কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–১

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬

কাজী রাফির ‘ত্রিমোহিনী’ | ধারাবাহিক উপন্যাস | পর্ব–১

বাড়ির প্রজ্ঞাময় পুরুষ নওফেল আখন্দ এক সোমবার মৃত্যুবরণ করলে কবরস্থানের দিকে তার লাশ বহনের সময় এগারো বছর বয়সী শুভ্রর চোখের সামনে এক দৃশ্য ভেসে উঠল- বাড়ির পেছনের বাগান এবং পুকুরের পাশে পশ্চিমের দিগন্তছোয়া মাঠের দিকে ঢালু খড়ের চালার নিচে বসে এক বিকেলে কালবৈশাখি ঝড়ের পূর্ব মুহূর্তে এবং পৃথিবীকে আঁধারে ঢেকে ফেলা ফণাতোলা গতিময় কালো মেঘের অস্তিত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার দাদা নওফেল আখন্দ পূর্ণ মনোযোগে লাঙলের ফলার অংশটুকু ধারালো করতে ব্যস্ত। শুভ্রর মনে পড়ল সেই বিকেলের কথা যে বিকেলে নদীর কিনারে নৌকা নোঙর করে একদল বেদে-বেদেনির দল ত্রিমোহিনীতে তাদের তাবু ফেললে গ্রামটির বাতাসে ভেসে থাকা ‘নিসংগতায়’ চঞলতাই শুধু ভর করল না, তার দাদা নওফেলের মতো মানুষ তাকে নিয়ে দ্রুত হেঁটে তাদেরই এক যাদুকরের যাদু দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, যে যাদুকর এক শিশুর দ্বিখন্ডিত মস্তক জোড়া দেয়ার পূর্বে সবাইকে জোড় করতালি দিতে বলছেন।


সেই বেদে-বেদেনির দলে আরো ছিল একজন সাপুড়ে যে ছোট বিষাক্ত সাপ মুখে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে তা গলাধঃকরণের চেষ্টা করতে গিয়ে সাপের ছোবলে জখমকৃত জিহবা বের করে দেখিয়ে দ্রুত তাদের তৈরি ঔষধি গাছ-গাছরার ভেষজ খেয়ে বেঁচে যায় এবং তাদের ভেষজবিদ্যার গুনাগুণ প্রচার করে। সাপের কামড় থেকে বাচাঁর জন্য সাপুড়ের ভেষজ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। কেউ কেউ চাল, আলু, ডাল, মোরগ-মুরগির বিনিময়েও ওষুধগুলো সংগ্রহ করে।


বেদে-বেদেনির মহিলা দলটির কার্যক্রমও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ত্রিমোহিনী গ্রামে দুধ দাঁতের শিশু খুব বেশি না থাকলেও বেদেনিরা যতেœর সাথে তাদের দাঁতের পোকা তোলাতে মায়েদের এই বলে বাধ্য করান যে, তা না হলে দাঁত-পোকারা শিশুদের পেটে গিয়ে সাপের সমান কৃমি তৈরি করবে যার ফলে পেটটা শরীরের তুলনায় বড় দেখাবে। বস্তুত ত্রিমোহিনী গ্রামে দরিদ্র অনেক শিশুরই পুষ্টিহীনতার চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। বেদেনির কথায় হতাশ সেইসব পুষ্টিহীন কিশোরদের মায়েরা জানান, তাদের বাচ্চাদের ছোটবেলায় দাঁতপোকা তোলা হয়নি বিধায় তাদেও পেটের কৃমিগুলো হয়তো এতদিনে সাপের মতো হয়েছে। তখন বেদেনিরা সেসব কৃমি নিধনের ওষুধও তাদের কাছে আছে বলে জানালে এবার সেইসব ওষুধ আরো বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু বেদেনিরা এবার খুব বেশি প্রতারণা করে না । তারা আসলে নিজ হাতে মৌচাকের চাক কাটা মধু আর ফুল-ফলের নির্যাসে তৈরি পুষ্টিকর কিছু খাবার মায়েদের হাতে দেয় এবং রাতে খাবারের পর দুধ সহকারে দুই চা চামচ সমান ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেয়। 


শুভ্রর শরীর পুষ্টিহীন নয় বরং যথেষ্ট তাগড়া এবং ছলছলে তবু নওফেল তার মা-বাবাহীন নাতি শুভ্রের জন্য মায়ের ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং তিনি ত্রিমোহিনীর একমাত্র পুরুষ যিনি বেদেনির কাছ থেকে এই ভেষজ কিনেছেন বলে রব পড়ে যায়। বেদেনির সব ভেষজ বিক্রি শেষেও তারা আগাম সরবরাহের জন্য আদেশপ্রাপ্যতা হিসাবে চাল-ডাল-আলু-সবজি-মূরগির সংগ্রহ বাড়াতেই থাকে। 


ব্রিটিশ কোর্টে দায়িত্ব পালন শেষে শুভ্রর দাদা যেন আরো প্রাণময় হয়ে উঠেছেন। তার প্রাণময়তা আপাতত লাঙল নিয়ে গবেষণার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও তিনি তার পিতৃ-মাতৃহীন নাতি শুভ্রকে নিয়ে ভোরের সূর্যোদয়ের আগে গাছপালা বেষ্টিত আর তেপান্তরছোয়া জলাভূমির ওপর বিস্তৃত টিলাটিতে যাওয়ার নেশা বাদ দেননি। এই টিলাটায় এলেই তিনি কেন এত আনন্দমুখর হয়ে উঠতেন সেই প্রশ্ন উঠলে তিনি শুভ্রকে বলেন,


