নারীকে সবচেয়ে বেশি কীসের ভয় দেখায় সমাজ?

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬

ছবি: প্রতীকী
ছবি: প্রতীকী

নারীর জীবনের অনেক সিদ্ধান্তই যেন তার নিজের নয়; বরং পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী আর বৃহত্তর সমাজের চোখের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে নিতে হয়। জন্মের পর থেকেই তাকে শেখানো হয়—কীভাবে হাঁটতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, কী পরতে হবে, কখন হাসতে হবে, কখন চুপ থাকতে হবে। ছোট ছোট এই শিক্ষার আড়ালেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় এক অদৃশ্য ভয়—নিজের মতো করে বাঁচলে যদি কেউ কিছু বলে! সমাজ নারীকে সবচেয়ে বেশি যে ভয়টি দেখায়, তার নাম সম্ভবত ‘মানুষ কী বলবে’। 


একটি মেয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে করতে চাইলে সামনে আসে পরিবারের সম্মান হারানোর ভয়। বিয়ে করতে না চাইলে বলা হয়, বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। সন্তান নিতে দেরি হলে শুরু হয় নতুন প্রশ্ন। অর্থাৎ নারী জীবনের যে পথই বেছে নিক, তার সামনে কোনো না কোনো ভয় দাঁড় করানোর জন্য সমাজ যেন প্রস্তুতই থাকে।


নিরাপত্তার ভয়


নারীর প্রতি সহিংসতা বাস্তব। যৌন হয়রানি, নির্যাতন, নিপীড়ন কিংবা রাস্তাঘাটে অনিরাপত্তার অভিজ্ঞতা অনেক নারীর জীবনেই সত্য। তাই নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন সেগুলো ধীরে ধীরে নারীর স্বাধীনতার সীমারেখায় পরিণত হয়, তখন সমস্যা তৈরি হয়। অপরাধীর আচরণ বদলানোর বদলে নারী কোথায় যাবে, কখন ফিরবে, কী পরবে—এসব নিয়ন্ত্রণ করাই যেন সহজ সমাধান হয়ে ওঠে। নিরাপদ সমাজ তৈরির দায়িত্ব তখন নারীর চলাফেরার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।


সম্মান হারানোর ভয়


নারীর সঙ্গে পরিবারের ‘সম্মান’কে জুড়ে দেওয়া সমাজের অন্যতম শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। একজন পুরুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে যেখানে অনেক সময় তার নিজের বিষয় হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নারীর সিদ্ধান্তকে প্রায়ই পরিবারের মর্যাদার সঙ্গে মাপা হয়। সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কাকে ভালোবাসবে, কাকে বিয়ে করবে, কোথায় কাজ করবে—এসব সিদ্ধান্তেও তার নিজের ইচ্ছার চেয়ে পরিবারের সামাজিক অবস্থান বড় হয়ে ওঠে। একটি মেয়ে নিজের জীবনের জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাই তাকে শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, পরিবারের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও ভাবতে হয়।

ফলে একসময় তার নিজের ভেতরেই প্রশ্নটি বদলে যায়—“আমি কী চাই?” নয়, “আমাকে কী চাইতে দেওয়া হবে?”


ব্যর্থ হওয়ার ভয়


নারীকে সফল হতে বলা হয়, কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার অধিকার সবসময় দেওয়া হয় না। কর্মজীবনে কোনো নারী ব্যর্থ হলে তার সিদ্ধান্তের চেয়ে অনেক সময় তার নারী পরিচয়টিই আলোচনায় আসে। ক্যারিয়ারে ধাক্কা খেলে বলা হতে পারে, “সংসার করলে এসব হতো না।” ব্যবসায় ক্ষতি হলে প্রশ্ন উঠতে পারে, “মেয়েদের আবার এসব ঝুঁকি নেওয়ার কী দরকার?” কর্মক্ষেত্রে একটু বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে তাকে বলা হতে পারে ‘অতিরিক্ত স্বাধীন’।


বয়সের ভয়


একজন নারী হয়তো ত্রিশ বছর বয়সে নিজের ক্যারিয়ার দাঁড় করাচ্ছেন, চল্লিশে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করছেন, কিংবা পঞ্চাশে এসে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ করার সাহস করছেন। কিন্তু সমাজের চোখে তার বয়স তখনও একটি হিসাব। নারীর বয়সকে তার সক্ষমতা কিংবা সম্ভাবনার মাপকাঠি বানিয়ে ফেলার এই প্রবণতা তাকে নিজের জীবন নিজের গতিতে বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।


একা থাকার ভয়


একজন নারী একা থাকলে সমাজের অনেকেরই অস্বস্তি হয়। অবিবাহিত নারী, তালাকপ্রাপ্ত নারী কিংবা নিজের সিদ্ধান্তে একা থাকা নারীকে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। যেমন—একা থাকবে কীভাবে?, বুড়ো বয়সে কে দেখবে?— এসব প্রশ্নের মধ্যে উদ্বেগ যেমন আছে, তেমনি আছে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ধারণা—একজন নারী একা হলে তার জীবন অসম্পূর্ণ। 


অথচ একজন মানুষের একা থাকা আর একাকী হওয়া এক বিষয় নয়। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, নিজের সিদ্ধান্তে জীবন কাটানোও একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতি হতে পারে।


‘ভালো মেয়ে’ না হওয়ার ভয়


সমাজ নারীর জন্য বহুদিন ধরেই একটি আদর্শ চরিত্র তৈরি করে রেখেছে—ভদ্র, শান্ত, সহনশীল, ত্যাগী, সংসারী এবং সবার কথা শোনে এমন একজন নারী। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখানো হয়, ভালো মেয়েরা বেশি প্রতিবাদ করে না, রাগ দেখায় না, নিজের আগে অন্যের কথা ভাবে।


এই ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার সংজ্ঞা থেকে একটু বেরিয়ে এলেই শুরু হয় নানা তকমা। সে যদি প্রতিবাদ করে, তাকে বলা হয় ‘জেদি’। নিজের অধিকার দাবি করলে ‘অহংকারী’। সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এলে ‘স্বার্থপর’।  নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিলে ‘বেশি স্বাধীন’। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে ‘সংসারী নয়’।


এভাবে ধীরে ধীরে একজন নারী নিজের কণ্ঠস্বরকে ছোট করতে শেখে। নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার আগে ভাবে, লোকজন কী ভাববে?।  একসময় সে ভুলেই যেতে পারে—না বলা তারও অধিকার, নিজের মত থাকা তারও অধিকার, আর নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তারই।


সমাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো তখনই, যখন তাকে আর বাইরে থেকে ভয় দেখাতে হয় না; নারী নিজেই নিজের ভেতরে সেই ভয় বহন করতে শুরু করে।


ঢাকা/আরএস

sidebar ad