নারীর ‘না’ কী অনলাইনেও উপেক্ষিত?

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬

নারীর ‘না’ কী অনলাইনেও উপেক্ষিত?

প্রযুক্তির আড়ালে যৌন হয়রানি, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও সম্মতির অবমূল্যায়ন—নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।


একজন নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত কারও কাছ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা পেলেন। অস্বস্তি জানিয়ে উত্তর দেওয়া বন্ধ করলেন। কিন্তু বার্তা থামল না। কখনো ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া হলো, কখনো সম্পর্কের চাপ সৃষ্টি করা হলো, আবার কখনো প্রত্যাখ্যানের পরও দেখা করা কিংবা যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব আসতে থাকল।


এ ধরনের ঘটনা অনেকের কাছে হয়তো নিছক বিরক্তিকর আচরণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন নারী স্পষ্টভাবে অনিচ্ছা জানানোর পরও কেউ কেন তাঁর ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করার অধিকার নিজের বলে মনে করেন?


যৌন সহিংসতা নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণায় সাধারণত শারীরিক আক্রমণই বেশি গুরুত্ব পায়। অথচ প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে হয়রানির ধরনও বদলাচ্ছে। এখন ব্যক্তিগত ছবি, বার্তা, ভিডিও কিংবা অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমেও একজন নারীকে যৌন হয়রানি, ভয়ভীতি ও জবরদস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।


সম্প্রতি আইসল্যান্ডে পরিচালিত একটি গবেষণা এই বাস্তবতার উদ্বেগজনক দিক সামনে এনেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী জামা নেটওয়ার্ক ওপেন-এ। গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৪ হাজার ৩৫৮ জন নারীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা এবং অন্যান্য জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণ দেশটির নারীদের জীবনে উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থিত। বিশেষ করে তরুণীদের মধ্যে কয়েক ধরনের অভিজ্ঞতার হার বেশি।


আইসল্যান্ডের গবেষণায় কী জানা গেল?


২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী নারীদের ৩৪.৫ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতা অথবা অন্যান্য জবরদস্তিমূলক যৌন আচরণের অন্তত একটির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।


২৩ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে ৬০.৭ শতাংশ অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন ছবি বা বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই বয়সী ৫০.৩ শতাংশ নারী অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন ছবি পাঠানোর অনুরোধ পেয়েছেন। আর ৩৫.৬ শতাংশ নারী বারবার প্রত্যাখ্যান করার পরও দেখা করা কিংবা যৌন সম্পর্কের অনুরোধের মুখোমুখি হয়েছেন।


এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এগুলো আইসল্যান্ডের গবেষণার ফলাফল। বাংলাদেশের নারীদের ক্ষেত্রে একই হার প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, নারীর ব্যক্তিগত পরিসর ও সম্মতির সুরক্ষা কি সেই অনুপাতে নিশ্চিত হচ্ছে?


হার্ভার্ডের গবেষণা প্রতিবেদন


সহিংসতা শুধু শারীরিক আক্রমণ নয়


অনুমতি ছাড়া যৌন ছবি বা বার্তা পাঠানো, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া, যৌন মুহূর্ত গোপনে ধারণ করা কিংবা ব্যক্তিগত ছবি অন্যের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া—এসব আচরণ নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছবি প্রকাশের হুমকি ব্যবহার করে অর্থ, সম্পর্ক বা যৌন সুবিধা আদায়ের চেষ্টাও করা হয়।


সমস্যার একটি দিক হলো, এসব আচরণকে অনেক সময় মজা, প্রেমের প্রকাশ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্বাভাবিক ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রাপক অনিচ্ছা প্রকাশ করার পরও একই আচরণ চালিয়ে গেলে সেটি আর সাধারণ যোগাযোগের পর্যায়ে থাকে না।


প্রযুক্তি এখানে সহিংসতার একমাত্র কারণ নয়। বরং প্রযুক্তির সাহায্যে এমন আচরণ করা, পুনরাবৃত্তি করা কিংবা আরও মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়ে যেতে পারে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতে হলে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষের মানসিকতা ও আচরণ নিয়েও কথা বলতে হবে।