আমি ছোট থাকতেই এই টিলাটা বাঘদের দখলে ছিল বলে আমার দুঃখের শেষ ছিল না। সব বাঘ একে একে চিড়িয়াখানায় আশ্রয় নেবার পর আমার উদ্যোগে এটা মানুষের বিচরণভূমি হয়ে উঠল। শত শত মানুষ দিয়ে জংগল, ঘাস-আগাছা পরিস্কার করে এটাকে যেদিন সাপের ছোবলে আর বিছা-মশা ও পোকা-মাকড়ের কামড়ের নাস্তানুবাদ হয়েও সবুজ চাদরে মোড়া এক স্বপ্নভূমি বানালাম, সেদিন আমার প্রথম পৃথিবী আবিস্কারের আনন্দে আমি বিভোর হয়ে উঠলাম। খোকা রে, এই টিলার ঘাসের ওপর বিছানো গামছায় শুয়ে আমি পৃথিবীর সেরা সব বই যখন পড়েছি তখন আমার মনে হয়েছে আমি এক সাথে দুই মহান গ্রন্থের পাঠ নিয়েছি। তার একটা হলো প্রকৃতি। একটা উঁচু ভূমি থেকে সামনের জলাভূমি আর এক স্বপ্নময় পৃথিবীকে দেখার সৌভাগ্য কয়জন মানুষের হয়!

 

দাদার লাশবহনকারী যখন কবরস্থানের পথে পুকুরপাড়ের বাঁক খাওয়া অংশটুকুতে প্রাচীন ছোট্ট জংগল যা গ্রামের মানুষের ভাষায় "শরতলা’ নামেই কথিত তা অতিক্রম করেছেন তখন শুভ্রর মনে পড়ল, ঐ জংগল নিয়ে তার দাদার বলা গল্পগুলো। এক ভরা পূর্ণিমার সাঝবেলা পেরিয়ে গেছে। সেই বনের পাশ দিয়ে বাবা মাঠ থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তিনি জোছনার আলো আঁধারির মাঝে বনের ভিতরে অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখে দ্রুত বাড়ি ফিরে এলেন এবং তিনি তার মাকে হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

মা, তুমি এখানে? 

দাদি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাতেই শুভ্রর দাদা নওফেল পুনরায় তার দাদিকে জিজ্ঞাসা করলেন,

কিন্তু আমি তো দেখলাম, তুমি দাদাজানের সাথে শরের-তলায় বসে গল্প করছ। তোমাদের সাথে আরো রয়েছেন...

দাদা তার মাকে গ্রামের এমন সব লোকের নাম বললেন যারা অনেক বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। তার মা নওফেলকে শক্ত করে এক ঝাকুনি দিলেন এবং হেসে বললেন,

শরতলার ভূত দেখি আজ বাড়ি পর্যন্ত এলো। তোর দাদা তো আরো এগারো বছর আগে মারা গিয়েছেন! 


      গল্পটা শোনার পর শুভ্র যখন ভয়ে তার দাদাকে জড়িয়ে ধরল তখন তিনি শুভ্রকে বোঝালেন, ভয়ের কিছু নেই। এসবই গল্পের অনন্য শক্তি। বস্তুত গ্রামের মানুষ মৃত যেসব আত্মাকে সেখানে মাঝে মাঝেই গল্পের ঘোরে আবিস্কার করতেন তারা জীবিতাবস্থায় গ্রামের মানুষদের গল্পের মাঝে বুঁদ করে রাখতেন। যেমন, মেছো ভূত মাছ অথবা ভাত চাইতে এলে গ্রামের মানুষ তাদের হাতে পাটার গরম শীলটা দেওয়ামাত্র সেই ভূতগুলো দৌড়ে পালাত ঐ ছোট্ট জংগলটায়। এসব গল্পের কারণেই সেই শরতলা নামের ছোট্ট জংগল গ্রামের মানুষের কল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল আর সেই কল্পনা এতটাই জীবন্ত যে, তারা মৃত হলেও নিসংগ ভাবনায় অথবা হিসাব না মেলা জীবনের ভার লাঘবে মনে মনে প্রিয় সেইসব গল্পবলিয়েদের গল্প শুনতে চাইতেন। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, শরতলায় সেইসব মৃত আত্মাকেই দেখা যেত যারা গল্প বলতেন, ছিলেন ত্রিমোহিনীর গল্পবলিয়ে। 


তিনি একটু থেমে পুনরায় শুভ্রকে বলেছিলেন,

জীবন এমন কোনো গল্প খুঁজে ফিরে যেখানে জীবন "অনন্ত’ কল্পনা "অবারিত’ আর আত্মা দারুনভাবে "তৃপ্ত’। গল্প এবং গল্পের দৃশ্যকল্প আমাদের মননে যে আলো জ্বেলে রাখে, করে চক্ষুষ্মান তা-ই আমাদের তাড়িত করে স্বপ্নের কাছে ফিরে যেতে। সেই স্বপ্নময়তার ঘোর এত দূর বিস্তৃত হয় যে, আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষদের আত্মার স্পন্দন অনুভব করি। আমাদের জীবন হয়ে যায় বিস্তৃত। 


