অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীকে ‘ডাইনি’ বানানোর ইতিহাস

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

স্বামী মারা যাওয়ার পর ক্যাথরিন হ্যারিসন হয়ে উঠেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ওয়েদার্সফিল্ডের সবচেয়ে ধনী নারী। কিন্তু অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার পর নিজের ভাগ্য নিয়ে বসে থাকেননি তিনি। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া খামারের দায়িত্ব নিজেই কাঁধে তুলে নেন। শুরু করেন পশুপালনসহ নানা কাজ। পাশাপাশি শখ হিসেবে বিয়ার তৈরি, সুতা কাটা ও মৌমাছি পালন করতেন। মধু ও মৌমাছির মোমের বিনিময়ে মোমবাতি সংগ্রহ করতেন। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন আত্মপ্রত্যয়ী, স্পষ্টভাষী ও বুদ্ধিমান এক নারী।


আজকের ইন্টারনেট দুনিয়ার নানা প্রান্তে হ্যারিসনের এসব আগ্রহ যেন নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বহু বছর ধরেই ক্রাফট ব্রুয়াররা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি বিয়ারের প্রচার করছেন। শহরাঞ্চলেও বাড়ছে মৌমাছি পালনের প্রবণতা। আবার মানসিক প্রশান্তি ও মননচর্চার উপায় হিসেবে মানুষ ফিরে যাচ্ছে সুতা কাটা, বোনা ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের দিকে।


কিন্তু হ্যারিসন ছিলেন একজন সিঙ্গেল মা—তিন কন্যার জননী। আর আজকের তথাকথিত ‘ট্র্যাডওয়াইফ’ বা প্রচলিত গৃহিণী-আদর্শের বিপরীতে তিনি মনে করতেন, তার জীবনে একজন পুরুষের প্রয়োজন নেই।


তার স্বাধীনতা, বিপুল সম্পদ এবং জ্যোতিষচর্চা—সবকিছু মিলিয়ে তার শখগুলো একজন ‘আদর্শ স্ত্রী’র চেয়ে বরং একজন ‘ভালো ডাইনি’র বৈশিষ্ট্যের মতোই মনে হতে পারে।


দুর্ভাগ্যজনকভাবে হ্যারিসন এমন এক সময়ে বেঁচে ছিলেন, যখন নিউ ইংল্যান্ডের উপনিবেশগুলোতে ভয়, কুসংস্কার ও সন্দেহ ছিল প্রবল। সেই সময়ে কোনো নারী যদি পিউরিটান ও পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক নিয়ম মেনে চলতে অস্বীকার করতেন, তাহলে তাকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করার ঝুঁকি ছিল।


১৬৬৮ সালের কথা, সালেমের ডাইনি নিধনের বিচার শুরু হওয়ার দুই দশকেরও বেশি আগে এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে, হ্যারিসনকে ডাইনি বিদ্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।


স্বাধীনতাই কী হয়ে উঠেছিল অপরাধ?

আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষকে ডাইনি হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন নারী। ডাইনি নিধনের পেছনে অনেক কারণ ছিল—পুরুষতন্ত্র, অর্থনৈতিক সংকট, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা। তবে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতাও তাদের ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল। কখনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের কারণে, কখনো নিজের কাজের দক্ষতার কারণে কোনো নারী যখন স্বনির্ভর হয়ে উঠতেন, তখনই তিনি সমাজের চোখে ‘অস্বাভাবিক’ হয়ে উঠতেন।


হ্যারিসনের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ অবশ্য খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু পরের বছর তাকে আবার আদালতে হাজির হতে হয়।


অভিযোগপত্রে বলা হয়, শয়তানের সঙ্গে তার ‘যোগাযোগ’ রয়েছে এবং তার সাহায্যে তিনি ‘স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে’ নানা কাজ করতে পারেন। তার বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ গণনা, চিকিৎসা এবং জাদুবিদ্যার অভিযোগ আনা হয়। কেউ কেউ দাবি করেন, রাতে তারা বিছানায় হ্যারিসনের ছায়া বা অবয়ব দেখেছেন।


অভিযোগ ছিল, নিজের কাজকে আরও লাভজনক করা এবং প্রতিবেশীদের ব্যবসায় ক্ষতি করার জন্য তিনি শয়তানের সাহায্য চেয়েছিলেন।


