স্লিক বান থেকে মেসি হেয়ার: সৌন্দর্যের সংজ্ঞায় বড় বদল

প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একসময় সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটা যেন খুব সহজ ছিল; চুল শক্ত করে পিছনে বাঁধা, একটি গোছাও এদিক-ওদিক নয়; স্বচ্ছ ত্বক, ঠোঁটে হালকা গ্লস, গালে মৃদু ব্লাশের আভা আর মুখে এমন এক ‘নো-মেকআপ মেকআপ’ লুক, দেখে মনে হবে কিছুই করা হয়নি! আয়নার সামনে ঘণ্টাখানেক প্রস্তুতি নিয়েও এর শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য থাকে, দেখতে যেন হবে একদম এফোর্টলেস।


নিখুঁত আঁটসাঁট বা স্লিক বান, উজ্জ্বল ত্বক, ন্যুড লিপস, গোল্ড হুপস; এই ছিল সেই বহুলচর্চিত 'ক্লিন গার্ল বিউটি'র চেনা ছবি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে রানওয়ে, সবখানেই ছিল এই লুকের ছড়াছড়ি। কিন্তু সৌন্দর্যের সেই নিখুঁত আয়নায় এখন যেন একটু আঁচড় পড়েছে।



চুল আর সবসময় আঁটসাঁট করে বাঁধা নয়, বরং একটু এলোমেলো। স্মাজড আইলাইনার, ঠোঁটে ন্যুড গ্লসের বদলে জায়গা করে নিচ্ছে গাঢ় রঙ এবং এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুটা ‘অসম্পূর্ণ’ দেখানোর প্রবণতা; এইসবই হয়ে উঠছে নতুন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। যেন বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলে যাচ্ছে। ‘ক্লিন গার্ল অ্যাসথেটিক’-এর বিপরীতে উঠে আসছে ‘মেসি গার্ল’, ‘গ্রাঞ্জ’ বা ‘অ্যান্টি-পারফেকশন’ ধারা।

আরোও পড়ুন: মুখে কাপ লাগিয়ে সৌন্দর্যচর্চা! ফেস কাপিং-এর রহস্য কী?


তাহলে ক্লিন গার্ল- এর দিন কি ফুরোল?

হয়তো নয়;  বরং তার একচ্ছত্র আধিপত্য শেষ হয়ে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা আবার বেশি এক্সপ্রেসিভ, প্লেফুল এবং কিছুটা অবিন্যস্ত হওয়ার দিকে ফিরছে। কিন্তু কেন এই পরিবর্তন? শুধু কি ট্রেন্ড বদল, নাকি এর পেছনে আছে গভীরতর কিছু?


সাহসী সৌন্দর্য ফিরে এসেছে-


গত কয়েক বছর ধরে সৌন্দর্যজগতে নিঃসন্দেহে আধিপত্য বিস্তার করেছে একটি নির্দিষ্ট লুক। সংযত, পরিপাটি আর স্বাভাবিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে ওঠা ‘ক্লিন গার্ল’ নান্দনিকতা যেন হয়ে উঠেছিল সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞা। তবে এবার সেই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা লুক কিছুটা প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়েছে।


তার জায়গা করে নিতে শুরু করেছে প্রাণবন্ত রং, সাহসী মেকআপ এবং নির্ভীকভাবে নিজস্ব স্টাইল প্রকাশের প্রবণতা। সবকিছু নিখুঁত ও মিনিমাল রাখার বদলে সৌন্দর্য এখন যেন একটু বেশি খেলাচ্ছলে, একটু বেশি প্রাণবন্ত এবং অনেক বেশি ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে।


তাই বলাই যায়, এ বছর সৌন্দর্যের মঞ্চে রাজত্ব করতে চলেছে বোল্ড বিউটি।


“আমার মনে হয়, মেকআপ নিয়ে আবারও একটু ‘মজা’ করার সময় ফিরে এসেছে,” বলছেন মিয়ামির মেকআপ আর্টিস্ট ন্যাটালি ড্রেসার। তিনি আরো যোগ করেন, “রঙের ছোঁয়া, মেটালিক, শিমার, বোল্ড আইজসবকিছুই আবার ফিরে আসবে।”


তাঁর এই পূর্বাভাস যে একেবারে অমূলক নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছে পিন্টারেস্ট-এর ট্রেন্ড ডেটাতেও। ২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত বিউটি ট্রেন্ড এর কথা বলতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছিল, ‘ফুল কালার মেকআপ আইজ’ লিখে সার্চের হার বেড়েছে ৩৬৫ শতাংশ।


সংখ্যাটা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং বদলে যাওয়া সৌন্দর্য-রুচির একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। কারণ এতদিনের বহুলচর্চিত ‘ক্লিন গার্ল লুক’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চোখে মেকআপের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বা নিউট্রাল টোন, সেখানে নতুন সৌন্দর্যের ধারা যেন তার ঠিক বিপরীতে অবস্থান করে এই বার্তাই দিচ্ছে- মেকআপ শুধু নিজেকে পরিপাটি দেখানোর জন্য নয়, আনন্দ করারও একটি মাধ্যম।