         লাশ বহনকারী দল ছোট্ট জংগলের আড়ালে অদৃশ্য হতেই শুভ্রর মনে পড়ল,

মৃত্যুর কিছুদিন আগে তার দাদা তার শেষযাত্রার এই পুরাতন পুকুরটার আশপাশের জমি কেটে আরো বড় করেছেন, কিন্তু অনেককাল আগের ছোট্ট জংগলটিকে রক্ষার জন্য পুকুরকে সরলরেখায় না কেটে কিছুটা ভেতরের দিকে নেয়া হয়েছে জংগলটিকে ঘিরে প্রচলিত এক রহস্যময়তার কারণে।  


       শুভ্র তখন খুব ছোট্ট। দাদা নওফেল অনেক ভোরে কয়েক মাইল হেঁটে এসে শুভ্রকে নিয়ে বসে নিজ হাতে বানানো "র’ চা দিয়ে সকাল শুরু করতেন। শুভ্রর মা জেবুন্নাহার শশী তার আগে ছেলের হাত-মুখ ধুয়ে গায়ে ভালো করে শাল জড়িয়ে দিয়েছেন। সময়টা তার প্রায় মনেই পড়ে না। তবে পরে দাদার কাছ থেকে সে জেনেছিল যে, সময়টা ছিল দেশভাগের মুহুর্ত। গর্ভবতী স্ত্রী জেবুন্নাহার শশীকে রেখে শুভ্রর বাবা নাফি আহমেদ কলকাতায়... গিয়েছিলেন এমএ চূড়ান্ত পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই তার লাশ এলো। কেউ বলেন, দেশভাগের প্রাক্কালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় কংগ্রেসিদের রোষানলে পড়ে, কেউ বলেন দূর্ঘটনায় নিহত নাফি আহমেদের লাশ সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত প্রায় এগারো ঘন্টা পর রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শশী প্রতিদিন ভাবতেন পুকুরপাড়ে ছোট্ট জংগলটার কাছে হয়তো নাফির আত্মার সাথে তার আচমকা দেখা হবে। অথবা পৃথিবীর কক্ষচ্যুত সেই গ্রহাণুর সাথে চোখাচোখি হয়ে যাবে ছোট্ট শুভ্রর! তাতে নিজের মৃত্যু হলেও তার দুঃখ থাকবে না যদি কাগইলের গণকের কথামতো তার শুভ্র হয়ে ওঠে এক প্রজ্ঞাময় মানুষ যে সব প্রাণীর চোখের ভাষা পড়ে নিতে পারে। 


       আখন্দ বাড়ির প্রবেশপথ থেকে কয়েকশ গজ দূরে সেই জংগলের আগে রয়েছে কিছু তালগাছ আর বাঁশঝাড়। সেখানে ছোট্ট শুভ্রকে কোলে নিয়ে তার মা জেবুন্নাহার শশী আঁধার ঘনিয়ে আসা এক সন্ধ্যায় প্রকৃতির রহস্যময় ব্যাপারগুলো নিরিক্ষণ করবেন বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখলেন, পুকুরপাড়ের অপরপ্রান্তে তালগাছের ঠিক মাথার ওপর থেকে বড় এক ধূমকেতু প্রলম্বিত করে দিয়েছে শুভ্র তার মা শশীর ছায়াকে, যে ছায়া বাঁশবাগান পেরিয়ে আরো অনেক দূর দূর হয়ে তার চোখের সীমানা ছেড়ে অসীম অন্ধকারে তাদের মা-শিশুর ছায়াকেই আলোক বানিয়ে সেই ছায়ালোক ছুটে চলল রহস্যময় জংগল পেরিয়ে...ত্রিমোহিনীর সবচেয়ে উঁচু গাছটার মাথা পেরিয়ে আকাশের পানে। আকাশের অসীমে অনন্ত তারকালোকে ঠিক সপ্তর্ষিমন্ডলির কাছে। শশী ভয় পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে তিন বছরের ছেলের মুখপানে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। শুভ্র অনেক বয়সী মানুষের পরিণত গাম্ভীর্য অথচ অপার আনন্দ চোখে ধারণ করে শিশুসুলভ মিষ্টতার ভুল উচ্চারণে শশীকে বলল, 

মা, তলো! আমরাও দাই! শশী ভীতু স্বরে ছোট্ট শুভ্রকে প্রশ্ন করলেন, 

কোথায় বাবা?

আকাশে! 


       শশীর শরীর শিরশির করে উঠল। চোখ কেন যেন জলে ভরে গেল। ছেলেকে কোলে নিয়ে এক দৌড়ে বাড়ি ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে শশীর মনে পড়ল, শুভ্র তার গর্ভে থাকাকালীন ত্রিমোহিনীতে এক গণক এসেছিলেন যিনি তার হাত দেখে চমকে উঠে শশীর মুখপানে অনেকক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে ছিলেন। কাগইলের গণক নামে সমধিক পরিচিত সেই গণকের দুই হাটুর মাঝখানে সারাক্ষণ ঝুলে থাকা মস্তকটি তুলে এই প্রথম কোনো নারীর পানে অমন হতভম্ব দৃষ্টিতে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন বলে আশপাশে থাকা এবং হাত গোনাতে আসা অন্য সব নারীগণ পালিয়ে গেলেন। গণক বললেন,

মা রে, তোর গর্ভে হাজার বছরের এক প্রাচীনত্ব! তুই কোন গ্রন্থ পাঠ করিস বল তো মা? তুই কি প্রকৃতি আর আকাশ দেখে খুব ভাবনায় পড়ে যাস?

