টিকটকে বিউটি হ্যাক!! কতটা নিরাপদ??

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬

টিকটকে বিউটি হ্যাক!! কতটা নিরাপদ??

শায়লা জাহান


হুডেড আইজের জন্য উইংড লাইনার লাগানোর বিকল্প উপায় কিংবা কিভাবে লাইট সেট করলে একটি আকর্ষনীয় সেলফি পাওয়া যাবে এমন অনেক চমকপ্রদ সব ভিডিও আমরা মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করেই দেখতে পাই। ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতোই, টিকটকেও তথাকথিত হ্যাক ভিডিওগুলো দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রিয়, বিশেষ করে সৌন্দর্য সম্পর্কিত ভিডিওগুলো। কিন্তু স্কিন কেয়ারের প্রশ্নে কতটা নিরাপদ এইসব ভাইরাল হওয়া ভিডিও গুলো? 



অনলাইন ভিডিও প্ল্যাটফর্ম টিকটক ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী চালু হওয়ার পর থেকেই তা খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ২০০ কোটিরও বেশি বার ডাউনলোড হয় এটি। বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ এবং ফেসবুকের মতো অ্যাপ গুলোকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া নন-গেমিং অ্যাপ এই টিকটক। টিকটকের ভিডিও বিষয়বস্তুর পরিসর বেশ বৈচিত্র্যময়। সংগীত, ফিটনেস, সৌন্দর্য, শিক্ষা’র মতো জনপ্রিয় বিষয়বস্তু রয়েছে, যাতে সব ক্যাটাগরির দর্শক আগ্রহের সাথে মানিয়ে যায়। টিকটকে শেয়ার করা এমন অনেক টিপস ও ট্রিকস আছে যা বেশ কাজের হতে পারে, তবে এমন কিছু ট্রেন্ডও আছে যা ট্রাই না করার জন্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন। সেরকমই একটি ট্রেন্ড হলো বিভিন্ন ধরনের বিউটি হ্যাক। 



সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে টিকটক বিউটি হ্যাক এখন ট্রেন্ডের শীর্ষে। অনলাইনের এই যুগে বিউটি ইনফ্লুয়েন্সারদের অভাব নেই। ভিডিও ভাইরালের জন্যই হোক কিংবা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই হোক, তাদের একেকজন একেক রকম হ্যাক শেয়ার করেন। সাধারণ মানুষ অনেক সময় না বুঝেই এগুলো ট্রাই করে নিজেদের ত্বকের বড় ক্ষতি করে ফেলে। আজ আমরা এমন কিছু ভাইরাল হ্যাক নিয়ে জানবো যা ট্রাই না করার জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন। 



সানস্ক্রিন হ্যাক

লক্ষ লক্ষ ভিউ পাওয়া তথাকথিত সানস্ক্রিন হ্যাকটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই কৌশলটি হলো মুখের নির্দিষ্ট কিছু অংশে যেমন গালের হাড় এবং নাকের পাশে উঁচু জায়গাগুলোতে সানস্ক্রিন লাগানো হয়। এতে সানট্যান বা রোদে পোড়া ভাবের জন্য একটি ন্যাচারাল ফেস কন্টুর পাওয়া যায়। মূলত টিকটকের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীর বয়স ২৫ এর নিচে এবং ত্বকে রোদের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে বেশ কিছুটা সময় লাগে। তাই এই হ্যাকটি কেনো এতো বেশি জনপ্রিয় তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ডার্মাটোলজিস্ট জানায়, মুখের কিছু অংশ বাদ রেখে এভাবে সানস্ক্রিনের ব্যবহার কেবল নিজের ত্বককে ক্যানসারের ঝুঁকিতেই ফেলা হচ্ছে না, বরং সেই জায়গাগুলোতে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকেও ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। অল্প সময়ের জন্য কাজ করা এই ট্রেন্ডটি ক্যানসারের ঝুঁকি থেকে শুরু করে পিগমেন্টেশন, ফাইন লাইন, অনুজ্জ্বল ত্বক, বড় লোমকূপ সহ অনেক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা বৃদ্ধি করে। তাই না জেনে এতো বড় ঝুঁকি নেয়া কি সত্যিই যুক্তিযুক্ত? 

 


