মাত্র ২০ মাসে ৩৭০টির বেশি বই। বিক্রি হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি কপি। চলতি বছরেই আয় ছাড়িয়েছে ১০ লাখ মার্কিন ডলার—আর এর পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এমন দাবিই করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক কোরাল হার্ট। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এআইকে নিজের লেখালেখির কাজে যুক্ত করে তিনি ৩৭১টি বই প্রকাশ করেছেন বলে সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। তাঁর অধিকাংশ বই রোমান্সধর্মী এবং নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বাজার গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি।
তবে এই সাফল্যের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তীব্র বিতর্কও। এআই দিয়ে বই লেখার কথা প্রকাশ্যে বলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে ‘গ্রিফটার’, ‘ভিলেন’সহ নানা নামে আক্রমণ করা হয়েছে। হার্ট জানিয়েছেন, তিনি হাজার হাজার ঘৃণামূলক বার্তা এবং একাধিক মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। নিজের আসল পরিচয় গোপন রাখতে ‘কোরাল হার্ট’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন তিনি।
লেখক, কিন্তু লেখার বড় অংশ এআইয়ের হাতে
কোরাল হার্টের গল্পটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে তাঁর আগের পেশাগত পরিচয় জানলে। এআইনির্ভর লেখালেখি শুরু করার আগে তিনি প্রায় ১৪–১৫ বছর প্রকাশনা শিল্পে কাজ করেছেন এবং এআই ছাড়াই কয়েক ডজন বই লিখেছেন। তাঁর নিজের প্রেস কিটে ৯৬টি উপন্যাসকে এআই ব্যবহারের আগের লেখা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, তিনি সরাসরি ‘এআইকে বললাম, একটা বই লিখে দাও’—এমন পদ্ধতিতে কাজ করেন না। বরং গল্পের মূল ধারণা, চরিত্র, লেখার ধরন, আবহ এবং অধ্যায়ের কাঠামো তৈরি করেন তিনি নিজেই। এরপর বিভিন্ন এআই মডেলকে কাজে লাগিয়ে সেই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বইয়ের খসড়া তৈরি করা হয়।
হার্ট জানিয়েছেন, লেখার ক্ষেত্রে তিনি একাধিক এআই মডেল ব্যবহার করেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, একেকটি মডেলের একেক ধরনের শক্তি রয়েছে—কোনোটি সংলাপে ভালো, কোনোটি গল্পের কাঠামো তৈরিতে, আবার কোনোটি নির্দিষ্ট দৃশ্য তৈরিতে কার্যকর।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআইকে শুধু একটি নির্দেশনা দিয়ে বই লিখতে দিলে ভালো ফল পাওয়া যায় না। বরং লেখককে আগে গল্পের ‘ভিত’ তৈরি করে দিতে হয়। এরপর এআই সেই পরিকল্পনাকে দ্রুত শব্দে রূপ দেয়।
খসড়া শেষ নয়, শুরু
হার্টের পদ্ধতিতে এআই দিয়ে প্রথম খসড়া তৈরি হওয়ার পরই কাজ শেষ হয়ে যায় না। বরং শুরু হয় পরবর্তী ধাপ।
তিনি জানিয়েছেন, প্রথম খসড়াটি সাধারণত যথেষ্ট ভালো হয় না। এরপর এআইয়ের সাহায্যে গল্পের কাঠামো, চরিত্রের বিকাশ, ধারাবাহিকতা এবং অসম্পূর্ণ প্লট পরীক্ষা করা হয়। কোনো চরিত্রের চেহারা বা বৈশিষ্ট্য হঠাৎ বদলে গেছে কি না, কোনো গল্পের সূত্র মাঝপথে হারিয়ে গেছে কি না, কিংবা গল্পের মাঝের অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে কি না—এসবও যাচাই করা হয়।
সবশেষে একজন মানব প্রুফরিডার পুরো লেখা পড়ে দেখেন। এআইয়ের তৈরি বাক্য বা শব্দচয়ন, যেগুলো সহজেই কৃত্রিম বলে বোঝা যায়, সেগুলো সংশোধন করা হয় এবং প্রয়োজন হলে লেখা পুনর্লিখন করা হয়।
অর্থাৎ হার্টের মডেলটি পুরোপুরি মানুষবিহীন প্রকাশনা নয়। বরং এখানে মানুষ গল্পের স্রষ্টা ও পরিচালক, আর এআই দ্রুত উৎপাদন, সম্পাদনা ও পুনর্গঠনের হাতিয়ার।
১০ লাখ বই বিক্রির দাবি
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এতে কি সত্যিই ব্যবসা করা যায়?
হার্টের উত্তর, যায়।
তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী, ডিজিটাল, মুদ্রিত ও অডিও—তিন ধরনের সংস্করণ মিলিয়ে তাঁর বই বিক্রি হয়েছে ১০ লাখের বেশি কপি। চলতি বছর তাঁর আয়ও ১০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। তাঁর একটি উপন্যাস অ্যামাজনের শীর্ষ ১০০ বেস্টসেলার তালিকাতেও উঠেছিল।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। এই বিক্রি ও আয়ের পরিসংখ্যানগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নিরীক্ষিত হিসাব নয়; এগুলো হার্টের নিজের দেওয়া তথ্য হিসেবে এএফপি প্রতিবেদন করেছে। ফলে সংখ্যাগুলোকে তাঁর দাবি হিসেবেই দেখা উচিত।
লেখক অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাচ্ছেন?