তার সুতা কাটার দক্ষতাও সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কয়েকজন পুরুষ অভিযোগ করেন, তিনি তাদের জাদু করে তাঁত বোনার কাজে বাধা দিয়েছেন। এমনকি এক দর্জি দাবি করেন, হ্যারিসনের জাদুর কারণে তিনি একটি পোশাকের হাতা পরপর সাতবার ভুলভাবে সেলাই করেছিলেন।


ঈর্ষা, কুসংস্কার আর পুরুষতন্ত্র


বিচারের সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, হ্যারিসনের বিরুদ্ধে ডাইনি হওয়ার অভিযোগের পেছনে শক্ত কোনো প্রমাণ ছিল না। বরং প্রতিবেশীদের ছোটখাটো বিরোধ, ঈর্ষা ও কুসংস্কারই এসব অভিযোগের প্রধান ভিত্তি ছিল।


শেষ পর্যন্ত হ্যারিসনকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও দুর্বল প্রমাণের কথা বিবেচনা করে ম্যাজিস্ট্রেট তার মৃত্যুদণ্ড দেননি। বরং তাকে ওয়েদার্সফিল্ড থেকে নির্বাসিত করা হয়। হ্যারিসনের ঘটনা নিউ ইংল্যান্ডের উপনিবেশগুলোতে ডাইনি নিধনের একটি বড় প্রবণতার প্রতীক।


মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্যারল এফ. কার্লসেন এসব বিচারের বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, সেই সময়ে নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার পাওয়া ছিল বিরল। কিন্তু যারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতেন, তাদের ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি।


যেসব পরিবারে কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী ছিল না, সেসব পরিবারের নারীরা অভিযুক্ত নারীদের ৬৪ শতাংশ, দোষী সাব্যস্ত নারীদের ৭৬ শতাংশ এবং মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নারীদের ৮৯ শতাংশ ছিলেন।


হ্যারিসনের বিচারসংক্রান্ত নথিতে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বারবার উল্লেখ আরেকটি বিষয় সামনে আনে।


কার্লসেনের মতে, ধাত্রী, চিকিৎসা-সহায়তাকারী ও নারী ধর্মীয় নেতাদের মতো যেসব নারী নিজেদের প্রচলিত দক্ষতাকে অর্থ উপার্জনের কাজে ব্যবহার করতেন, তারা পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার জায়গায় চলে যেতেন। আর সেখান থেকেই তারা ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তেন।

ইউরোপেও নারীর কাজকে ডাইনি বিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল।


কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ফিলিপা কার্টারের এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৬ ও ১৭ শতকে নারীদের যেসব পেশায় কাজের সুযোগ ছিল—চিকিৎসা, খাদ্য প্রস্তুত, দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি এবং পশুপালন—এসব কাজই তাদের ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিত।

কার্টার শুধু আদালতের নথির ওপর নির্ভর করেননি। কারণ আদালতের নথিতে ঘটনাগুলোর একপাক্ষিক চিত্র পাওয়া যায়। তিনি চিকিৎসক ও জ্যোতিষী রিচার্ড ন্যাপিয়ারের নথিপত্রও বিশ্লেষণ করেন। ১৫৯৭ থেকে ১৬৩৪ সালের মধ্যে ন্যাপিয়ার অন্তত ১ হাজার ৭১৪টি ‘জাদুতে আক্রান্ত’ হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করেছিলেন।


দুগ্ধ খামার বা চিকিৎসার মতো কাজগুলো স্বাভাবিকভাবেই রোগ বা পচনের ঝুঁকিতে থাকত। কিন্তু সেই সময় এসব স্বাভাবিক ঘটনাকেও অনেক সময় ‘খারাপ জাদু’র ফল হিসেবে দেখা হতো। নষ্ট রক্তে ক্ষত পচে যাওয়া কিংবা নষ্ট দুধে দুর্গন্ধযুক্ত পনির তৈরি হওয়াকেও জাদুর প্রভাব বলে মনে করা হতো।


একজন নারীর দৈনন্দিন কাজের জন্য তাকে প্রায়ই এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, বেকারি থেকে বাজারে ছুটতে হতো। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই ঘন ঘন যোগাযোগও তাকে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার এবং শেষ পর্যন্ত ‘ডাইনি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিত।


নারী চিকিৎসকদেরও ‘ডাইনি’ বলা হতো


ইউরোপে নারী চিকিৎসকদের কাজও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে গির্জা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—ডাইনি বিদ্যা হিসেবে চিহ্নিত করত।