শশী মাথা নত করেছিলেন। ছোট্টবেলায় থেকেই শশীর গ্রন্থের প্রতি প্রবল আগ্রহের জন্য তার বাবা একদিন নওফেল আখন্দকে গিয়ে বললেন,

আমার এই বই-পাগল কন্যার জন্য আপনার লাইব্রেরিটা ব্যবহারের অনুমতি দিলে আমি খুব কৃতার্থ হই।


       শশী নামের মেয়েটিকে তিনি শুধু গ্রন্থাগার ব্যবহারের অনুমতিই দিলেন না, বেছে বেছে পড়ার জন্য তিনি শশীর জন্য বই নির্বাচন করে দিলেন। হ্যান্স অ্যান্ডারসনের গল্প দিয়ে শুরু করে একসময় শশী শেক্সপিয়ার, ফকনার  পড়া শুরু করল। নওফেল জ্ঞানপিপাসু শশীকে এতটাই ভালোবাসলেন যে, সন্ধ্যাবেলায় তিনি তাকে পড়ানো শুরু করিয়ে দিলেন। তিনি পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াতগুলোর প্রতিটি শব্দের গভীরতর অর্থ শশীর কাছে ব্যাখ্যা করলেন, বেদ-গীতা, মহাভারত-উপনিষদ আর বাইবেল হয়ে অনেক মহৎ উপন্যাস পাঠে শশীর মানস-গঠন হয়ে উঠল সবার চেয়ে আলাদা। ভিঞ্চির আঁকা "দ্য লাষ্ট স্যাপার’ চিত্রকর্মের মাঝে লুকানো গোপন এক ইতিহাস নওফেল যে ঝড়ের রাতে তাকে বুঝিয়ে বলল, শশী এত মগ্নতা উপলব্ধি করার চেষ্টার করল যে, রাতে বেঘোর ঘুমে সে স্বপ্ন দেখল, সে যিশু খৃষ্টের পাশে একটু কাত হয়ে বসে মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছে। যিশুও এমন ভংগিতে কাত হয়ে তার কানের পাশে ফিসফিস করছেন যে, তাদের দুজনের শরীর একটা উল্টা ইংরেজির "এম’ অক্ষর যা ঘুরিয়ে দিলে "ডব্লিউ’ হয়ে যায়-এমন অবয়ব তৈরি করছে। তবু যিশু যেন এক আয়নার ভেতরে শশীরই শরীরের উল্টা প্রতিবিম্বমাত্র। তার শরীরের ডান পাশের পোষাকের লাল বর্ণ যিশুর বামে আর বামের নীল অংশ যিশুর ডানে সমভাবে সেই আরশিতে প্রতিফলিত। শশীর স্ফীতকায় পেটে যেন এক অস্তিত্ব আর চুলের বিন্যাসে কপালের কাছে কোকড়ানো চুলের বিস্তার না দেখেও সে সেই কেশগুচ্ছের অস্তিত্ব অনুভব করছে। কিন্তু যিশুর পেছনে তার ডানের লোকটি তালুহীন এক হাতে লুকিয়ে রাখা চাকুকে শক্ত করে ধরে ইংরেজিতে ফিসফিস করে বলছে, 


ইউ ক্যান নেভার হাইড ইউরসেলফ। উই নো ই আর অ্যা উওম্যান, ইউ আর ম্যারি মাগদালিন! ইউ উইল বি কিলড্ সুন...


      স্বপ্নের ভাব-গাম্ভীর্যে ডুব দেয়ার সামর্থ শশীর ছিল না। সে ভয়ে চিৎকার করে উঠল। পরের দিন স্বপ্নের কথা নওফেলকে বললে তার মানস-কারিগর নওফেল স্মিত হাসলেন এবং নস্ত্রাদামুর ভবিষ্যতবাণী নিয়ে লম্বা এক গল্প শোনানোর পর শশীর মাথায় হাত রেখে বললেন,

মা, আমি তোমাকে আমার পূত্রবধু করে পেলে খুব খুশি হব, যদি তোমার কোনো আপত্তি না থাকে।

শশী নওফেলকে বাবা সম্বোধনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। তবু কি এক লজ্জা এসে তাকে ভাষাহীন খুশিতে আরক্তিম করে তুলল এবং সে পালিয়ে গেল। এরপর যেদিন সে আখন্দ পরিবারে এলো তার শরীর আর মুখটা তখন নববধুর অবগুন্ঠনে ঢাকা ছিল। 

কিন্তু গণক কীভাবে তার অতীতটুকু টের পেল, তা নিয়ে তিনি যখন গভীর ভাবনায় লাজুক হয়ে উঠেছিলেন ঠিক তখনই কাগইলের গণক তাকে পরের বাক্যটি বললেন,

 

       সন্তান জন্মের পর পাঁচ বছর তুই সন্ধ্যায় কখনোই পুকুরপাড়ে যাস নে । পঁচাত্তর বছর পর পর বিরাট এক ধূমকেতু পৃথিবীর কক্ষের একেবারে কাছাকাছি চলে আসে। ঐ ধূমকেতুর সাথে তোর গর্ভের ছেলে জাতকের এক যোগসূত্র আছে। তা দেখে ফেললে তুই বেশিদিন বাঁচবি না, তবে তোর সন্তান যদি তা দেখে ফেলে তবে সে হয়ে উঠবে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। সে হবে এই শতাব্দীর সবচেয়ে প্রজ্ঞাময় মানুষ যে পড়ে ফেলতে পারবে সব প্রাণীর চোখের ভাষা। কিন্তু বড় আফসোস! এই সমাজ তাকে ধারণের জন্য যোগ্যতম স্থান নয় রে মা! 


