নারীর নেতৃত্ব শুধু সংসদ, করপোরেট বোর্ডরুম কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি মেয়ের শিক্ষা, একজন উদ্যোক্তার ছোট ব্যবসা, কর্মক্ষেত্রে একজন নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কিংবা গ্রামের একজন নারীর নিজের আয় করার সুযোগ—সবকিছু মিলেই তৈরি হয় নারীর নেতৃত্বের পরিসর। সেই শিকড় থেকে বৈশ্বিক পরিসরে নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্পকে সামনে আনতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তৃতীয় আন্তর্জাতিক নারী পার্লামেন্ট ও আইকনিক উইমেন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬।
আয়োজকদের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘গ্রাস রুটস টু গ্লোবাল: উইমেন’স ইকোসিস্টেম’। অর্থাৎ নারীর অগ্রযাত্রাকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প হিসেবে না দেখে শিক্ষা, অর্থনীতি, নীতি প্রণয়ন, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, সামাজিক উদ্যোগ ও নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রের পারস্পরিক সংযোগের মধ্য দিয়ে দেখার চেষ্টা করা হবে।
৩০ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার, বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ঢাকার র্যাডিসন ব্লু-এর দ্য গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হবে। টিকিট বিক্রির তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এই আয়োজনের বিষয়ে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। আয়োজকদের ওয়েবসাইটে একই ‘তৃতীয় আন্তর্জাতিক নারী পার্লামেন্ট’ ও আইকনিক উইমেন অ্যাওয়ার্ড ২০২৬-এর তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এবং ভেন্যু হিসেবে র্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের দ্য গার্ডেন বলরুম উল্লেখ করা হয়েছে। জয়িতা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটেও ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এই আয়োজনের অংশগ্রহণের জন্য নারী উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বানের নোটিশ রয়েছে। ফলে প্রকাশিত পোস্টারের ৩০ অক্টোবরের তারিখটি ব্যবহার করার আগে আয়োজকদের কাছ থেকে সর্বশেষ তারিখটি নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
কেন এমন একটি আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ?
নারীর নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—শুধু নারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করলেই হবে না; সেই নেতৃত্ব বিকশিত হওয়ার মতো একটি সহায়ক পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশে নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে ক্রমেই এগিয়ে গেলেও নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে তাঁদের নানা ধরনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। ২০২৬ সালের একটি গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা সামাজিক রীতিনীতি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, সীমিত নেটওয়ার্ক এবং অবৈতনিক যত্নকাজকে নারীর নেতৃত্বের পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে তুলে ধরেছেন।
জাতিসংঘের তথ্যও দেখাচ্ছে, নারীর কাজের একটি বড় অংশ এখনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়। বাংলাদেশে ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নকাজের অর্থনৈতিক মূল্য ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান। এই কাজের ৮৫ শতাংশই করেছেন নারীরা।
অর্থাৎ নারীর নেতৃত্বের কথা বলতে গেলে শুধু মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নয়; পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতে নারীর অদৃশ্য অবদানকেও দৃশ্যমান করার প্রশ্নটি সামনে আসে।
‘গ্রাস রুটস টু গ্লোবাল’—শিকড়ের গল্প থেকে বৈশ্বিক নেতৃত্ব
এবারের প্রতিপাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। ‘গ্রাস রুটস টু গ্লোবাল’ ধারণাটি মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন নারী নেতার সাফল্যের পেছনে থাকতে পারে দীর্ঘদিনের স্থানীয় পর্যায়ের কাজ।
কেউ হয়তো প্রত্যন্ত অঞ্চলে মেয়েদের শিক্ষার জন্য কাজ করছেন। কেউ তৈরি করছেন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজার। কেউ প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন। আবার কেউ নীতি প্রণয়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলো একসময় বৃহত্তর পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। তাই নারীর নেতৃত্বকে শুধু ‘কয়েকজন সফল নারীর গল্প’ হিসেবে না দেখে একটি ইকোসিস্টেম বা পারস্পরিকভাবে যুক্ত পরিবেশ হিসেবে দেখা জরুরি।
আয়োজকদের ওয়েবসাইটে আন্তর্জাতিক নারী পার্লামেন্টকে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের নারী নেতা, নীতিনির্ধারক ও পেশাজীবীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বীকৃতির পাশাপাশি সংযোগ তৈরির সুযোগ
আন্তর্জাতিক নারী পার্লামেন্টের সঙ্গে যুক্ত আইকনিক উইমেন অ্যাওয়ার্ড আয়োজনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, নেতৃত্ব, নীতি প্রণয়ন, উদ্যোক্তা, ব্যবসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক প্রভাব, গণমাধ্যম, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ, করপোরেট উৎকর্ষ ও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা নারীদের এই স্বীকৃতির আওতায় বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ধরনের পুরস্কারের গুরুত্ব শুধু একজন নারীর হাতে একটি সম্মাননা তুলে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি স্বীকৃতি অনেক সময় একজন নারীকে তাঁর কাজ আরও বড় পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ দেয়, নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে এবং অন্য নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার জায়গা তৈরি করে।
২০২৩ সালের আইডব্লিউপি কনক্লেভে ৩৩টির বেশি দেশের ৫০ জনের বেশি নারী নেতার অংশগ্রহণের কথা আয়োজকদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের আয়োজনও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সামনে আসছে।
বাংলাদেশে নারীর নেতৃত্বের পরবর্তী অধ্যায়
বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তা ও কর্মজীবী নারীদের জন্য এমন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশের নারী উদ্যোক্তারা শুধু নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছেন না; তাঁরা অন্য নারীদের কর্মসংস্থানও তৈরি করছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান জয়িতা ফাউন্ডেশনও নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
একই সঙ্গে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে টেকসই করতে প্রয়োজন নীতি, অর্থায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ। জাতিসংঘের বাংলাদেশবিষয়ক জেন্ডার ইকুয়ালিটি ফ্যাক্টশিটেও নারীর সক্ষমতা, সম্পদ ও সুযোগের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি কাঠামোগত বাধা ও ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাই ‘নারীর নেতৃত্ব’ এখন আর কেবল একটি অনুপ্রেরণামূলক শব্দ নয়। এটি অর্থনীতি, নীতি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বিষয়।
ঢাকায় হতে যাওয়া তৃতীয় আন্তর্জাতিক নারী পার্লামেন্টের মূল বার্তাটিও তাই গুরুত্বপূর্ণ—নারীর সাফল্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে না দেখে তার পেছনের পুরো পরিবেশকে শক্তিশালী করতে হবে।
কারণ একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়ান, তখন শুধু তাঁর জীবনই বদলায় না। তাঁর পরিবার বদলায়, একটি কর্মক্ষেত্র বদলায়, একটি কমিউনিটি বদলায়। আর সেই পরিবর্তনের গল্প যখন স্থানীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছায়, তখন তৈরি হয় আরও বড় সম্ভাবনা।