আকাশ ছুঁতে নারীর ডানা: এভিয়েশন ও পর্যটনে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব

প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬

আকাশ ছুঁতে নারীর ডানা: এভিয়েশন ও পর্যটনে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব

বাংলাদেশের আকাশে যখন একটি বিমান উড়ে যায়, আমরা সাধারণত দেখি ধাতব ডানা, গর্জন করা ইঞ্জিন আর মেঘ ভেদ করে এগিয়ে চলা এক যাত্রা। কিন্তু সেই যাত্রার পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, শ্রম এবং সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তার কেন্দ্রে রয়েছেন কয়েকজন দক্ষ ও দূরদর্শী নারী। নীতিনির্ধারণী টেবিল থেকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব, আবার পর্যটনের ব্র্যান্ডিংসবখানেই এখন নারীর শক্ত উপস্থিতি।

 

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের গল্প নতুন নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, রাজনীতিসবখানেই ধীরে ধীরে নারীরা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু এভিয়েশন এবং পর্যটনের মতো কৌশলগত ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে নারীর নেতৃত্ব এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো একজন নারী এই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।



 

মানিকগঞ্জ-৩ আসনের এই নেত্রী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন কাজ করলেও তাঁর সামনে এখন নতুন এক চ্যালেঞ্জবাংলাদেশের বিমান ও পর্যটন খাতকে আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তোলা। দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্প এখন শেষ পর্যায়ে। এই টার্মিনাল চালু হলে বাংলাদেশ শুধু যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেই নয়, আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার দিকেও এগিয়ে যাবে। সেই বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তাঁর কাঁধে।

 

তবে বড় পরিবর্তন কখনোই একজন মানুষের একার কাজ নয়। এর পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী দল। বাংলাদেশ বিমানের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছেন ড. হুমায়রা সুলতানা। ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী হিসেবে তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

বিমান শুধু একটি পরিবহন সংস্থা নয়, এটি একটি দেশের মর্যাদার প্রতীক। জাতীয় পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক, দক্ষ এবং যাত্রীবান্ধব করে তোলার কাজ সহজ নয়। কিন্তু নতুন নেতৃত্বের অধীনে বিমানের পরিচালনা, সেবা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। একজন নারী হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসনিক দক্ষতাই নয়, দৃঢ়তা এবং দূরদর্শিতার পরিচয়ও দিচ্ছেন।

 

মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী কাঠামোকে শক্তিশালী করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম নাসরীন জাহান। সচিব হিসেবে তিনি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্ব দিচ্ছেন। একটি মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সমন্বয়সবকিছুই সচিবের দক্ষতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করে।

 

এভিয়েশন খাত অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর। এখানে নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান, নিয়ন্ত্রক কাঠামোসবকিছুই অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিচালনা করতে হয়। এই জটিল কাঠামোর ভেতরে প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নাসরীন জাহানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে মন্ত্রণালয়ের অনেক প্রক্রিয়াই এখন আরও গতিশীল ও সমন্বিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

 

এই প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছেন পর্যটন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফাতেমা রহিম ভীনা। পর্যটন খাত শুধু একটি বিনোদনের ক্ষেত্র নয়; এটি অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের সমুদ্র, পাহাড়, নদী ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বিশ্ব পর্যটকদের কাছে তুলে ধরার জন্য নীতি, পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে একটি সমন্বয় দরকার। সেই সমন্বয় তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

এভিয়েশন যেখানে আকাশের গল্প, পর্যটন সেখানে মাটির গল্প। আর এই মাটির গল্পকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুজহাত ইয়াসমিন। তাঁর নেতৃত্বে ব্র্যান্ড বাংলাদেশ ধারণাটি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।

 

বিশ্ব পর্যটনের বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। একটি দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেই হয় না, সেটিকে বিশ্বব্যাপী সঠিকভাবে তুলে ধরতে হয়। ডিজিটাল প্রচার, আন্তর্জাতিক মেলা, ভিজ্যুয়াল ব্র্যান্ডিংসবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি দেশের পর্যটন পরিচিতি। নুজহাত ইয়াসমিন সেই দিকেই কাজ করছেনবাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে।

 

এই প্রচেষ্টাকে বাস্তব রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন সায়েমা শাহীন সুলতানা। পর্যটন করপোরেশন শুধু পর্যটন কেন্দ্র পরিচালনাই করে না, বরং অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং নতুন পর্যটন পণ্য তৈরিতেও কাজ করে। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিক, করপোরেট এবং দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।


 

এই ছয় নারীর নেতৃত্ব শুধু প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি একটি সামাজিক পরিবর্তনের প্রতীকও। দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৌশলগত খাতগুলোকে পুরুষপ্রধান হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু আজ সেই ধারণা বদলাচ্ছে। নারীরা এখন শুধু অংশগ্রহণই করছেন না, বরং নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

 

বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে নারীরা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেনগ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে গার্মেন্টস শিল্প পর্যন্ত। এখন সেই শক্তি আরও নতুন খাতে বিস্তার লাভ করছে। এভিয়েশন ও পর্যটনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত খাতে নারীর নেতৃত্ব দেশের ভাবমূর্তিকেও নতুনভাবে তুলে ধরছে।

 

বিশ্বের অনেক দেশ এখন পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও সেই সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি অনন্য পর্যটন সম্ভাবনার দেশ।

 

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দরকার পরিকল্পনা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা। আর সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের এভিয়েশন ও পর্যটন খাত।

 

আজ যখন একটি বিমান আকাশে উড়ে যায়, সেটি শুধু একটি যাত্রা নয়; সেটি বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রতীক। আর সেই সম্ভাবনার ডানায় ভর করে এগিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন সাহসী ও দূরদর্শী নারী।


তাদের নেতৃত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়আকাশ কখনো কারও একার নয়। যারা সাহস করে ডানা মেলে, আকাশ শেষ পর্যন্ত তাদেরই হয়ে যায়।

লেখক -সাবিনা ইয়াসমীন, সম্পাদক- রোদসী

sidebar ad