        শশী দরজায় পা রেখে শুভ্রকে আরো শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আনন্দাশ্র“গুলো তার গন্ডদেশ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ছে। নিজের মৃত্যু হবে জেনেও এমন সন্তানকে নিজের গর্ভে পেয়ে তিনি তার অশ্রুধারা স্রষ্টার উদ্দেশে সমর্পণ করলেন। কাগইলের গণকের বাণী যেন সত্যি হয় কামনা করে তিনি মনে মনে স্রষ্টার কাছে আকুল  প্রার্থনা  করলেন।  যে  কামনা শুধু সন্তানের জন্য একজন মায়ের পক্ষেই করা সম্ভব। তিনি অশ্র“সজল চোখে প্রার্থনার স্বরে মহান স্রষ্টাকে বললেন, তার শুভ্রর ভেতরে স্রষ্টার মহাদান ধূমকেতুর আলোটুকু যেন সারাজীবন শুভ্রকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে রাখে!  


        পরেরদিন সেই গল্পটা শশী শ্বশুর নওফেলকে বলতে ভুল করলেন না । তার ঠিক তিন মাসের মাথায় শশীর শরীরের তাপমাত্রা প্রতিদিন এক ডিগ্রি করে বাড়তে থাকল। সেই জ্বর অষ্টম দিনে যখন ১০৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা অতিক্রম করল, মৃত্যু খুব কাছে জেনে শশীর মুখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। সেই ধুমকেতু সত্যিই তার শরীরে ভর করেছে ভেবে কাপড়ের ভেতর তার উত্তপ্ত শরীর রেখে তিনি শুভ্রকে পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে পাশে বসে থাকা শ্বশুর নওফেলকে বললেন,  


                  আমার মতো মৃত্যু কয়জনের হয়! বাবা, বড় হলে ওকে বলবেন, আমি সেই ধূমকেতু হয়ে আকাশে ওর জন্য অপেক্ষা করব।  শুভ্র যেন কাউকে নিয়ে কখনোই আগাম কথা না বলে। শুভ্রকে বলবেন, আপনি আর সে ছাড়া এই কথাগুলো পৃথিবীর কেউ জানবে না। আমি জানি, ঝড়ুর মতো পাঁচটা লেজবিশিষ্ট ধূমকেতুর সব আলো আমার শুভ্রর সাথে সারাজীবন বাস করবে! 

মা’র চেহারা একটু একটু মনে পড়লেও আজ অশ্র“ভেজা ঝাপসা চোখেই মায়ের অবয়ব স্পষ্ট ভেসে উঠল। 


         দাদার মৃত্যুর দিন শেষে সোমবার সন্ধ্যা নেমে এলে শুভ্র যখন সত্যি আবিষ্কার করল তার দাদা বাসাটায় নেই, তার বিছানা শূন্য তখন তার ছোট্ট হৃদয়ের নিসংগ অনুভবে মার চেয়ে দাদা নওফেল এসে ঘোরাফেরা করলেন। দাদার বিছানাতেই, যে বিছানায় আজ সকালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, ঘরের আলো নিভিয়ে সেই বিছানায় শুয়ে পড়ল শুভ্র। নাহ, তার দাদা তাকে ছেড়ে যায়নি। তিনি মরে গিয়েও স্পষ্টত তার কাছে ফিরে এলেন। শুভ্র তার ছোট্ট মায়াময় জীবনের অতীতের ঘোরে হারিয়ে গেল।  


       এক শেষ পৌষের বিকেলে নির্জন মাঠে নিয়ে গিয়ে সেই মাঠের গাছপালার ছায়াঢাকা এক টিলার ওপর মাদুর বিছিয়ে শুভ্রকে তার দাদা শুইয়ে দিচ্ছেন। তারপর কাগজ কলম নিয়ে তিনি নিবিড়ভাবে আকাশটাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। আর শুভ্র একবার পর্যবেক্ষণ করছে তাকে আর একবার আকাশকে। সাদা চুল-দাড়ির সৌম্যকান্ত দাদার কাছে তার এইসব কর্মকান্ডের কারণ জানতে চাইলে তিনি আকাশের দিকে শুভ্রকে তাকাতে বললেন। শুভ্র তাকে জিজ্ঞাসা করল,

আমি তো আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি  হেসে বললেন, 

আজ থেকে জেনো, আকাশ বলে কিছু নেই। যা আছে তা মানুষের জন্য কিছু নিদর্শনমাত্র। তিনি নীল আকাশে তরমুজের গায়ে ফুটি ফুটি সাদা সাদা দাগের মতো এখানে সেখানে ঘন হয়ে জমে থাকা মেঘ দেখিয়ে বললেন,

আগামি বছর ১৩ই চৈত্র বিকেল তিনটা ছত্রিশ মিনিটে দশ মিনিট ধরে শিলাবৃষ্টি হবে। এই আকাশ সে কথা বলছে।