ঘরে তৈরি ফেস মাস্ক

রান্নাঘরের উপকরণ ব্যবহার করে ঘরে তৈরি ফেস ট্রিটমেন্টও বেশ জনপ্রিয়। ঘরে বসেই বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে ফেস মাস্ক তৈরি করায় কোন সমস্যা নেই, কিন্তু বিপত্তি বাঁধে তখনই যখন এর সাথে যেকোন সাইট্রাস ফলের রস মেশানো হয়। এই ফলের রসগুলোতে সাইট্রিক এসিড থাকে এবং এর পিএইচ মাত্রা আমাদের পাকস্থলীর পিএইচ এর মতোই। অর্থাৎ এই রস পাকস্থলীর অ্যাসিডের মতোই অম্লীয়। ত্বকের স্বাভাবিক পিএইচ ৪.৭ থেকে ৫.৭ এর মধ্যে থাকে। যেখানে সাইট্রাস ফলের রসের পিএইচ প্রায় ২। তাই এগুলো ত্বকে লাগালে ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট হয় এবং এমন সব জিনিস প্রবেশ করতে দেয় যা মোটেও কাম্য নয়। যেমন ব্রণ সৃষ্টিকারী কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটেরিয়া। এছাড়াও ত্বকে সাইট্রাস ফল লাগিয়ে রোদে যাওয়াও ঠিক নয়। এর ফলে ফাইটোফোটোডার্মাটাইটিস হতে পারে। এসব সাইট্রাস ফলে থাকা একটি রাসায়নিক সূর্যের আলোর সাথে বিক্রিয়া করে ত্বকে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যার ফলে ত্বক পুড়ে যায়, লাল হয়ে যায় এবং ফোসকা পড়ে। 



ঘরে তৈরি ফেস স্ক্রাব

ফেস স্ক্রাব হিসেবে কফির দানা ব্যবহার করতে দেখা যায়। এগুলো ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে এবং এমনকি দাগও ফেলতে পারে । এছাড়াও ফেস মাস্কে বেকিং সোডার মতো উপাদান ব্যবহার করাও উচিৎ নয়। এতে ত্বকের পিএইচ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে। এর ফলে ত্বকে ব্যথা, লালচে ভাব এবং শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। 



নিজের ফেসিয়াল টোনার তৈরি করা

ফেসিয়াল টোনারের জন্য বেশ কিছু   DIY ভিডিও আছে, যেখানে সাধারণত নিজের বাগানে থাকা ফুল বা ভেষজ; যেমন গোলাপ, ইউক্যালিপটাস, রোজমেরি এই জাতীয় জিনিস ব্যবহার করা হয়। যদিও এগুলোর ব্যবহারে বিশেষ তেমন ক্ষতি হবেনা, তবে এই মিশ্রনটি অল্প কিছু সময়ের পরেই নষ্ট হতে শুরু করবে। আমরা সাধারণত যে সব স্কিন কেয়ার পণ্য কিনে থাকি, তাতে যে প্রকৃতিক নির্যাস গুলো থাকে, সেগুলো নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য বায়ো- ইঞ্জিনিয়ারিং পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। ঘরে তৈরি টোনার সাধারণত কয়েক ঘন্টা পর দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায় এবং এগুলোর উপর কি ধরনের পোকামাকড়, ময়লা এসেছে তার উপর নির্ভর করে এটি ত্বকে জ্বালা পোড়াও সৃষ্টি করতে পারে। 


ল্যাশ লিফট

ল্যাশ লিফটিং বর্তমানে অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ভিডিও তে  এমন কিছু কৌশল দেখানো হয় যা তোমাকে ঘরে বসেই ল্যাশ লিফট কীভাবে করতে হয় তা শেখানো হয়। যদিও এই ভিডিও গুলো সাধারণত DIY কিট প্রস্তুতকারক ব্র্যান্ড বা প্রচারের জন্য ইনফ্লুয়েন্সারদের দ্বারা তৈরি । এগুলো অনেক ভিউ পায় এবং অনেকেই এর অনুকরণ করে। কিন্তু এটা নিজে নিজে করাটাও অনেক বিপদজনক। ঘরে বসে নিজের চোখের পাপড়ি পাম বা টিন্ট করার চেষ্টা করা কোনভাবেই উচিৎ নয়। 



আইল্যাশ গ্লু দিয়ে ঠোঁট ফোলানো

টিকটকের ব্যবহারকারীরা মজা করেই হোক বা সৌন্দর্যের জন্য, তাদের উপরের ঠোঁটকে ফোলাভাব দেখানোর জন্য নকল আইল্যাশ গ্লু ব্যবহার করে। কিন্তু এটা ব্যবহারে ত্বকে মারাত্মক র‍্যাশ  দেখা দিতে পারে। আর এই ধরনের গ্লু তে ফর্মালডিহাইড, প্যারাবেনস, সায়ানোঅ্যাক্রিলেট এর মতো উপাদান রয়েছে। যা ত্বকের কাছাকাছি ব্যবহারের জন্য একেবারেই নিরাপদ নয়। 



ভাইরাল হওয়ার কারন

* দ্রুত ফলাফল দেখায়

* বিফোর-আফটার রেজাল্ট দেখিয়ে বিশ্বাস করায়

* সহজলভ্য জিনিসের ব্যবহার

* ট্রেন্ডের জোয়ারে গা ভাসানোর প্রবণতা



করণীয়

* ভাইরাল সবকিছুই সঠিক হবে এমন ধারণা ঠিক নয়। তাই ট্রেন্ডের জোয়ারে সামিল হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়

* কেমিক্যাল বা অদ্ভূত ধরনের উপাদান থাকলে তা এড়িয়ে যাওয়া

* নতুন কিছু ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করা

* নিজের স্কিন টাইপ বুঝে সিদ্ধান্ত নেয়া

* প্রয়োজনে ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নেয়া।

sidebar ad