২০২৬ সালের বিউটি ট্রেন্ড গুলোও এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ও বিউটি ম্যাগাজিন এলি (Elle)- এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ‘ক্লিন গার্ল এস্থেটিক' -এর বিপরীতে উঠে এসেছে আরও ড্রামাটিক ও এক্সপ্রেসিভ বিউটিস্মাজড লাইনার, বোল্ড কালার, অবিন্যস্ত চুল এবং এমন মেকআপ, যা নিখুঁত হওয়ার চেয়ে ব্যক্তিত্ব প্রকাশকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই নতুন লুক-কে তারা ‘ড্রামা কুইন এস্থেটিক'  হিসেবেও বর্ণনা করেছে।


ভোগ (Vogue)- ও ২০২৬ সালের মেকআপ ট্রেন্ড নিয়ে একই ধরনের পরিবর্তনের কথা বলছে। তাদের ভাষায়, বিউটি এখন মিনিমালিস্ট থেকে আরও বেশি এক্সপ্রেশনাল, ম্যাক্সিমালিস্ট এবং 'আন্ডান' বা লিভড-ইন (Undone / Lived-in) এর দিকে যাচ্ছে। মানুষ এখন নিজের মুখকে ক্যানভাসের মতো ব্যবহার করে মেকআপ নিয়ে নতুন করে আনন্দ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চাইছে।


অর্থাৎ সৌন্দর্যের নতুন মন্ত্র তাহলে নিখুঁত সৌন্দর্য নয়, বরং নিজের ব্যক্তিত্ব ও সৃজনশীলতা ফুটিয়ে তোলা।


নিখুঁততার বাঁধন ভেঙে কেন এই নতুন সৌন্দর্যবোধ?


২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে ক্লিন গার্ল ট্রেন্ড জনপ্রিয়তা পায়। নিখুঁত ত্বক, ঝরঝরে চুল, মিনিমাল মেকআপসব মিলিয়ে তার সরলতা এবং সৌন্দর্যের প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেকের কাছেই সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সমালোচনার মুখে পড়ে।


অনেকে বলতে শুরু করেন, এই সৌন্দর্য আদর্শ আসলে অনেকের জন্য রিচ নয়। নামে যদিও একে এফোর্টলেস বিউটি বলা হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিখুঁত ত্বকের জন্য ব্যয়বহুল স্কিনকেয়ার, সেলুন-নির্ভর চুল, ব্যয়বহুল পোশাকসব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠেছিল একধরনের ‘প্রিভিলেজড বিউটি।


পাশাপাশি, এই ট্রেন্ডে বৈচিত্র্যের অভাব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একই হেয়ার স্টাইল, গ্লসি লিপস, চকচকে ত্বক, নিউট্রাল কালার; স্বাভাবিক দেখানোর চক্করে সবকিছু মিলে যেন একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ তৈরি হয়ে গেল। এর ফলে ফ্যাশন দুনিয়া তার বৈচিত্র্য ও মজাদার পথটা হারিয়ে ফেলছিল। বৈচিত্র্যের অভাবে একঘেয়েমি চলে আসে। মানুষ এখন ট্রেন্ডের ঊর্ধ্বে উঠে এমন লুক গ্রহণ করতে চায় যা তাদের অনন্য ব্যক্তিত্বকে প্রতিফলিত করে। 

আরোও পড়ুন: রূপচর্চার একাল-সেকাল: হারিয়েযাচ্ছে কী মুলতানি মাটির কদর?


ক্লিন গার্ল এস্থেটিক  শুধু একটি মেকআপ ট্রেন্ড ছিল না; এটি যেন একটি এস্থেটিক লাইফস্টাইলে পরিণত হয়ে উঠেছিল। সবকিছুর মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট পারফেকশন এর ছাপ ছিল। আর সম্ভবত এখানেই শুরু হয়েছে পরিবর্তন।


নতুন প্রজন্মের বিউটি মুড যেন বলছে সবসময় পরিপাটি দেখাতে হবে কেন?


