“বাজেটের অঙ্ক বনাম মানুষের জীবন: কে জিতবে?”

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬

“বাজেটের অঙ্ক বনাম মানুষের জীবন: কে জিতবে?”

জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন শেষ হয়েছে। সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়ও ধীরে ধীরে থেমে এসেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—এই বাজেট কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবন বদলাবে?


প্রতি বছর বাজেট আসে হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাব নিয়ে। কোথাও রাজস্ব আয়, কোথাও উন্নয়ন ব্যয়, কোথাও ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা। কিন্তু একজন গৃহিণী, একজন চাকরিজীবী, একজন নারী উদ্যোক্তা কিংবা একজন তরুণ চাকরি-প্রত্যাশীর কাছে বাজেটের অর্থ একটাই—জীবন কি একটু সহজ হবে?


বাজেট মানে শুধু অর্থনীতি নয়, জীবনের গল্প


অনেকেই মনে করেন বাজেট একটি অর্থনৈতিক দলিল। বাস্তবে বাজেট একটি দেশের মানুষের স্বপ্ন, চাহিদা এবং ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।


একজন মা যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল ও সবজির দাম দেখে হিসাব মেলাতে পারেন না, তখন বাজেট তার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। একজন উদ্যোক্তা যখন ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন, তখন বাজেট তার বাস্তবতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করেও চাকরি খুঁজে পান না, তখন বাজেট তার ভবিষ্যতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।


এই কারণেই বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন সংখ্যার অঙ্কে নয়, মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে করতে হয়।


মূল্যস্ফীতি: মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ


গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগেছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে। বাজারে গেলে প্রতিদিনই যেন নতুন দামের মুখোমুখি হতে হয়।


একসময় যে পরিবার মাসিক ২০ হাজার টাকায় সংসার চালাত, আজ তাদের ৩০ হাজার টাকাও অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। তারা না পারে সাহায্য চাইতে, না পারে জীবনযাত্রার ব্যয় সহজে কমাতে।


সরকার নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—কবে বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাবে?


কারণ বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে কাঁচাবাজার, মুদি দোকান এবং ওষুধের দোকানে গিয়ে মানুষ কী অভিজ্ঞতা পাচ্ছে তার ওপর।


নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ কোথায়?


বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে। ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসা থেকে শুরু করে উৎপাদন, কৃষি, প্রযুক্তি—সবখানেই নারীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন।


কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নারী উদ্যোক্তা এখনো সহজে ঋণ পান না। ব্যাংকিং প্রক্রিয়া জটিল, জামানতের সমস্যা রয়েছে, ব্যবসা সম্প্রসারণে পর্যাপ্ত সহায়তাও অনেক সময় পাওয়া যায় না।


বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, এসব সুবিধা বাস্তবে কতটা নারী উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছাবে?


একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এখন আর সামাজিক দায়িত্ব নয়, অর্থনৈতিক প্রয়োজন।


তরুণদের প্রত্যাশা: চাকরি কোথায়?


বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু একই সঙ্গে এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।


বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু এর বাস্তব ফল হবে তখনই, যখন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হবে।


তরুণদের কাছে বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘আমি কি একটি সম্মানজনক চাকরি পাব?’


ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে কি?


বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যায় আলোচনায় রয়েছে। খেলাপি ঋণ, আর্থিক অনিয়ম এবং কিছু ব্যাংকের দুর্বল অবস্থা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।


নতুন বাজেটে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ।


কারণ একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া বিনিয়োগ, শিল্পায়ন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—কোনোটিই টেকসই হয় না।


মানুষ এখন শুধু একটি জিনিস দেখতে চায়—তাদের সঞ্চিত অর্থ নিরাপদ কি না।


সৃজনশীল অর্থনীতি: নতুন সম্ভাবনার দরজা


এবারের বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।


একসময় অর্থনীতি বলতে শুধু কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্য বোঝানো হতো। এখন ডিজিটাল কনটেন্ট, প্রকাশনা, সংস্কৃতি, মিডিয়া, ডিজাইন, চলচ্চিত্র, তথ্যপ্রযুক্তি—সবই অর্থনীতির অংশ।


এই খাতগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণও দ্রুত বাড়ছে।


যদি সঠিক নীতি সহায়তা দেওয়া যায়, তাহলে আগামী দশকে সৃজনশীল শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে।


বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: বাস্তবায়ন


বাংলাদেশে বাজেট নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনা নতুন নয়। অনেক সময় পরিকল্পনা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না।


একটি প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না, বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হয় না, কাঙ্ক্ষিত ফলও আসে না।


তাই অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর।


একটি ভালো বাজেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থা।


আমার দৃষ্টিতে-


বাজেটকে আমরা শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখি না। আমরা এটিকে দেখি একজন মায়ের রান্নাঘরের ব্যয়, একজন উদ্যোক্তার স্বপ্ন, একজন তরুণের চাকরির আশা এবং একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি দলিল হিসেবে।


জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। এতে সম্ভাবনা আছে, পরিকল্পনা আছে, লক্ষ্যও আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়।


যেদিন বাজারে গিয়ে মানুষ স্বস্তি পাবে, যেদিন উদ্যোক্তা সহজে ব্যবসা বাড়াতে পারবে, যেদিন তরুণরা চাকরি পাবে এবং পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হবে—সেদিনই বলা যাবে, বাজেট সফল হয়েছে।


সংখ্যার খাতায় নয়, মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারলেই বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা।


সাবিনা ইয়াসমীন

সম্পাদক ও প্রকাশক, রোদসী

নারী উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী

sidebar ad