একসময় স্থানীয় সমাজে ‘জ্ঞানী নারী’ -দের যথেষ্ট সম্মান ছিল। তারা ভেষজ ও প্রার্থনার মাধ্যমে অসুস্থতার চিকিৎসা করতেন, সন্তান প্রসবে সহায়তা করতেন, ছোটখাটো অস্ত্রোপচার করতেন এবং হাড়ের চিকিৎসাও জানতেন।


কিন্তু ১৩২৫ সালে পোপ জন ২২তম প্যারিসের বিশপ স্টিফেনকে একটি চিঠি লিখে সতর্ক করেন—আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া যেসব নারী চিকিৎসা করছেন, তারা আসলে ডাইনি বিদ্যা চর্চা করছেন। তিনি এসব নারীর চিকিৎসা বন্ধ করার আহ্বান জানান।


পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে কে চিকিৎসা পড়তে ও চিকিৎসা করতে পারবেন, সে বিষয়ে নিয়ম আরও কঠোর হয়। আর নারীদের যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগ ছিল না, তাই তারা কার্যত চিকিৎসা পেশা থেকেও বাদ পড়ে যান।


অ্যাগনেস স্যাম্পসনের পরিণতি

স্কটল্যান্ডের নর্থ বারউইকে ১৫৯০ সালের ডাইনি বিচারে অ্যাগনেস স্যাম্পসন নামে আরেক বিধবা নারীর বিচার হয়। তিনিও ছিলেন একজন চিকিৎসক বা ‘হিলার’।


রাজা ষষ্ঠ জেমসের আমলে অনুষ্ঠিত ওই বিচারে স্যাম্পসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, তিনি নাকি ডাইনিদের একটি সমাবেশে শয়তানের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি অভিযোগ করা হয়, ডাইনিরা জাদুর মাধ্যমে ঝড় সৃষ্টি করে রাজা জেমসের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। রাজা তখন নতুন স্ত্রী প্রিন্সেস অ্যানকে নিয়ে ডেনমার্ক-নরওয়ে থেকে দেশে ফিরছিলেন।


জেমস স্যাম্পসনকে নির্যাতনের নির্দেশ দেন। প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখে তিনি শেষ পর্যন্ত স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন। তার বিরুদ্ধে আনা ৫৩টি অভিযোগের অর্ধেকেরও বেশি ছিল তার চিকিৎসা বা রোগ নিরাময়ের কাজকে কেন্দ্র করে।


স্যাম্পসনের ঘটনা দেখায়, কীভাবে নারীর শ্রম ও দক্ষতাকে ‘ডাইনি বিদ্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।


‘ডাইনি’ শব্দটি কী আজও নারীর বিরুদ্ধে অস্ত্র?


হ্যারিসনের মতো নারীরা যে সামাজিক কাঠামো তাদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সীমিত করেছিল, তাকে অমান্য করেছিলেন। তারা উত্তরাধিকারব্যবস্থার সেই নিয়মও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যা সম্পত্তিকে পুরুষের হাতে রাখার জন্য তৈরি ছিল।


ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জন করা নারীদের জন্য সবসময় নিরাপদ ছিল না।


আজকের দিনে আধুনিক ‘উইচক্র্যাফট’ বা ডাইনি-সংস্কৃতি—ট্যারোট কার্ড থেকে জ্যোতিষচর্চা পর্যন্ত—নারীর অন্তর্দৃষ্টি, স্বাধীনতা ও নিজের মতো করে বাঁচার প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে। কিন্তু ‘ডাইনি’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সহিংসতা ও হুমকির ইতিহাস এখনও পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।


নারীদের আর আগের মতো আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়েও দেখা গেছে, কোনো নারীর ক্ষমতা বা প্রভাবকে খাটো করতে তাকে ‘ডাইনি’ বলে আক্রমণ করা হয়।


যেমন, গত জুনে মেলবোর্নের বিভিন্ন বিলবোর্ডে ভিক্টোরিয়ার প্রিমিয়ার জাসিন্তা অ্যালানকে কালো, সূচালো টুপি পরা ‘ডাইনি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।


ইতিহাস তাই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আনে—

যখন কোনো নারী নিজের ক্ষমতা, সম্পদ ও স্বাধীনতার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন, তখন তাকে থামানোর জন্য সমাজ কি এখনও নতুন কোনো ‘ডাইনি’র গল্প তৈরি করে?


সময় বদলেছে, পদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু কোনো নারীর ক্ষমতা কেড়ে নিতে তাকে ‘ডাইনি’ বানানোর প্রবণতা হয়তো পুরোপুরি বদলায়নি।


সূত্র:   দ্য গার্ডিয়ান


ঢাকা/আরএস

sidebar ad