সৌন্দর্য ধরে রাখতে মানুষ কত কিছুই না করে! কেউ দামি ক্রিমের স্তর মাখেন তো, কেউবা ১০ স্তরের স্কিনকেয়ারে সময় দেন, আবার কেউবা ত্বকের যত্নে ভরসা রাখেন প্রাচীন কোনো পদ্ধতিতে। কারণ সবকিছুর মূলেই থাকে, আয়নায় নিজের মুখটাকে একটু বেশি উজ্জ্বল, সতেজ আর তরুণ দেখতে চাওয়া।
সৌন্দর্যচর্চার জগতে
নতুন কোনো ট্রেন্ড এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে তার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে
পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না। কখনো রোলার সদৃশ জেড স্টোন রোলার তো কখনো চ্যাপ্টা
আকৃতির গুয়া শা, আর এখন সেই তালিকায় বেশ আলোচিত নাম ফেস কাপিং। মুখের ত্বকে ছোট
ছোট সিলিকন বা কাপের মতো যন্ত্র বসিয়ে হালকা সাকশন তৈরি করে ম্যাসাজ করার এই
পদ্ধতি দেখতে যেমন অদ্ভুত, তেমনি এর পক্ষে দাবিও কম চমকপ্রদ নয়।
ফেস কাপিং সত্যিই
ত্বকের জন্য উপকারী, নাকি এর জনপ্রিয়তার পেছনে কাজ করছে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার
হাইপ?
চলুন, কাপের আড়ালে থাকা
সত্যিটা একটু খুঁজে দেখা যাক।
ফেস কাপিং কি?
ফেস কাপিং মূলত কাপিং
থেরাপি- এর একটি মৃদু ও ক্ষুদ্র সংস্করণ। এতে তুলনামূলক ছোট কাপ ব্যবহার করে মুখের
ত্বকে হালকা ভ্যাকুয়াম বা সাকশন তৈরি করা হয়। এরপর কাপটি সাধারণত ত্বকের ওপর ধীরে
ধীরে সরানো হয়।
ফেস কাপিং আধুনিক
স্কিনকেয়ারে বেশ জনপ্রিয় হলেও, এটি মোটেও নতুন কিছু নয়। এর উৎস ঐতিহ্যবাহী চীনা
চিকিৎসাবিদ্যায় এবং এর ব্যবহার প্রাচীন মিশর, ম্যাসিডোনিয়া ও গ্রিসেও পাওয়া
যায়।
এই কৌশলটি নিরাময় ও সৌন্দর্যচর্চা
উভয় ক্ষেত্রেই শোষণের মাধ্যমে শক্তি শোষণ করার মাধ্যমে কাজ করে থাকে।
বডি কাপিং- এর মতো
দীর্ঘ সময় একই জায়গায় কাপ আটকে রাখার পরিবর্তে ফেস কাপিং- এ সাধারণত হালকা সাকশন
এবং মুভমেন্ট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত ফেস ম্যাসেজ এর একটি পদ্ধতি হিসেবেই
ব্যবহৃত হয়।
আরোও পড়ুন: রূপচর্চার একাল-সেকাল: হারিয়েযাচ্ছে কী মুলতানি মাটির কদর?
কীভাবে কাজ করে?
