একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা ভালোই চলছে। প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে, ক্রেতারাও নিয়মিত আসছেন। মাস শেষে ব্যবসা থেকে টাকা উঠছে। সেই টাকা দিয়ে পণ্য কেনা হচ্ছে, কর্মীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে, আবার পরিবারের বাজার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচও মেটানো হচ্ছে। কিন্তু কয়েক বছর ব্যবসা করার পরও দেখা যায়, হাতে উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় নেই। ব্যবসা বড় করার মতো অর্থও জমছে না।
কেন এমন হয়?
এর একটি কারণ হতে পারে, ব্যবসার আয় আর পরিবারের খরচের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নেই। ব্যবসা থেকে কত টাকা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে নেওয়া হচ্ছে, কত টাকা ব্যবসায় ফেরত রাখা দরকার এবং কতটা সঞ্চয় করা সম্ভব—এসবের হিসাব নিয়মিত রাখা হচ্ছে না।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসা, পারিবারিক উদ্যোগ, অনলাইন ব্যবসা কিংবা ঘরে বসে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। উদ্যোক্তা নিজেই যখন ব্যবসার মালিক, হিসাবরক্ষক এবং পরিবারের প্রধান অর্থের জোগানদাতা, তখন ব্যবসার টাকা ও ব্যক্তিগত টাকা আলাদা রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে আয় থাকা সত্ত্বেও মূলধন কমে যেতে পারে, ব্যবসার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
বিক্রির টাকা কি আপনার নিজের টাকা?
একটি ব্যবসায় প্রতিদিন যে টাকা আসে, তার পুরোটা উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত আয় নয়। এই সহজ বিষয়টি বুঝতে না পারলে আর্থিক পরিকল্পনায় ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ধরা যাক, একটি পোশাকের দোকানে মাসে তিন লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হলো। পণ্য কেনা, দোকানভাড়া, কর্মীদের বেতন, পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে বড় একটি অংশ খরচ হয়ে গেল। বাকি পাওনা, ঋণের কিস্তি কিংবা অন্যান্য দায় থাকলে সেগুলোর হিসাবও করতে হবে।
সব প্রযোজ্য ব্যয় বাদ দেওয়ার পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকবে, তা থেকে ব্যবসার ভবিষ্যৎ প্রয়োজন, জরুরি তহবিল এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য অর্থ রাখতে হতে পারে। অবশিষ্ট অর্থের কতটা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে ব্যবসার আর্থিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর।
অর্থাৎ, বিক্রি হয়েছে বলেই সেই টাকা সংসারের খরচে ব্যবহার করা যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়।
একটি ছোট ভুল কীভাবে বড় আর্থিক সংকট তৈরি করে?
ধরা যাক, একটি ব্যবসা থেকে সব ব্যয় বাদ দেওয়ার পর মাসে ৩০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে। কিন্তু উদ্যোক্তা সংসারের খরচ মেটাতে প্রতি মাসে ব্যবসা থেকে ৫০ হাজার টাকা তুলে নিচ্ছেন।
প্রথম কয়েক মাস হয়তো সমস্যা বোঝা যাবে না। ব্যবসায় আগের কিছু সঞ্চয় থাকলে তা দিয়েই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে অতিরিক্ত নেওয়া হলে এক বছরে ব্যবসার মূলধন থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা কমে যাবে।
এটি একটি কাল্পনিক উদাহরণ। বাস্তবে ব্যবসার নগদ প্রবাহ, পাওনা, দেনা ও অন্যান্য আর্থিক বিষয় বিবেচনা করে হিসাব করতে হবে। তবে উদাহরণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝায়—ব্যবসার প্রকৃত লাভের চেয়ে বেশি অর্থ নিয়মিত তুলে নিলে দীর্ঘমেয়াদে মূলধন ক্ষয় হতে পারে।
এর ফল হতে পারে নতুন পণ্য কেনার অর্থের অভাব, সরবরাহকারীর বিল পরিশোধে দেরি কিংবা ব্যবসার প্রয়োজনে নতুন ঋণ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা। তখন যে ব্যবসা একসময় পরিবারকে স্বচ্ছলতা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই পরিবারের জন্য আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সংসারের জন্য কত টাকা নেবেন, ঠিক করবেন কীভাবে?
