জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হচ্ছেন আইরিন খান

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হচ্ছেন আইরিন খান

রোদসী ডেস্ক: 


প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী আইরিন খানকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি (রাষ্ট্রদূত) হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তিনি বর্তমানে দায়িত্বে থাকা স্থায়ী প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হবেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই তিনি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।


আইরিন খান এই পদে বাংলাদেশের প্রথম নারী নন। এর আগে ইসমত জাহান এবং রাবাব ফাতিমা জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে আইরিন খান হবেন বাংলাদেশের তৃতীয় নারী স্থায়ী প্রতিনিধি।


২০২০ সালের ১ আগস্ট থেকে তিনি জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৯৩ সালে এই ম্যান্ডেট চালু হওয়ার পর তিনি প্রথম নারী হিসেবে এই দায়িত্ব লাভ করেন। বর্তমানে তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর সহলিখিত বই ‘The Unheard Truth: Poverty and Human Rights’ বিশ্বের সাতটি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।


২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এর মহাসচিব ছিলেন। সংস্থাটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী মহাসচিব। তাঁর নেতৃত্বে অ্যামনেস্টি রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করে। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সংস্থাটির প্রথম বৈশ্বিক প্রচারণাও শুরু হয় তাঁর নেতৃত্বে।


এরপর ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশন (আইডিএলও)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-১৬ বাস্তবায়ন, আইনের শাসন, শান্তি, ন্যায়বিচার এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।


২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক ল স্কুল-এর ভিজিটিং প্রফেসর এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্যালফোর্ড-এর চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।


পেশাজীবনের শুরুতে তিনি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এ যোগ দেন। টানা ২১ বছর তিনি সংস্থাটির সদর দপ্তরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ভারতে ইউএনএইচসিআরের মিশনপ্রধান এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষাবিষয়ক বিভাগের উপপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।


বর্তমানে তিনি কলাম্বিয়া গ্লোবাল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন অ্যাওয়ার্ড-এর জুরিবোর্ডের সদস্য। অতীতে তিনি বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল, ইউএনএইডসের মানবাধিকারবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল এবং ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল-এর সদস্য ছিলেন। এছাড়া বর্তমানে তিনি ব্র্যাক, যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (ওডিআই) এবং উগান্ডার বেয়ারফুট ল-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য।


মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ২০০৬ সালে সিডনি পিস প্রাইজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া আইরিন খান যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।


জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নারী কূটনীতিকদের অংশগ্রহণ নতুন নয়। বিশ্বের অনেক দেশেই গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নারীরা সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

যুক্তরাষ্ট্র: ম্যাডেলিন অলব্রাইট, সুসান রাইস, লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড


যুক্তরাজ্য: বারবারা উডওয়ার্ড


ভারত: নিরুপমা রাও, রুচিরা কাম্বোজ


নরওয়ে: মোনা জুল


সংযুক্ত আরব আমিরাত: লানা নুসেইবেহ


আয়ারল্যান্ড: জেরালডিন বাইর্ন নেসন


মেক্সিকো: অ্যালিসিয়া বুয়েনরোস্ত্রো


আইরিন খানের নিয়োগ বাংলাদেশের কূটনীতিতে অভিজ্ঞতা, মানবাধিকার এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতির সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতিসংঘ ব্যবস্থায় তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে কূটনৈতিক মহলের প্রত্যাশা।

sidebar ad