এআইয়ের মাধ্যমে যদি একজন মানুষ কয়েক মাসে শত শত বই প্রকাশ করতে পারেন, তাহলে লেখকের ভূমিকা কোথায়? একজন লেখক কি শুধু গল্পের ধারণা ও কাঠামো তৈরি করবেন, আর বাকিটা মেশিনের হাতে তুলে দেবেন?
কোরাল হার্ট মনে করেন, এআই লেখককে সরিয়ে দিচ্ছে না; বরং লেখকের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। তাঁর যুক্তি, পাঠক শেষ পর্যন্ত ভালো গল্পই খোঁজেন। বই ভালো না হলে পাঠক সেটি কিনবেন না বা পড়ে শেষ করবেন না।
কিন্তু তাঁর সমালোচকেরা বিষয়টিকে এত সহজভাবে দেখছেন না। তাঁদের আশঙ্কা, বিপুল পরিমাণ এআইনির্ভর বই বাজারে ঢুকে গেলে মানুষের লেখা বইও সেই ভিড়ে হারিয়ে যেতে পারে। আরও বড় সমস্যা হলো—পাঠক সব সময় বুঝতে পারবেন না কোন বই কতটা মানুষের লেখা এবং কতটা মেশিনের তৈরি।
‘এআই স্লপ’—অর্থাৎ বিপুল পরিমাণে দ্রুত তৈরি, নিম্নমানের ও পুনরাবৃত্তিমূলক এআই কনটেন্ট—নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রকাশনা জগতে উদ্বেগ রয়েছে। দ্য Authors Guild-ও বলেছে, এআইনির্ভর বইয়ের বিস্তার পাঠক ও লেখকের মধ্যে স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করছে। সংগঠনটি এআই ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিরোধিতা না করলেও মানুষের সৃজনশীলতা এবং লেখকের নিজস্ব কণ্ঠকে গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অ্যামাজনের Kindle Direct Publishing বা KDP বর্তমানে বই প্রকাশের সময় এআই-নির্মিত কনটেন্ট সম্পর্কে প্রকাশককে তথ্য দিতে বলে। তাদের নীতিতে AI-generated এবং AI-assisted কনটেন্টের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে। এআই দিয়ে মূল লেখা তৈরি করা হলে সেটি AI-generated হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কিন্তু লেখক নিজে লেখা তৈরি করে এআই দিয়ে সম্পাদনা, পরিমার্জন বা ত্রুটি শনাক্ত করলে সেটি AI-assisted হিসেবে গণ্য হয় এবং তার জন্য একই ধরনের প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়।
এই পার্থক্যই ভবিষ্যতের প্রকাশনা জগতের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে—এআই কি লেখকের সহকারী, নাকি সহলেখক?
কোরাল হার্টের ক্ষেত্রে এআই কেবল বানান বা ব্যাকরণ ঠিক করছে না; গল্পের খসড়া এবং বিপুল পরিমাণ শব্দও তৈরি করছে। তাই তাঁর কাজকে নিছক AI-assisted বলা হবে, নাকি AI-generated-এর কাছাকাছি ধরা হবে—সেটিও বিতর্কের বিষয়।
কপিরাইটের প্রশ্নও থাকছে
এআই দিয়ে তৈরি বইয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এর স্রষ্টা কে?- যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট অফিস ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এআই কোনো কাজে সহায়তা করলেও মানুষের সৃজনশীল অবদান থাকলে সেই মানবসৃষ্ট অংশ কপিরাইট সুরক্ষা পেতে পারে। কিন্তু শুধু এআইকে নির্দেশনা বা প্রম্পট দেওয়াই যথেষ্ট মানবিক সৃজনশীলতা হিসেবে বিবেচিত হবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ ও অবদান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
একজন লেখক যদি নিজের অভিজ্ঞতা, কল্পনা, চরিত্র ও গল্পের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে এআইকে দ্রুত লেখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, সেটি এক ধরনের মডেল। আর কেউ যদি সামান্য নির্দেশনা দিয়ে মেশিনের তৈরি শত শত বই বাজারে ছেড়ে দেন, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।
এই দুইয়ের পার্থক্য বোঝার দায়িত্ব শুধু লেখকের নয়; প্রকাশক, প্ল্যাটফর্ম এবং পাঠকেরও।
কোরাল হার্ট হয়তো সেই ভবিষ্যতের দরজাটি একটু জোরেই খুলে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো—সেই দরজার ওপারে প্রকাশনা জগত আরও সৃজনশীল হবে, নাকি আরও বেশি বইয়ের ভিড়ে মানুষের নিজস্ব কণ্ঠটাই হারিয়ে যাবে?