বিদেশে উচ্চশিক্ষা: সামাজিক বাধা পেরিয়ে সালসাবিলের স্বপ্নপূরণ

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬

ছবি: বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের পথে আসফিয়া সালসাবিল
ছবি: বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণের পথে আসফিয়া সালসাবিল

স্কলারশিপ নিয়ে হাঙ্গেরির ইউনিভার্সিটি অব পেচে পড়াশোনা করছেন বাংলাদেশের আসফিয়া সালসাবিল। বিদেশের মাটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, একা পথচলার চ্যালেঞ্জ, নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন নিজে সামলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রতিনিয়ত পরিণত করছে।


বিদেশে উচ্চশিক্ষা— অনেক তরুণীর কাছে এটি একটি স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে কেবল ভালো ফলাফল বা স্কলারশিপ অর্জনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাহস, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার মানসিকতা। বিশেষ করে একজন নারী যখন একা দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তাঁকে সামাজিক নানা প্রশ্ন ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়।


বাংলাদেশের আসফিয়া সালসাবিল সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছেন। বর্তমানে তিনি হাঙ্গেরির ইউনিভার্সিটি অব পেচের মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশের পরিবেশে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন তিনি।




                                                                   ছবি: ইউনিভার্সিটি অব পেচ, হাঙ্গেরি। 


স্কলারশিপে পড়াশোনা, বাড়তি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ


বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক সক্ষমতা। ইউরোপের দেশগুলোতে পড়াশোনা ও জীবনযাত্রার ব্যয় অনেকের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। আসফিয়ার অভিজ্ঞতায়, হাঙ্গেরিতে পড়াশোনা যথেষ্ট ব্যয়বহুল হলেও স্কলারশিপের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক চাপ অনেকটাই কমেছে।


তিনি বলেন, ‘আমি যখন আবেদন করি, তখন আমার কোনো ভর্তি ফি দিতে হয়নি। ভিসা ফিও দিতে হয়নি, শুধু ভিসার সার্ভিস চার্জ দিতে হয়েছিল। একই সঙ্গে আমার সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতি মাসে থাকা ও খাওয়ার খরচ বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থও পাচ্ছি। ফলে আর্থিক দুশ্চিন্তা করতে হচ্ছে না।’


বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশও তাঁর কাছে বেশ ইতিবাচক। ইউনিভার্সিটি অব পেচকে তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা কাজের সুযোগ পান। এসব কাজের বিনিময়ে প্রকল্পভিত্তিক অথবা মাসিক পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের আয় করার সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত সমৃদ্ধ করে এবং পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।


বিদেশে যেতে চাইলেই মেলে না পরিবারের সম্মতি


একজন নারী একা বিদেশে পড়তে যেতে চাইলে তাঁকে অনেক সময় নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত ধারণার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়। নিরাপত্তা, বয়স, বিয়ে কিংবা পরিবারের বাইরে একা থাকার বিষয়গুলো সামনে এনে অনেকেই নারীদের বিদেশযাত্রায় নিরুৎসাহিত করেন।




আসফিয়াও এর ব্যতিক্রম নন। তাঁর ভাষায়, ‘আপনি যখন একা দেশের বাইরে পড়াশোনা করতে যেতে চান, তখন অনেকেই অতিরিক্ত যত্ন বা সতর্কতার কথা বলে একজন মেয়েকে একা বিদেশে যেতে দিতে চান না। অনেকে বলেন, বিয়ের পর স্বামীকে নিয়ে বিদেশে যেয়ো কিংবা তোমার একা যাওয়ার দরকার কী? এখনই তোমার বিদেশে যাওয়ার সঠিক সময় নয়।’


নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, স্কলারশিপের জন্য আবেদন করার সময় মা-বাবাসহ কাউকেই বিষয়টি জানাননি। স্কলারশিপ পাওয়ার পর পরিবারকে জানান। সিদ্ধান্তটি নেওয়া এবং তা বাস্তবায়নের পুরো সময় তাঁর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত পরিবারের সমর্থন পেয়েছেন তিনি।


আসফিয়ার এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, নারীর উচ্চশিক্ষার পথে অনেক সময় আর্থিক সামর্থ্যের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পরিবারের সমর্থন একজন নারীর আত্মবিশ্বাস ও এগিয়ে যাওয়ার পথকে অনেক সহজ করে দিতে পারে।


নিরাপত্তা ও নিজের প্রতি সচেতনতা


বিদেশে একা থাকা নারীদের জন্য নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ এবং অপরিচিত মানুষের মধ্যে নিজের চলাফেরা ও দৈনন্দিন জীবন সামলে নেওয়া সহজ নয়। তবে আসফিয়ার অভিজ্ঞতায়, হাঙ্গেরিতে তিনি তুলনামূলকভাবে স্বস্তি অনুভব করেন।


তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে রাত ৮টা বা ৯টার দিকে একা রাস্তায় বের হওয়ার সাহস আমি করব না। কিন্তু এখানে যখনই একা বাইরে যাই, এ ধরনের কোনো দুশ্চিন্তা কাজ করে না। কারণ, আমি জানি, এখানকার আইনকানুন বেশ কঠোর। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ও এ বিষয়ে অনেক সচেতন।’


তবে নিরাপত্তার বিষয়টিকে তিনি শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হিসেবে দেখেন না। নিজের সচেতনতার ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব অনেকাংশেই নিজের হাতে। তাই আমি সব সময় সেভাবেই চলার চেষ্টা করি। এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলি, যেখানে নিজের সম্মানহানির আশঙ্কা রয়েছে।’


নিজের কাজ নিজে, আত্মনির্ভরতার নতুন পাঠ


বিদেশে পড়াশোনা মানে শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠ নেওয়া কিংবা ডিগ্রি অর্জন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিদিনের জীবনের নানা দায়িত্ব। নিজের বিল পরিশোধ, বাজার করা, রান্না করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজই নিজেকে সামলাতে হয়।


আসফিয়ার মতে, এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে জীবনের নানা ক্ষেত্রে পরিণত হতে সাহায্য করছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিজের প্রয়োজন বুঝতে পারা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে আত্মনির্ভরশীলতা।


তিনি বলেন, ‘এখানে এসে নিজের সব কাজ নিজেকেই করতে হয়। সব ধরনের বিল পরিশোধ করা, বাজার করা, রান্না করা—অর্থাৎ নিজের দৈনন্দিন কাজগুলো একাই সামলাতে হয়। আমার মনে হয়, এসব অভিজ্ঞতা আমাকে আর্থিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে পরিণত হতে সাহায্য করছে।’


পরিবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টাও তাঁর এই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আসফিয়ার কথায়, ‘আমি চেষ্টা করি মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে।’




স্বপ্নের পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তোলার গল্প


আসফিয়া সালসাবিলের হাঙ্গেরিযাত্রা কেবল উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছাড়ার গল্প নয়। এটি নিজের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যাওয়া, সামাজিক বাধা পেরোনো এবং নতুন পরিবেশে দায়িত্ব নিতে শেখার গল্পও। স্কলারশিপ তাঁকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে, আর বিদেশের জীবন তাঁকে শিখিয়েছে নিজের কাজ নিজে সামলাতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিজের ওপর নির্ভর করতে।


একজন নারী শিক্ষার্থীর কাছে বিদেশে পড়াশোনা তাই শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্য নয়; এটি নিজের সক্ষমতা আবিষ্কার এবং স্বাধীনভাবে জীবন পরিচালনারও একটি অভিজ্ঞতা।


ঢাকা/টিএ

sidebar ad