জনপ্রিয় বাংলাদেশী উপস্থাপিকা ও অভিনেত্রী সামিয়া আফরিন, যিনি বিগত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে প্রথম তাঁর শরীরে চতুর্থ স্টেজের কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে, যা ফুসফুস ও লিম্ফ নোডেও ছড়িয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসা ও ইমিউনোথেরাপির পর সুস্থ হয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও, সম্প্রতি ২০২৬ সালে তাঁর শরীরে নতুন করে ওভারিয়ান ক্যানসার (ডিম্বাশয়ের ক্যানসার) শনাক্ত হয়েছে। জীবনের এই কঠিনতম মোড়ে দাঁড়িয়েও তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ইতিবাচকতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা ক্যানসার সচেতনতায় এক নতুন বার্তা হিসেবে সামনে এসেছে।
ভয়কে পেছনে ফেলে আশার পথে সামিরা আফরিন।
ক্যান্সার শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে প্রথম
যে অনুভূতিটি আসে, তা হলো ভয়।
যেন হঠাৎ করেই পরিচিত জীবনের সামনে নেমে
আসে এক অদৃশ্য অন্ধকার। কিন্তু ক্যান্সার মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়।
চিকিৎসা, সচেতনতা, মানসিক শক্তি এবং আশাবাদ
এই চারটি শক্তি অনেক মানুষকে আবার জীবনের পথে ফিরিয়ে আনে।
সামিরা আফরিন সেই লড়াইয়েরই একজন যোদ্ধা।
সম্প্রতি নিজের তৃতীয় কেমোথেরাপি শেষ করার
পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামিরা লিখেছেন, “আগামী কয়েকটা দিন হয়তো একটু কঠিন যাবে,
তবে ইনশাআল্লাহ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠব।”
তাঁর কথার মধ্যে যেমন কেমোথেরাপির কঠিন বাস্তবতা
আছে, তেমনি আছে সুস্থ হয়ে ওঠার দৃঢ় বিশ্বাস।
আহা,
তাঁর সবচেয়ে গভীর প্রার্থনাটি আরও বেশি স্পর্শ করে শরীরে যেন আর কখনো ক্যান্সার বাসা বাঁধতে না পারে।
এটি শুধু একজন ক্যান্সার রোগীর প্রার্থনা
নয়,এটি প্রতিটি মানুষের জন্য একটি উপলব্ধি স্বাস্থ্য হারানোর আগে স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব
দেওয়া কতটা জরুরি।
তৃতীয় কেমোর পরও যে মানুষটি আশাবাদী,
কেমোথেরাপি শরীর ও মন দুটোর ওপরই কঠিন প্রভাব
ফেলতে পারে।
ক্লান্তি, দুর্বলতা, বমিভাব, ক্ষুধার পরিবর্তন
কিংবা নানা শারীরিক অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয় অনেক রোগীকে। তবু সামিরার বক্তব্যে
হতাশার চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে আশা।
আরোও পড়ুন: মিথিলা :যে নারী নিজের পরিচয়নিজেই লিখেছেন
এই জায়গাটিই তাঁর গল্পকে আলাদা করে।
ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু হাসপাতালের বিছানায়
বা ওষুধের মাধ্যমে হয় না রোগীর মানসিক শক্তিও এই দীর্ঘ যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতিটি কেমো শেষ করা তাই শুধু চিকিৎসার একটি ধাপ
পার হওয়া নয় এটি নিজের ভেতরের ভয়কে প্রতিবার একটু একটু করে জয় করা।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সচেতনতাই প্রথম
প্রতিরোধ।
অক্টোবর বিশ্বজুড়ে Breast Cancer
Awareness Month হিসেবে বিশেষভাবে পালিত হয়।
এই মাসের উদ্দেশ্য শুধু ক্যান্সার নিয়ে কথা
বলা নয়, বরং মানুষকে নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন করা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার
গুরুত্ব বোঝানো।
সামিরা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সেই বার্তাটিই
দিয়েছেন শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করা, সময়মতো চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনিং ও রেগুলার চেকআপ করা।
কারণ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অনেক সময় সময়ই
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কোনো পরিবর্তন মানেই ক্যান্সার নয়।
কিন্তু অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণকে দীর্ঘদিন
অবহেলা করাও ঠিক নয়। নিজের শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের
পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রোগী নন, একজন যোদ্ধা
সামিরার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়,ক্যান্সারের
পরিচয় একজন মানুষকে সংজ্ঞায়িত করে না।
একজন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন,
কিন্তু তিনি শুধুই একজন ক্যান্সার রোগী নন।
তিনি একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন কন্যা,
একজন কর্মজীবী মানুষ, একজন স্বপ্নবান মানুষ যার জীবনে এখনও অনেক গল্প বাকি।
তাই ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা মানুষটির
প্রয়োজন করুণা নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা, সাহস জোগানো এবং পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
ভয় নয়, সচেতনতা হোক শক্তি,
ক্যান্সার নিয়ে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু
ভয়কে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে মানুষ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতেই ভয় পায়।
বরং আমাদের ভাবনাটা হওয়া উচিত,
নিজের শরীরকে জানবো,
অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেব।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেব।
সময়মতো পরীক্ষা করব।
আর রোগ ধরা পড়লেও আশা হারাব না।
সামিরা আফরিনের তৃতীয় কেমো শেষ করার গল্প
তাই কেবল তাঁর ব্যক্তিগত যুদ্ধের গল্প নয়। এটি আমাদের জন্যও একটি বার্তা জীবন কখনো
কখনো কঠিন পরীক্ষা নেয়, কিন্তু সেই পরীক্ষার মধ্যেও মানুষ আশা ধরে রাখতে পারে।
আরোও পড়ুন: পোস্টপার্টাম স্ট্রোক: সন্তানজন্মের পরও যে বিপদ শেষ হয় না
আজ তাঁর প্রার্থনা শরীরে যেন আর কখনো ক্যান্সার
ফিরে না আসে।
আমরাও সেই প্রার্থনায় তাঁর পাশে দাঁড়াতে
পারি।
সৃষ্টিকর্তা সামিরা আফরিনকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। তাঁর চিকিৎসার
প্রতিটি ধাপ সহজ করুন এবং তাঁকে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে
দিন।
আর আমাদের প্রত্যেকের জন্য থাকুক একটি সহজ
অঙ্গীকার হোক নিজের শরীরকে অবহেলা করব না।
সচেতন থাকব, সময়মতো চিকিৎসা নেব।
কারণ নিজের যত্ন নেওয়াও নিজের প্রতি ভালোবাসারই
একটি রূপ।
Stay aware. Stay hopeful. Stay
positive, অন্ধকারের পর আলো আসবেই।
ঢাকা/টিএ