নারীর ব্যবসা, স্বপ্ন বড়—কিন্তু এগোনোর পথ এত কঠিন কেন?

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬

নারীর ব্যবসা, স্বপ্ন বড়—কিন্তু এগোনোর পথ এত কঠিন কেন?

অর্থের অভাব, পারিবারিক দায়িত্ব নাকি সামাজিক বাধা—কোথায় আটকে যাচ্ছে নারীদের স্বপ্ন?- সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, পরিবারের জন্য খাবার তৈরি, ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে একজন নারী বসেন নিজের ব্যবসার কাজে। কখনো পণ্য তৈরি করেন, কখনো ক্রেতার ফোন ধরেন, আবার কখনো নতুন বাজারের খোঁজ করেন।


দিন শেষে হয়তো তাঁর নিজের জন্য সময় থাকে না। তবু স্বপ্ন দেখেন, একদিন তাঁর ছোট ব্যবসাটি বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। সেখানে কাজ করবেন আরও অনেক মানুষ। বাংলাদেশে এমন অনেক নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন। কিন্তু তাঁদের সবাই কি ব্যবসা বড় করতে পারছেন?


বাস্তবতা হলো, ব্যবসা শুরু করার চেয়ে সেটিকে বড় করা অনেক বেশি কঠিন। আর নারীদের ক্ষেত্রে এই কঠিন পথের সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু বাড়তি বাধা।


সংসার ও ব্যবসা: দুটো দায়িত্ব একসঙ্গে


অনেক নারী উদ্যোক্তার কাছে ব্যবসা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নয়। সংসারের দায়িত্ব শেষ করে, পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে তাঁকে ব্যবসার সময় বের করতে হয়।


ব্যবসার প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া, নতুন ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও পারিবারিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। পরিবারের সদস্যরা দায়িত্ব ভাগ করে না নিলে একজন নারীর পক্ষে ব্যবসায় পুরো মনোযোগ দেওয়া কঠিন।


একজন নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা এগিয়ে নিতে তাই শুধু তাঁর নিজের পরিশ্রম নয়, পরিবারের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।


নিজের আয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা কতটুকু?


অনেক নারী ব্যবসা করে আয় করছেন। কিন্তু সেই অর্থ ব্যবসায় পুনর্বিনিয়োগ করবেন, নতুন কর্মী নিয়োগ করবেন কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণ নেবেন—এসব সিদ্ধান্তে সব সময় স্বাধীনতা পান না।


কখনো পরিবারের আপত্তি, কখনো লোকসানের ভয়, আবার কখনো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের পিছিয়ে দেয়। ব্যবসা বড় করতে হলে অর্থের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও প্রয়োজন।


ব্যাংকঋণ পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ


নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের অন্যতম বাধা অর্থায়ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্পের মোট বকেয়া ঋণের মাত্র ৭.২৮ শতাংশ ছিল নারী উদ্যোক্তাদের নামে। অথচ এ খাতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের নির্দেশনা রয়েছে।


এখানে ৭.২৮ শতাংশ বলতে মোট বকেয়া ঋণের মধ্যে নারীদের অংশ বোঝানো হয়েছে, নতুন বিতরণ করা ঋণের হার নয়। অনেক নারী উদ্যোক্তার নিজস্ব জমি বা সম্পত্তি নেই। ফলে জামানত দিয়ে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়। আবার ব্যবসার নিবন্ধন, আয়-ব্যয়ের হিসাব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবও তাঁদের ঋণপ্রাপ্তিতে বাধা তৈরি করে।


ভালো পণ্য থাকলেই ব্যবসা বড় হয় না


অনেক নারী উদ্যোক্তা মানসম্মত পণ্য তৈরি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রেতাও পাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের ব্যবসা স্থানীয় বাজার বা অনলাইন বিক্রির গণ্ডি পেরোতে পারছে না। বড় বাজারে প্রবেশ করতে প্রয়োজন ভালো প্যাকেজিং, ব্র্যান্ড পরিচিতি, নিয়মিত উৎপাদন, পরিবেশক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ।


এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সহযোগিতা না থাকলে ভালো পণ্য নিয়েও ব্যবসা সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে পড়ে।


পরিবর্তন কোথায় প্রয়োজন?


নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বড় করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।


* সহজ শর্তে ঋণ ও বিকল্প জামানতের ব্যবস্থা করতে হবে।


* ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যবসার প্রয়োজনীয় নিবন্ধন সহজ করতে হবে।


* হিসাবরক্ষণ, আর্থিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।


* বড় বাজার ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হবে।


* পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।


* নারীর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও আর্থিক স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।


আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির ২০২৫ সালের বাংলাদেশের নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নিয়ে গবেষণাও দেখিয়েছে, আনুষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারা নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু ক্ষেত্রে অনুকূল ঋণশর্ত পায়। তাই ব্যবসাকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় নিয়ে আসাও গুরুত্বপূর্ণ।


শুধু ব্যবসা শুরু নয়, বড় হওয়ার সুযোগও চাই


একজন নারী যখন ব্যবসা শুরু করেন, তখন তাঁর স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিচয় এবং অন্য মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা।


কিন্তু শুধু নারী উদ্যোক্তা তৈরির প্রচারণা যথেষ্ট নয়। তাঁদের ব্যবসাকে টেকসই ও বড় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।


পরিবারকে সহযোগিতা করতে হবে, ব্যাংককে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে, সরকারকে নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে এবং সমাজকে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে।


কারণ একজন নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা বড় হওয়া মানে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয় একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, নতুন কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি।


রোদসীর প্রশ্ন: নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা বড় হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি—অর্থের অভাব, পারিবারিক সহযোগিতার ঘাটতি, নাকি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি?


আপনার অভিজ্ঞতা ও মতামত মন্তব্যে জানান।


তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অর্থায়ন প্রতিবেদন; আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসির ২০২৫ সালের গবেষণা।

sidebar ad