‘‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না; বরং সমাজের নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নারী হয়ে ওঠে। ’’— আপনি হয়তো সিমোন দ্য বোভোয়ার এই কথাগুলোর সঙ্গে পরিচিত। এবার বলুনতো আমাদের সমাজে এই কথার গুরুত্ব কতখানি?
আমাদের সমাজে নারীর সম্মানকে অনেক সময় তার পোশাক, চলাফেরা, সম্পর্ক, যৌনতা, বিয়ে এবং পারিবারিক আচরণের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়। যেন পরিবারের সামাজিক মর্যাদা বহন করার প্রধান দায়িত্ব নারীর। একজন পুরুষ ভুল করলে সেটিকে অনেক সময় তার ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী ভুল করলে সেটি খুব সহজেই হয়ে যায় পরিবারের ‘সম্মানের’ বিষয়।
এই দ্বৈত মানদণ্ডই সমস্যার মূল
নারী কোথায় গেলেন, কার সঙ্গে কথা বললেন, কী পরলেন, কখন বাড়ি ফিরলেন—এসব আচরণের ওপর পরিবারের সম্মান নির্ভর করে বলে ধারণা তৈরি করা হলে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়। এর ফলে সম্মান আর ব্যক্তিগত মূল্যবোধ থাকে না; হয়ে ওঠে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের একটি ব্যবস্থা।
নারীকে ভয় দেখানোর কারণ
সমাজের সব মানুষ যে সচেতনভাবে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে চান, এমন নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধারণাই অনুসরণ করেন। কিন্তু সেই ধারণার ফল একই হতে পারে—নারী নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে পড়েন। সম্মান হারানোর ভয় দেখিয়ে মূলত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা হয়।
আনুগত্য
যে নারী জানেন, তার একটি সিদ্ধান্তের কারণে শুধু তাকেই নয়, পুরো পরিবারকে সামাজিক প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে, তিনি অনেক সময় নিজের ইচ্ছা দমন করেন। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে অন্যদের হাতে চলে যায়।
সামাজিক নিয়ম মেনে চলা
একটি সমাজে কিছু আচরণকে ‘ভালো মেয়ের’ আচরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই সীমার বাইরে গেলেই ‘বেপরোয়া’, ‘অশালীন’, ‘খারাপ’ কিংবা ‘পরিবারের মুখ পুড়িয়েছে’—এ ধরনের তকমা দেওয়া হয়। ফলে শাস্তির ভয় ছাড়াই সামাজিক চাপ নারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।
প্রতিবাদ কমিয়ে দেওয়া
কোনো নারী অন্যায়, বৈষম্য বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে চাইলে তাকে বলা হতে পারে, ‘চুপ থাকো, পরিবারের সম্মান যাবে।’
এই একটি বাক্যই অনেক অন্যায়কে বছরের পর বছর আড়াল করে রাখতে পারে।
সম্মানের ভয় কখন নির্যাতনের ঢাল হয়ে যায়?
সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গাটি তৈরি হয় তখন, যখন ‘সম্মান’ অন্যায়কে রক্ষা করার যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়। কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে তাকে বলা হয়, বিষয়টি বাইরে জানালে পরিবারের বদনাম হবে। বিয়েতে সমস্যা হলে বলা হয়, আত্মীয়স্বজন জানলে কী হবে। যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলে অনেক সময় ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করা হয়—সে সেখানে কেন গিয়েছিল, কী পরেছিল, কার সঙ্গে ছিল। অর্থাৎ অপরাধীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন না তুলে নারীর আচরণকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এভাবে ‘সম্মান’ শব্দটি কখনো কখনো ন্যায়বিচারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সম্মান কী মানুষের আচরণে, নাকি নারীর নিয়ন্ত্রণে?
একটি পরিবারের সম্মান কী সত্যিই নির্ভর করবে তার মেয়ে কী পোশাক পরল, কখন বাড়ি ফিরল বা কাকে ভালোবাসল তার ওপর? নাকি পরিবারের সম্মান নির্ভর করা উচিত—সেই পরিবার তার সদস্যদের কতটা সম্মান করে, দুর্বল মানুষের পাশে কতটা দাঁড়ায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ কতটা করে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের স্বাধীনতাকে কতটা মূল্য দেয় তার ওপর?
সময় এখন সম্মানের সংজ্ঞা বদলানোর। সব শেষে বলা যায়, একজন নারী নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিলে পরিবারের সম্মান নষ্ট হয় না। বরং তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকে সম্মান করাই একটি পরিবারের মানবিকতার পরিচয় হতে পারে।
ঢাকা/আরএস