ব্যবসা থেকে পরিবারের খরচ দেওয়া স্বাভাবিক। উদ্যোক্তার ব্যবসা করার অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো নিজের ও পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন পূরণ করা। সমস্যা তৈরি হয় যখন ব্যক্তিগত খরচের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা থাকে না।
প্রথমে পরিবারের মাসিক বাজেট তৈরি করুন। বাড়িভাড়া, খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের হিসাব করুন। এরপর ব্যবসার প্রকৃত লাভ, নিয়মিত ব্যয়, ঋণের দায় এবং হাতে থাকা অর্থের সঙ্গে এই বাজেট মিলিয়ে দেখুন।
ব্যবসার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক ঠিক করা যেতে পারে। তবে ব্যবসার আয় অনিয়মিত হলে সেই অঙ্কও বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যালোচনা করতে হবে।
কোনো মাসে বিক্রি বেশি হয়েছে বলেই ব্যক্তিগত খরচ বাড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। আবার ব্যবসায় লোকসান হলে আগের মতোই টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
আলাদা হিসাব রাখলে কী সুবিধা?
ব্যবসা ও ব্যক্তিগত অর্থ আলাদা রাখার সহজ উপায় হলো সম্ভব হলে দুটি পৃথক ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা। ব্যবসার বিক্রির অর্থ ব্যবসার হিসাবে জমা হবে। পণ্য কেনা, বেতন, ভাড়া ও অন্যান্য ব্যবসায়িক ব্যয় সেখান থেকে পরিশোধ করা হবে। ব্যক্তিগত খরচের জন্য নির্ধারিত অর্থ আলাদা করে নেওয়া যাবে।
যাঁদের পক্ষে আলাদা ব্যাংক হিসাব রাখা সম্ভব নয়, তাঁরা অন্তত খাতা বা মুঠোফোনে দুটি পৃথক হিসাব রাখতে পারেন। একটিতে ব্যবসার আয়-ব্যয়, অন্যটিতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয় লিখবেন।
ব্যবসা থেকে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কত টাকা নেওয়া হলো, সংসারের অর্থ থেকে ব্যবসায় কত টাকা দেওয়া হলো—এসবও নথিভুক্ত করা জরুরি। এতে মাস শেষে ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা বোঝা সহজ হবে।
ব্যবসার কাঠামো অনুযায়ী ব্যক্তিগত উত্তোলন, মালিকের বিনিয়োগ বা মালিকের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের হিসাব আলাদা হতে পারে। প্রয়োজন হলে হিসাবরক্ষকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সঞ্চয় করবেন কখন?
অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, সব খরচ মেটানোর পর টাকা থাকলে সঞ্চয় করবেন। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, মাস শেষে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
তাই ব্যবসার আর্থিক পরিকল্পনায় শুরু থেকেই সঞ্চয়ের বিষয়টি রাখতে হবে। প্রথমে প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয়, দেনা ও ভবিষ্যৎ মূলধনের হিসাব করুন। এরপর ব্যবসার সামর্থ্য অনুযায়ী জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন। পাশাপাশি পরিবারের জন্যও আলাদা সঞ্চয়ের পরিকল্পনা রাখুন।
ব্যবসার জরুরি তহবিল ব্যবহার করা হবে ব্যবসার অপ্রত্যাশিত প্রয়োজন মেটাতে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সঞ্চয় পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা, ভবিষ্যৎ প্রয়োজন কিংবা অন্যান্য ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করবে। দুটি তহবিলের উদ্দেশ্য আলাদা হওয়ায় সম্ভব হলে এগুলো পৃথক রাখাই ভালো।
আয় কম হলে সঞ্চয়ের পরিমাণ ছোট হতে পারে। তবু নিয়মিত হিসাব রাখা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ আলাদা করার অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসে।
আর্থিক শৃঙ্খলাই ভবিষ্যতের নিরাপত্তা
ব্যবসা ভালো চলা মানেই উদ্যোক্তা আর্থিকভাবে নিরাপদ—এমন নয়। ব্যবসার আয়, সংসারের খরচ, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং সঞ্চয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে আয় বাড়লেও আর্থিক স্থিতি তৈরি নাও হতে পারে।
তাই প্রতি মাসে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন: ব্যবসার প্রকৃত লাভ কত? ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে? আর ব্যবসার ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটানোর জন্য কত অর্থ সংরক্ষিত থাকছে?
এই হিসাবগুলো নিয়মিত পর্যালোচনা করলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করা, ব্যবসার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা এবং ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
ব্যবসার টাকা ও সংসারের টাকা আলাদা রাখা মানে পরিবারকে কম গুরুত্ব দেওয়া নয়। বরং ব্যবসাকে স্থিতিশীল রেখে পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ একটি ব্যবসা তখনই পরিবারকে নির্ভরযোগ্য সহায়তা দিতে পারে, যখন তার নিজের আর্থিক ভিত্তি সুসংগঠিত থাকে।
আরও পড়ুন: বিক্রি হচ্ছে, তবু হাতে টাকা নেই! ব্যবসার এই সংকট সামলাবেন