জন কিশোরীর মধ্যে প্রায় ৪ জন উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারে না। অর্থাৎ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হলেও একটি বিশাল অংশ ঝরে পড়ছে।
১৫-১৯ বছর বয়সি মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকার সম্ভাবনা ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুণ। এর ফলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছে না এবং চক্রাকারে পরনির্ভরশীলতা বাড়ছে।
বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার হার ৩৪.৮৭ শতাংশ, এবং ঝরে পড়া ছাত্রীদের প্রায় ৭১ শতাংশ বাল্যবিবাহের কারণে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
বাল্যবিবাহ কেবল একটি মেয়ের শৈশব হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি তার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাকে চিরতরে সংকুচিত করে দেয়।
বাংলাদেশের মেয়েরা কতটা এগিয়েছে?
"বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)" ও ইউনিসেফের "বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে" (MICS) ২০২৫ অনুযায়ী, ২০–২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথম বিয়ে হয়েছিল। ২০১৯-এর জরিপে এই হার ছিল ৫১.৪%। শতাংশের হিসেবে কমলেও বাস্তব চিত্র হলো, এখনও বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যাচ্ছে।
একই বয়সী নারীদের ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছিল ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। আর ১৫–১৯ বছর বয়সী মেয়েদের একটি বড় অংশ (৩৮.৯%) পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গড়ার বয়সেই বৈবাহিক জীবনের মুখোমুখি হচ্ছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে ইউনিসেফের এই চূড়ান্ত প্রতিবেদনে একটি আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে যে, বাল্যবিবাহ কেবল দারিদ্র্যের কারণেই ঘটছে না। উচ্চমাধ্যমিক পাস করা মেয়েদের মধ্যেও ২৫% এবং দেশের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলোর মধ্যেও প্রায় ৩১.৫% মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে যাচ্ছে।
ইনসিয়ার গল্প যেখানে শেষ, আমাদের লড়াই সেখানে শুরু
একটি মেয়েকে নিরাপদে বড় হতে দেওয়া নিঃসন্দেহে জরুরি। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার সামনে সম্ভাবনার দরজাগুলোও খুলে দিতে হবে।
ধরা যাক, একটি মেয়ে ছবি আঁকতে ভালোবাসে। আরেকজন খেলাধুলায় আগ্রহী। কেউ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চায়, কেউ শিক্ষক হতে চায়, কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তাদের প্রত্যেকের আগ্রহ আলাদা। সবার জন্য একই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেওয়া যায় না।
সিক্রেট সুপারস্টার ইনসিয়া যেমন নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেয়েছিল, তেমনি প্রতিটি কন্যাশিশুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে অসীম সম্ভাবনা। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে দরকার; নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ, এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।
কন্যাশিশুদের জন্য বিনিয়োগ মানে শুধু অর্থ নয়; এটি মানে পরিবার, সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতা। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে জাতিসংঘের ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’ (CSW) অধিবেশন চলাকালীন এক তথ্যে জানা যায়, গত ২৫ বছরে শিক্ষা, আইনি সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগের ফলে প্রায় ৬৮ মিলিয়ন(৬ কোটি ৮০ লাখ) বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। প্রমাণ রয়েছে — পরিবর্তন সম্ভব, যদি আমরা একসাথে কাজ করি।
সিক্রেট সুপারস্টার-এর ইনসিয়া তার কণ্ঠকে পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য লড়েছিল। বাস্তব জীবনের প্রতিটি মেয়েকে অবশ্য নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হবে, এমন কোনো পৃথিবী আমাদের কাম্য নয়। একটি মেয়ের প্রতিভা যেন তার পরিবারের ভয়, সামাজিক বিধিনিষেধ কিংবা বৈষম্যের আড়ালে চাপা পড়ে না থাকে—সেই পরিবেশ তৈরি করাই জরুরি। আর এই পরিবর্তন পরিবার থেকেই শুরু হোক।
১১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করি, প্রতিটি কন্যাশিশু যেন তার পূর্ণ সম্ভাবনায় বেঁচে উঠতে পারে, স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখতে পারে, এবং নিজের গল্প নিজেই লিখতে পারে।
কারণ প্রতিটি কন্যাশিশুই আসলে একজন সিক্রেট সুপারস্টার — যার অপেক্ষা শুধু একটি সুযোগের।