শুভ্র তার কথা ক্লাশ ডায়েরিতে টুকে রাখল এবং পরের বছর ১৩ই চৈত্র পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করল। ১৩ই চৈত্র শিলাবৃষ্টি আর হয় না, কিন্তু তাকে অবাক করে ১৫ই চৈত্র বিকেল চারটা সাতচল্লিশ মিনিটে শিলাবৃষ্টি আরম্ভ হলো এবং তা দশ মিনিট পর্যন্ত প্রবল প্রতাপে টিনের ছাদে তার অস্তিত্ব বজায় রাখল।  

        শুভ্র আরো বড় হয়ে যখন এই অবারিত আকাশ নামক এক বস্তুর মাঝে অবস্তুক ব্যাপারগুলোর ভাবনায় মগ্ন হয়েছে এবং দাদার লেখা অনেক পাণ্ডুলিপি খুঁজে পেয়েছে তখন তার বোধগম্য হলো যে, তার দাদা আসলে সারাবছরের আবহাওয়ার খতিয়ান তৈরি করতেন চৈত্রের আকাশ নিরীক্ষণ করে । প্রতি আড়াই ঘন্টায় তিনি আগামি বছরের এক সপ্তাহ এবং আড়াই দিনে সমগ্র মাসের চিত্র পেতেন । তিনি শুভ্রকে সবসময় একটা কথা বলতেন,


       আগামিকে গোনার জন্য বর্তমান আর অতীতকে নিবিড়ভাবে জানাটা জরুরী। অতীতকে না জানলে স্বপ্নের বুঁনন ঠিক হয় না । বলে তিনি শুভ্রকে দ্রোন ফুল থেকে প্রতিটি বৃক্ষলতাকে চেনানোর জন্য এক একটা গল্প ফেঁদে বসলেন। সাথে তিনি তাকে সেগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম এবং ঔষধি গুণাগুণ শেখানোর চেষ্টা করলেন। শুভ্র তারুণ্যের সংজ্ঞাটুকু কৈশোরেই তার দাদার কাছ থেকে শিখে গেল। বস্তুত গভীর মমতায় এই বৃক্ষ-লতাদি আর প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলোর মাঝে মগ্ন হতে ভালোবাসতেন বলেই তিনি ছিলেন চিরতরুণ। তার কারণেই শুভ্র বুঝতে শিখল যে, মগ্নতা ছাড়া ভালবাসা হয় না । আর বুড়িয়ে যাওয়া মানেই ভালোবাসাহীনতা নয় বরং মগè হতে না জানলেই মানুষ বুড়িয়ে যায় ।  


     তারপর তিনি শুভ্রকে ভারতবর্ষে মানুষের গমনাগমন বা অভিপ্রয়ান সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রিন্স ফিলিপ কর্তৃক মাসিডোনিয়া আক্রান্তের পর কীভাবে গ্রিসের মানুষজন সাগর পেরিয়ে প্রথমে তুরস্ক এবং পরে ইরানের ভূমি হয়ে পরিশেষে এই ভারতবর্ষে আগমন করেছিলেন গল্পচ্ছলে তা বলেছিলেন বলেই হয়তো শুভ্র আরো পেছনের ২৫টি বছর আগে যখন ভারতবর্ষের এই ভূমি দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকার সাথে একত্রে পাঞ্জিয়া মহাদেশ নামে ৬৪০০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত ছিল তার ইতিহাস খুঁজতে গিয়েছিল । এসব করতে গিয়ে সবসময় দাদা নওফেলের কথা তার খুব মনে পড়ত,


       তুমি অতীতকে ভালোভাবে না জেনে ভবিষ্যতকে সহজে দেখতে পাবে না । সুতরাং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা বলো, স্বপ্ন দেখা বলো...কোনো কিছুর সঠিক মাত্রা সম্পর্কে তুমি জ্ঞানসম্পন্ন হয়ে উঠবে না যদি তুমি তোমার অতীত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না রাখো। 

        প্রকৃতপক্ষে শুভ্র হয়ে উঠেছিল তার নিত্যসঙ্গী এক বন্ধু। বড় হয়ে শুভ্রর মনে হতো, তার দাদা নওফেল তার জীবন থেকে পুরো সময়টুকু শুধু দান করেই যাননি ববং তিনি সবকিছুর দিকে নতুন করে তাকানোর জন্য খুলে দিয়ে গেছেন ভেতরের চোখ আর অবারিতভাবে ওড়াউড়ি শেখার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়ে গিয়েছেন শুভ্রর দুই ডানাকে।   

      জীবনের শেষ দিনগুলোতে তার দাদা কাগজ কলম নিয়ে মেতে উঠেছিলেন। লিখলেন তার স্মৃতিকথা আর জীবন দর্শন। লাঙলের ফলা কতটুকু বেশি ভোঁতা হলে কাঁধে জোয়াল বহন করা গরুর জন্য তা কষ্টের কারণ হবে তার সমীকরণ লিখে রাখলেন। গরুর বদলে কোনো একটি যন্ত্রের মাধ্যমে লাঙল টানার ভাবনাও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। সম্ভাব্য যন্ত্রের নিচে অনেকগুলো কাঁচিসম্বলিত একটা নকশা আঁকতে তিনি ভোলেননি। তার মৃত্যুর অনেক বছর পর শুভ্র তার দাদার হাতে লেখা এবং আঁকা দেখে বুঝেছিল কেন তার দাদা ব্রিটিশ কোর্টে মুহুরির দায়িত্ব থেকে অবসর গ্রহণের পর লাঙলের ফলা ধারালো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। গরু নামক প্রাণীর যন্ত্রণা দেখে তিনি এত ব্যথিত ছিলেন যে, তা লাঘবের একটা পথ তিনি মরিয়া হয়ে খুঁজতে চেয়েছিলেন। 

       শুভ্র তার সেইসব পাণ্ডুলিপির একটাতে তার দাদার ভেজষ ঔষধ আবিস্কারের উন্মাদনা সংক্রান্ত তথ্য পেল। তিনি কোন অসুখে কোন গাছ-গাছড়ার কতটুকু অনুপাত মিশিয়ে ঔষধ তৈরি করতে হয় তা নথিভূক্ত করে রেখেছেন। পাণ্ডুলিপির এই অংশ পড়তে গিয়ে শুভ্র জানল, সন্তান জন্মদানের সময় গর্ভবতী এক নারীর মৃত্যু তার দাদাকে এত আবেগতাড়িত এবং ব্যথিত করেছিল যে, তিনি সন্তান-সম্ভাবা নারীর ব্যথামুক্ত প্রসব নিশ্চিত করার  লক্ষে এইসব আবিস্কারের নেশায় মগ্ন হয়েছিলেন। অতঃপর তার ওষুধে যেদিন থেকে গ্রামের অনেক নারীর প্রসব বেদনা অনেকটাই উপশম হয়েছে বলে জনশ্র“তি রটল ততদিনে তিনি আত্মবিশ্বাসী এক ডাক্তার হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তার ওষুধেও যেদিন আরো এক সন্তান সম্ভাবা নারীর প্রসবকালীন মৃত্যু থামানো গেল না তারপর থেকে গাছ গাছড়া থেকে ওষুধ আবিস্কারের গবেষণা তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন।  


অনেক অনেক বছর পর শুভ্র জানতে পারল যে, ত্রিমোহিনীতে বেদেনির দলের দেয়া কৃমির ওষুধ খেয়ে শুভ্রর অসুস্থ হওয়ার পর তাকে সুস্থ করতে পুনরায় সেই ওষুধ তৈরির নিমগ্নতায় ডুবে গিয়ে কী ভূলটাই না করেছিলেন! ম্যাগনোলিয়া আর পদ্ম পাপড়ির সাদা অংশ দিয়ে তৈরি সেই ভেষজ শুভ্রকে খাওয়ানোর পর তার শরীরের ত্বক কেমন কালো হয়ে গিয়ে তাকে হতাশার শেষ প্রান্তেই শুধু নিল না বরং শুভ্রর পেটে জেগে ওঠা এক টিউমার তাকে দারুণ মলিন এবং বিষন্ন করে তুলল। তার দাদা লিখেছেন, তিনি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না কারণ তার তৈরি ওষুধে শুভ্রর শরীরে এত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়েছে যে তার শারিরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। 


এর বেশ কিছুদিন পর এক এপ্রিলে নওফেল শুভ্রর মা শশীর শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার ভাই যিনি শুভ্রর একমাত্র মামা, তাকে ডেকে আনলেন এবং শুভ্রকে দেখাশোনার দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলেন। শুভ্রর নিঃসন্তান মামা তাকে জানালেন যে, শুভ্রকে নিজের সন্তানের মতো করে পেলে তিনি খুশিই হবেন কারণ ভবিষ্যতে তাদের সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ । নওফেল তৃপ্ত কন্ঠে বললেন,

তাহলে আমি এই বাড়িটা তোমাকে লিখে দিচ্ছি। শুভ্রকে তুমি  সন্তানসম জানলে আমার শশী মা’র আত্মা বড় তৃপ্ত হবে। 

এই বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। শুভ্র যখন তার কাছে এলো তখন তিনি তার মামাকে বললেন,

আমার আয়ু আছে আর ছয়মাস। আগামি সেপ্টেম্বরে আমি চলে যাব। 


      এই বলে তিনি ট্রাঙ্ক থেকে তার একমাত্র প্রিয় শালটি বের করতে বললেন এবং আগামি শীতে শালটির উষ্ণতা তিনি আর নিতে পারবেন না বলে গরমের মধ্যেই সেই শাল গায়ে জড়িয়ে তিনি যখন এমনকি বাজারও করতে লাগলেন, তখন গ্রামের মানুষ তার মাথা নষ্ট হয়েছে বলে হাসাহাসি আরম্ভ করল। এরপর তিনি তার কবর নিজ হাতে খুড়লেন, বাঁশ কেটে কবরের মাপমতো সেগুলো যখন প্রস্তুত করছেন সবাই তখন তাকে এক ঘোরতর পাগল আখ্যায় আখ্যায়িত করে হাসাহাসি বন্ধ করে ফিসফিস গলায় ভয় পাওয়া ভংগিতে তাকে নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত তারই মাঝে এক সন্ধ্যায় তিনি শুভ্রকে বললেন, 

এইরকম মোহনীয় সাঝ দেখার সৌভাগ্য তার জীবনে আর বেশি হবে না । সবাইকে হতভম্ব করে তিনি মারা গেলেন ১৯৫৮ সালের ০৮ই সেপ্টেম্বর সোমবার ভোর রাতে, তার মৃত্যু নিয়ে প্রথম ভবিষ্যদ্বাণির ঠিক ছয় মাস পর....  

তার দাদা নওফেল শয্যাশয়ী অবস্থায়, মৃত্যুর আগে এক শনশন হাওয়ার পূর্বাহ্নে তাকে কাছে ডেকে বললেন,

খোকা, আমার সব জমি আর সম্পদ তোমার নামে লিখে দিয়েছি। তবে কিছু সম্পদ তোমার মামাকে দিয়েছি এই শর্তে যে, তিনি তোমার দেখাশোনা এবং শিক্ষার সু-ব্যবস্থা জারি রাখবেন। তিনি মায়াভরে শুভ্রর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, 

তুমি কি জানো মৃত্যু কেমন?

শুভ্র ভীতু চোখে সবিষ্ময়ে তার দিকে তাকাতেই তিনি হেসে বললেন, 


মৃত্যু এক মাথা ন্যাড়া করা নারী। ঐ যে ঘরের ছাদের কোণে আমাকে নিতে এসে সে চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর তার পেছনে যেন হাজার আয়নায় প্রতিসরিত তার বিভিন্ন বয়সের ছবি বিস্তৃত হয়ে আছে কয়েকশ মাইল ধরে।


ওরা একের পর এক প্রজন্মকে এভাবেই পৃথিবী থেকে নিয়ে যাবে। সবার সামনেরজন আমাকে, তোমার বয়সী তার যে প্রতিবিম্ব সে তোমার প্রজন্মকে নিয়ে যাবে। কিন্তু তার হাতে ধরা আয়নাগুলোতে আমার পুরো শৈশব দেখতে পাচ্ছি বলে বড় খারাপ লাগছে বাবা । শুধু মনে হচ্ছে, আমি সেদিনের এক শিশু অথচ আমার চলে যাবার সময় হলো! তবে, স্রষ্টা মানুষকে সবচেয়ে বড় যে "বর’ দিয়েছেন তা কী, জানো? তা হলো, মানুষের ভাবনাগুলোকে তিনি প্রজন্ম-পরস্পরায় রেখে দেন। ওরা আমার আত্মাকে নিয়ে গেলেও আমার ভাবনারা তোমার সাথে বাস করবে। তুমি সোমবার সকালে কোথাও যেও না। আমি সেদিনই চলে যাব।


সোমবার ভোর হওয়ার আগে অন্ধকার থাকতে থাকতে শুভ্রর ঘুম ভেঙে গেল। দ্রুত উঠে সে তার দাদার পাশে গিয়ে বসলে তিনি খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন,

তোমার জন্য অপেক্ষা করছি বাবা। কষ্ট করে ইশারায় ফজরের নামাজ পড়েছি। এখন কালেমা পড়ে আমার বুকে ফুঁ দাও।

শুভ্রর ভেতর অভিমানে ফুঁসে উঠল। পৃথিবীতে একমাত্র আপনজনকে সে হারাতে চায় না। সে তার দাদাকে আকুল হয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। কিন্তু তার দাদা তখন কান্না করার মত শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলে ভেতরের আবেগে ঘামতে থাকলেন। তার কপালে আঠালো ঘাম জমল। কপালের আঠালো ঘাম! মৃত্যুর আগে সেই জ্ঞানী মানুষের কপালে এমন আঠালো ঘাম জমে, স্রষ্টা যাকে বড় ভালোবাসেন!   

শুভ্রকে "তুই’ সম্বোধন করে তার দাদা শেষ বাক্যটায় শুভ্রর জন্য উচ্চারণ করলেন,

আ-মি তোর মা-ঝে বেঁচে থা-ক-ব বাবা। তোর স্মৃতিম-য়-তায়।


পরবর্তী জীবনে শুভ্রর সবসময় মনে হয়েছে তার জন্ম তার দাদা নওফেলের সাথে ইংরেজি ১৮৯২ সালের এক বাংলা আষাঢ় মাসে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ঊনত্রিশ সালের ভয়াবহ বন্যা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতভাগ এবং পরিশেষে ভাষা আন্দোলন যেন ঘটে গিয়েছে তার চোখের সামনে। তিনি আসলে শুভ্রর অনুভবে এসব ভাবনায় দৃশ্যকল্প ঢুকিয়ে বিস্তৃত করে দিয়েছেন তার জীবন আর দর্শনকে।


মা আর দাদাকে হারানোর পর থেকে যতবার জীবনের আস্তিত্বহীনতার কথা মনে হয়েছে ততবার তার হৃদয় শূণ্য হয়ে এসেছে। কিন্তু কোন অলক্ষ্য থেকে দাদা যেন তাকে এখনো ফিসফিস করে বলেন, 


ফুরিয়ে যাওয়া মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়। বুড়িয়ে যাওয়া মানে নিমগ্নহীনতা অথবা ভালোবাসাহীনতা নয়। সব হারিয়ে যায় এবং ফুরিয়ে যায় আত্মবিস্মৃতিতে। আর কোনো কিছুতে মগ্ন হতে না পারলেই মানুষ আসলে বুড়িয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়। খোকা, আমি আছি, তোমার আত্মার সারথী হয়ে।


সেপ্টেম্বরের বৃষ্টি শুরু হয়েছে । শুভ্র বুঝল, আজ এক মহান আত্মা সমাধিস্ত হয়েছেন। আকাশে মৃত সব আত্মারা তার জন্য গাইছে কোনো এক বন্দনাগীতি। প্রকৃতি তার জন্য অঝোর ধারায় কাঁদছে। বৃষ্টির সেই আকুল ধারা প্লাবিত করে চলছে সেই মহান আত্মার মননে গড়া শুভ্র নামের এক কিশোরের সমগ্র সত্তায়।



ঢাকা/আরএস

sidebar ad