সম্পর্কের মধ্যেও সম্মতি জরুরি


যৌন সম্মতির প্রশ্নটি শুধু অপরিচিত মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। প্রেমের সম্পর্ক, দীর্ঘদিনের পরিচয় কিংবা বিয়ের সম্পর্কেও একজন মানুষের নিজের শরীর সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।


কেউ একবার সম্মতি দিয়েছেন বলে পরবর্তী প্রতিটি আচরণে তাঁর সম্মতি রয়েছে—এমন ধারণা ভুল। একইভাবে সম্পর্কের মধ্যে আছেন বলে একজন নারীকে সব ধরনের যৌন আচরণ মেনে নিতে হবে, এমন প্রত্যাশাও গ্রহণযোগ্য নয়।


আইসল্যান্ডের গবেষণায় সম্মতি ছাড়া যৌনমিলনের সময় কনডম খুলে ফেলা বা কনডম ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিজ্ঞতাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬ শতাংশ নারী এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ৫ শতাংশ নারী যৌন পরিস্থিতিতে সম্মতি ছাড়া শ্বাসরোধ বা শ্বাস নিতে বাধা দেওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন।


এই ফলাফল দেখায়, ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও সম্মতির বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছাড়া কোনো সম্পর্ককে নিরাপদ বলা যায় না।


বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্নগুলো আরও জরুরি


বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর যৌন সহিংসতার প্রকৃত ব্যাপ্তি বুঝতে নির্ভরযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বশীল গবেষণা প্রয়োজন। কতজন নারী অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা পান, কতজন ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের হুমকির মুখে পড়েন কিংবা কতজন পরিচিত মানুষের মাধ্যমে অনলাইনে হয়রানির শিকার হন—এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়া সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।


তবে পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা সমস্যাটিকে উপেক্ষা করার কারণ হতে পারে না। ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি, যৌন হয়রানি বা অনলাইন ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রথম দায়িত্ব।


বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২৫ ধারায় ডিজিটাল মাধ্যমে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি ও যৌন সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর উপাদান প্রকাশ বা প্রকাশের হুমকির মতো নির্দিষ্ট অপরাধের বিধান রয়েছে। তবে আইনগত সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটনার বিবরণ ও প্রযোজ্য আইন যাচাই করা জরুরি।


প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বার্তা ও অন্যান্য প্রমাণ নিরাপদে সংরক্ষণ করা, প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ জানানো এবং আইনগত সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


নারীর নিরাপত্তা শুধু নারীর দায়িত্ব নয়


অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে নারীদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন—কিন্তু পুরো দায়িত্ব তাঁদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়াল হয়ে যায়। একজন নারী কী পোশাক পরলেন, কাকে বন্ধু করলেন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতটা সক্রিয়—এসব দিয়ে তাঁর প্রতি হয়রানির দায় নির্ধারণ করা যায় না।


পরিবারে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের অন্যের ব্যক্তিগত সীমা, ইচ্ছা ও প্রত্যাখ্যানকে সম্মান করতে শেখানো জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তার পাশাপাশি সম্মতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুস্থ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার রোধে কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তাও প্রয়োজন।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ‘না’কে অপমান বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে অন্য মানুষের সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা।


প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগের পরিসর বাড়িয়েছে, কিন্তু মানুষের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেয়নি। একজন নারী তাঁর শরীর, ব্যক্তিগত ছবি, তথ্য ও সম্পর্কের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। সেই অধিকার বাস্তব জীবনেও যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অনলাইনেও তেমনই।


একটি সমাজ কতটা আধুনিক, তা শুধু তার প্রযুক্তির অগ্রগতি দিয়ে বিচার করা যায় না। বিচার করতে হয়, সেই সমাজে একজন মানুষ অন্যের স্বাধীনতা ও সম্মানকে কতটা গুরুত্ব দেয়। নারীর ‘না’ যখন অনলাইন ও অফলাইন—দুই জগতেই সমানভাবে সম্মানিত হবে, তখনই নিরাপদ সমাজ গড়ার পথে সত্যিকারের অগ্রগতি সম্ভব।

sidebar ad