ফেস কাপিং- এর সাকশন
ত্বকের ওপর সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে পারে। কাপ টেনে নিচ থেকে উপরে সরানোর সময়
হালকা ম্যাসাজের মতো প্রভাবও তৈরি হয়। এ কারণে ব্যবহারের পর মুখ কিছুটা সতেজ,
উজ্জ্বল বা প্লাম্প দেখাতে পারে।
এছাড়া হালকা লসিকা
নিষ্কাশন, যা চোখ ও চোয়ালের চারপাশের ফোলাভাব কমাতে পারে। এটি বিশেষ করে চোয়ালের
অংশের শক্ত হয়ে থাকা পেশী শিথিল করতেও সাহায্য করতে পারে।
সঠিকভাবে ও মৃদুভাবে
ব্যবহার করলে ফেস কাপিং একটি রিলাক্সিং ম্যাসেজ টেকনিক হিসেবে উপভোগ্য হতে পারে। তবে এটিকে ব্রণ,
বলিরেখা, পিগমেন্টেশন এবং ঝুলে যাওয়া ত্বক- এর চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
ঘরে বসে ফেস কাপিং
রুটিন-
দ্য এজলেস ক্লিনিকের মেডিকেল হেড এবং সেলিব্রিটি স্কিন এক্সপার্ট ডাঃ হর্ষনা বিজলানি জানাচ্ছেন, কীভাবে এটি নিরাপদে এবং কার্যকরভাবে করা যায়।
প্রথমত, সঠিক কাপ সাইজ
বেছে নিন-
মুখের মাপ অনুযায়ী
তৈরি ছোট সিলিকন কাপ ব্যবহার করুন। কম ব্যাসের কাপ ছোট মুখের জন্য বেশি উপযুক্ত;
চওড়া মুখের জন্য কিছুটা বড় কাপের প্রয়োজন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ত্বক
পরিষ্কার করুন-
সবসময় পরিষ্কার ত্বক
দিয়ে শুরু করুন। এতে ত্বকে কোনো ময়লা বা ব্যাকটেরিয়া থাকে না, যা ব্রণের কারণ
হতে পারে।
তৃতীয়ত, সিরাম বা
ফেসিয়াল অয়েল লাগান-
হালকা ফেসিয়াল অয়েল,
সিরাম বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। এটি কাপটিকে ত্বকের উপর সহজে চলাচল করতে
সাহায্য করে। শুষ্ক ত্বকে কখনও কাপ ব্যবহার করবেন না। কাপটি এক জায়গায় বেশিক্ষণ
আটকে থাকলে কালশিটে পড়তে পারে।
চতুর্থত, মসৃণভাবে চলতে শুরু করুন-
কাপটি আলতো করে চেপে
ত্বকের উপর রাখুন যাতে সাকশন তৈরি হয়, এবং বাইরের দিকে টেনে নিয়ে যান। সবসময়
মুখের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে, লিম্ফ নোডগুলোর দিকে যান।
নাক থেকে কান পর্যন্ত,
চিবুক থেকে কানের লতি পর্যন্ত, কপালের কেন্দ্র থেকে উপরের দিকে এবং বাইরের দিকে,
চোখের নিচে খুব আলতোভাবে, ভেতরের কোণ থেকে বাইরের কোণ পর্যন্ত সাকশন করুন। ব্যথা,
তীব্র টান, অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া হলে সঙ্গে সঙ্গে থামুন।
সপ্তাহে ২-৩ বার, প্রায়
৫-১০ মিনিট সময় দিন। কাপ একই জায়গায় দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখবেন না। বিশেষ করে চোখের
আশপাশের মতো নাজুক এলাকায় অতিরিক্ত চাপ এড়িয়ে চলা উচিত।
ফেসে হালকা লালচে ভাব
কিছু সময়ের জন্য দেখা দিতে পারে। কিন্তু যদি কালশিটে দাগ, ফোসকা, তীব্র ব্যথা দেখা
দেয়, তাহলে ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।
আরোও পড়ুন: রুপচর্চায় ফেসপ্যাক
মনে রাখতে হবে, দাগ
হয়েছে মানেই ট্রিটমেন্ট কাজ করছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশেষ করে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ব্যবহারের
আগে ও পরে কাপ ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। অন্য কারও সঙ্গে একই ফেসিয়াল কাপ শেয়ার না
করাই ভালো।
কারা এড়িয়ে চলবেন?
সবার জন্য এই পদ্ধতি
উপযোগী নয়। যাদের ত্বকে কোন ধরনের ইনফেকশন, ক্ষত, জ্বালাপোড়া বা সহজে কালশিটে
হওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এছাড়া ত্বকে কোনো
নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে বা নিয়মিত কোন ডার্মাটোলজিস্টের চিকিৎসাধীন থাকলে নিজে
থেকে এটা শুরু না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সৌন্দর্যের দুনিয়ায়
প্রতিদিনই নতুন নতুন ট্রেন্ড আসে। ফেস কাপিং-ও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি হয়তো একটি
ম্যাসেজ টুল হিসেবে উপভোগ করা যেতে পারে এবং ব্যবহারের পর ত্বক সাময়িকভাবে সতেজ বা
কম ফোলা দেখাতেও পারে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরঞ্জিত দাবিকে সত্য ধরে নিয়ে
এটিকে প্রাকৃতিক ভাবে ফেসলিফটিং বা সব ধরনের সমস্যার সমাধান ভাবার কোন কারণ নেই।
শেষ পর্যন্ত সুন্দর
ত্বকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হলো ভালো মানের একটি সানস্ক্রিন, ত্বকের ধরন
অনুযায়ী স্কিনকেয়ার, স্ট্রেস ফ্রি থাকা, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং প্রয়োজন হলে
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ।
ফেস কাপিং হতে পারে সেই
রুটিনের একটি ছোট অংশ, কিন্তু পুরো সৌন্দর্যচর্চার বিকল্প নয়।
ঢাকা/টিএ