চুল একটু এলোমেলো হতে পারে। লাইনার একটু ছড়িয়ে যেতে পারে। শুধু দাগহীন ত্বকই নয়নিজের ত্বকের যে টেক্সচার তা দেখা যেতেই পারে। আর মেকআপ এর কাজ শুধু মুখকে সুন্দর করে তোলা নয় বরং ব্যক্তিত্ব প্রকাশ করাও হতে পারে।


চোখে রঙ, ঠোঁটে সাহস; বদলে যাচ্ছে মেকআপের ভাষা-


একসময় আইলাইনার সামান্য ছড়িয়ে গেলেই সেটি মুছে আবার আঁকতে হতো। এখন সেই স্মাজড লাইনারই হতে পারে পুরো লুক এর আকর্ষণ।


২০২৬ সালের চোখ ও ঠোঁটের রঙের ট্রেন্ডে কঠোর মিনিমালিস্ট নিউট্রাল রঙ থেকে সরে এসে অভিব্যক্তিপূর্ণ, রঙিন শৈল্পিকতার দিকে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। চোখে ব্লু আইশ্যাডো, ডিফিউজড কালার এবং স্মাজড লাইনার-এর মতো লুক উঠে এসেছে।


একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে লিপস্টিক- এও। ২০২৬ সালে মিনিমালিস্ট বা ছিমছাম 'ক্লিন গার্ল' নান্দনিকতার চল কমে আসছে এবং ন্যুড লিপসের পরিবর্তে জায়গা পাচ্ছে বোল্ড রঙ এর।


নিখুঁত লিপলাইনের চেয়ে ব্লারড এবং কিছুটা মেসি ঠোঁটের সাজ (messy lips) ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই ট্রেন্ডটিকে সাজগোজের দুনিয়ায় মূলত "ব্লটেড লিপস" বা "সফট ফোকাস লিপস" বলা হয়ে থাকে। ফরাসি নারীদের চিরচেনা সেই অবিন্যস্ত অথচ আকর্ষণীয় মেকআপ লুক (effortless French-girl chic) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ট্রেন্ডটি আবার মূলধারায় ফিরে এসেছে।


চুলও এবার একটু অগোছালো-


ক্লিন গার্ল এস্থেটিক -এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্লিকড ব্যাক বান। চুলের গোছা থাকবে একদম পরিপাটি, যেন নিজের জায়গা থেকে নড়বে না।


কিন্তু এখন হেয়ার ট্রেন্ড-এ দেখা যাচ্ছে তার বিপরীত অবস্থা। বর্তমানে এখন সেই পরিপাটি বা একদম নিখুঁত (sleek and perfect) লুকের চেয়ে কিছুটা এলোমেলো, স্বাভাবিক টেক্সচার- ফ্লাফি ভলিউম,  মেসি ওয়েভসলুক প্রাধান্য পাচ্ছে। একে ফ্যাশনের ভাষায় প্রায়ই 'এফোর্টলেস' বা 'আনডান' লুক বলা হয়।


প্যারিস ফ্যাশন উইকের মঞ্চে যখন ডিওর (Dior)-এর Fall/Winter 2026 কালেকশন প্রদর্শিত হলো, তখন শুধু পোশাক নয়, নজর কাড়ল মডেলদের চুল আর মেকআপ। ঝরঝরে চটকদার বান নয়, বরং সামান্য অগোছালো চুল এবং মেকআপের আবছা আভাসে সেজে উঠেছিল তারা।


ডিওর মেকআপ- এর ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড ইমেজ ডিরেক্টর পিটার ফিলিপস এর মতে, “সামান্য মেসি হেয়ার আর মেসি মেকআপএই দুয়ের মিলেই তৈরি হয় এফোর্টলেস কুলনেস, যেটা আসলে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী একটি স্টেটমেন্ট।”


তাহলে ক্লিন গার্ল কি সত্যিই শেষ?


না, পুরোপুরি নয়।


ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রেন্ড হিসেবে টিকটকে বা ইনস্টাগ্রামে এটার হাইপ কমে গেলেও স্কিনকেয়ার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এর মূল ধারণাটি টিকে থাকবে।


তবে, এটা বলা যায় যে, একে এখন আর সৌন্দর্যের একমাত্র সংজ্ঞা হিসেবে অভিহিত করা যায় না। এর সেই কঠোর "নিখুঁত দেখানোর" রাজত্ব শেষ, এখন নিজের মতো করে একটু অগোছালো ও আত্মবিশ্বাসী থাকার দিন।


আজ কেউ স্লিক বান করতে পারেন তো কাল চুল ছেড়ে মেসি ওয়েভস রাখতে পারেন। সকালে ন্যুড লিপ তো রাতে গ্লিটারি আইজ। একদিন নো মেকআপ লুক তো অন্যদিন বোল্ড ব্লাশ আর স্মাজড লাইনার। হয়তো এ কারণেই ২০২৬ এর বিউটি ওয়ার্ল্ড-এ 'ব্লার', ‘স্মাজড', ‘মেসি’, ‘প্লেফুল’ আর ‘বোল্ড’ শব্দগুলো এত ঘুরে ফিরে আসছে।


আর এই পরিবর্তনের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হয়তো এখানেই


সৌন্দর্য এখন আর আমাদের বলে দিচ্ছে না, কীভাবে সুন্দর হতে হবে। বরং সে বলছে, তোমার সৌন্দর্যটা তোমার মতোই হোক। কারন, নিখুঁত হওয়ার চেয়ে, নিজের মতো হওয়াই বেশি সুন্দর।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad