“তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের মতো পৃথিবীতে এমন বালাই আর নাই। শোভাও নাই, কোনো কাজেও লাগে না। স্নেহও উদ্রেক করে না, তাহার সঙ্গসুখও বিশেষ প্রার্থনীয় নহে”—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছুটি গল্পে কিশোর ফটিকের এমন বর্ণনা পড়তে গিয়ে বুকের ভেতর যেন কোথাও হালকা একটা ব্যথা টের পাওয়া যায়। মনে হতে পারে, কৈশোর বুঝি চিরকালই ছিল ভুল–বোঝাবুঝির এক অধ্যায়। দুরন্ত, অস্থির, বেপরোয়া কিংবা অতিরিক্ত আবেগী—এমন নানা বিশেষণে আমরা তাদের বিচার করে ফেলি।
কিন্তু সত্যিই কি কৈশোর মানেই সমস্যা? নাকি এই সময়টাকে আমরা কখনোই ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারিনি?
সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সকে আমরা কৈশোরকাল বলে জানি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, কৈশোরের সময়কাল প্রায় ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ এর সূচনা হয় বয়ঃসন্ধির মাধ্যমে, আর সমাপ্তি ঘটে যখন একজন মানুষ সামাজিকভাবে প্রাপ্তবয়স্কের দায়িত্ব ও অধিকার অর্জন করে।
এই বয়সটাকে ঘিরে অভিযোগেরও যেন শেষ নেই। তারা নাকি খুব বেশি উদ্বিগ্ন, বিষণ্ন, মোবাইল–আসক্ত কিংবা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি বেপরোয়া। কিন্তু সত্যিই কি চিত্রটা এমন?
কৈশোরকে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করেছেন জেনিফার ফাইফার, যিনি পেশায় একজন নিউরোসায়েন্টিস্ট। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
“কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করাই আমার পেশা। পাশাপাশি আমি তাদের হরমোন, সামাজিক জীবন এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করি। শুরুতেই আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম তাদের অসাধারণ মস্তিষ্ক দেখে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজ তাদের সম্পর্কে যে গল্প বলে, তা মোটেও সুন্দর নয়। তাদের কিছুটা বাঁকাভাবে বিচার করা এবং তাদের সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার যে প্রচলন রয়েছে, তা মোটেও সুখকর নয়। এই মনোভাব এমন এক নেতিবাচক পরিস্থিতির জন্ম দেয়, যেখানে আদতে কারওই কোনো লাভ হয় না। তাই বিজ্ঞানের আলোয় সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রচলিত ধারণা বদলে দেওয়াই আমার লক্ষ্য।”
তাঁর মতে, কৈশোর কোনো সংকটের নাম নয়; বরং এটি বিকাশ ও সম্ভাবনার এক রূপান্তরমূলক সময়। এই সময়টাকে যদি আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পারি, তাহলে তরুণদের সম্ভাবনাও আরও সুন্দরভাবে বিকশিত হবে। তাই কৈশোরকে নতুন করে পড়ার সময় এসেছে—অভিযোগের চোখে নয়, বোঝাপড়ার চোখে।
বয়ঃসন্ধি: শুধু শরীর নয়, বদলায় ঘুমও
বয়ঃসন্ধি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে সবাই যায়। এ সময় মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন হরমোন শরীরে নানা পরিবর্তন নিয়ে আসে। ত্বক, চুল, কণ্ঠস্বর, উচ্চতা, শরীরের গঠন—সবকিছুতেই পরিবর্তন দেখা দেয়।
তবে একটি পরিবর্তনের কথা হয়তো অনেকেরই অজানা। তা হলো ঘুমের অভ্যাসের পরিবর্তন। এ সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ বা জৈবিক ঘড়ি আগের তুলনায় এক থেকে দুই ঘণ্টা পরে ক্লান্তির অনুভূতি তৈরি করে। তাই রাতে দেরি করে জেগে থাকা সব সময় অলসতার লক্ষণ নয়; এটি অনেকাংশেই তাদের শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফল।
হরমোনই কি সব সমস্যার কারণ?
অনেকেই মনে করেন, হরমোনই কিশোরদের মানসিক সমস্যার প্রধান কারণ। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সমবয়সীদের তুলনায় আগে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছে যায়, বিশেষ করে মেয়েরা, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। অর্থাৎ হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি সরাসরি এই ঝুঁকি বাড়ায় না। বরং শরীরের এমন নাটকীয় পরিবর্তনকে তারা নিজেরা কীভাবে দেখছে এবং সমাজ তাদের কীভাবে দেখছে—এসবই মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
এ ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয়কে দায়ী করেছেন জেনিফার ফাইফার। সেটি হলো ‘অ্যাডাল্টিফিকেশন’ (Adultification) বা শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করার প্রবণতা। বয়ঃসন্ধির পর অনেক কিশোরীকে দেখতে বয়সের তুলনায় বড় মনে হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতি সমাজের আচরণ ও প্রত্যাশা বদলে যায়। ফলে তারা অযথা বিচার, ভুল ধারণা কিংবা বৈষম্যের শিকার হতে পারে।
কিশোরদের মস্তিষ্ক কি অপরিণত?
আমাদের মধ্যে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, কিশোরদের মস্তিষ্ক অপরিণত বলেই তারা ভুল সিদ্ধান্ত নেয় বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ প্রায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত চলতে থাকে। আর যদি পর্যাপ্ত সময় ও তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে প্রায় ১৬ বছর বয়স থেকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই দক্ষতা দেখাতে পারে। অর্থাৎ তাদের মস্তিষ্ক অপরিপক্ব নয়; বরং জীবনের এই পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তা গড়ে উঠছে।
সোশ্যাল মিডিয়াই কি সব সমস্যার মূল?
বর্তমানে কিশোরদের নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটা সত্য যে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়েছে। কিন্তু জেনিফার ফাইফারের মতে, এর জন্য শুধু স্মার্টফোনকে দায়ী করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
অনেক গবেষণার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক সমস্যার সম্পর্ক খুবই দুর্বল। অর্থাৎ এটি হয়তো বিদ্যমান মানসিক সমস্যার একটি ইঙ্গিত মাত্র, সমস্যার মূল কারণ নয়।
তাহলে আসল প্রভাব কোথায়?
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলো—পরিবার, বন্ধু, সম্পর্ক, স্কুলের পরিবেশ এবং বুলিং। বাবা-মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, যদি বাবা-মায়ের নিজেদের মানসিক সমস্যা থাকে, তাহলে সন্তানদের মধ্যেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি বেড়ে যায়।
তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
জেনিফার ফাইফারের মতে, এই সমস্যার সমাধানে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে তাদের মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে। তাদের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে এবং পাশে দাঁড়াতে হবে।
বয়ঃসন্ধিকালীন ঝুঁকি ও প্রচলিত ভুল ধারণা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে এই সময়টাকে অনেকটাই সহজ ও স্বস্তিদায়ক করে তোলা সম্ভব। এটি নিয়ে ভয় বা লজ্জা নয়, প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা।
তাদের জন্য মানসিকভাবে নিরাপদ একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বোঝাতে হবে, আবেগ, ব্যর্থতা কিংবা কঠিন সময়—এসবই জীবনের স্বাভাবিক অংশ। আর এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
সন্তানকে ভালো রাখতে চাইলে বাবা-মায়ের মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বর্তমান প্রজন্মের ভালো থাকার বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে তাদের ওপর।
সবশেষে, আমাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। তাদের সবকিছু নিয়েই নেতিবাচক সমালোচনা বা দোষারোপ করা বন্ধ করতে হবে। আমরা যদি ক্রমাগত বলতেই থাকি যে এই প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তবে তারা কীভাবে নিজেদের সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখবে?
তাদের ক্রমবিকাশমান সক্ষমতাকে আমাদের সম্মান করতে হবে। তাদের যেমন আমাদের ভালোবাসা ও সমর্থনের প্রয়োজন, তেমনি আমাদেরও তরুণদের প্রয়োজন। দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার যে ক্ষমতা তাদের রয়েছে, তা এক অসাধারণ শক্তি।
জেনিফার ফাইফার যথার্থই বলেছেন, “কিশোর-কিশোরীরা কোনো সমস্যা নয়, যার সমাধান খুঁজতে হবে; বরং তারাই আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক।”
তথ্যসূত্র: জেনিফার ফাইফারের টেড টক