কখনো প্যানিক অ্যাটাক হলে আপনার মনে হতে পারে, এই বুঝি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। বুক ধড়ফড় করতে থাকে, শ্বাস দ্রুত ও অগভীর হয়ে যায়, মাথা ঘোরে, এমনকি চোখেও ঝাপসা দেখতে পারেন। তবে আশার কথা হলো, প্যানিক অ্যাটাকের কারণে সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া খুবই বিরল।
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শরীরে এমন কিছু তীব্র শারীরিক পরিবর্তন ঘটে, যার কারণে মনে হতে পারে আপনি পড়ে যাবেন বা জ্ঞান হারাবেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞান হন না। কেন এমন অনুভূতি হয়, তা বুঝতে পারলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
প্যানিক অ্যাটাকে কেন মনে হয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন?
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শরীরের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ বা বিপদ মোকাবিলা করার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। আপনার মস্তিষ্ক বাস্তব কোনো বিপদ কিংবা আশঙ্কাকে হুমকি হিসেবে ধরে নেয় এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে।
এর ফলে শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য—
হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়
রক্তচাপ বাড়ে
শ্বাস দ্রুত হয়ে যায়
শরীরের পেশিগুলোর দিকে বেশি রক্তপ্রবাহ যেতে থাকে
একই সময়ে আপনি হাইপারভেন্টিলেশন করতে পারেন। অর্থাৎ স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত ও গভীরভাবে শ্বাস নিতে শুরু করেন। এর ফলে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমে যেতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে—
মাথা ঘোরা
হালকা লাগা বা ভারসাম্য হারানোর অনুভূতি
হাত-পা বা মুখে ঝিনঝিন করা
চোখে ঝাপসা দেখা
নিজের শরীর বা আশপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হওয়া
এই অনুভূতিগুলো অনেকটা অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগের অনুভূতির মতো। তাই মনে হতে পারে, যেকোনো মুহূর্তে জ্ঞান হারাবেন।
প্যানিক অ্যাটাক কি সত্যিই অজ্ঞান করে দিতে পারে?
সাধারণত নয়
প্যানিক অ্যাটাকের সময় সাধারণত রক্তচাপ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, অজ্ঞান হওয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো পর্যায়ে রক্তচাপ নেমে যেতে পারে। অর্থাৎ প্যানিক অ্যাটাকের সময় শরীরের যে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া সক্রিয় হয়, তা সাধারণত অজ্ঞান হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায় না; বরং কমায়।
তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে। কারও ক্ষেত্রে ভ্যাসোভ্যাগাল প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তীব্র ভয়, মানসিক চাপ, ব্যথা বা আবেগের কারণে হঠাৎ হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ কমে গেলে সাময়িকভাবে জ্ঞান হারানো সম্ভব। প্যানিক অ্যাটাকের সময় এমন ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি ঘটতে পারে।
অনুভূতিটা এত বাস্তব মনে হয় কেন?
আপনার মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত শরীর থেকে আসা বিভিন্ন সংকেত বিশ্লেষণ করে। যখন শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন বদলে যায় এবং হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, তখন মস্তিষ্ক ভুলভাবে এই শারীরিক অনুভূতিগুলোকে ‘আমি বুঝি অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি’—এরকম সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
এভাবে তৈরি হয় একটি দুষ্টচক্র, মাথা ঘোরা, মনে হওয়া অজ্ঞান হয়ে যাব, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া , আরও দ্রুত শ্বাস নেওয়া, মাথা আরও বেশি ঘোরা।
প্যানিক অ্যাটাকের সময় মাথা ঘোরা বা হালকা লাগার অনুভূতি অনেক ক্ষেত্রেই শরীরে অক্সিজেনের অভাবের কারণে নয়; বরং অতিরিক্ত দ্রুত শ্বাস নেওয়ার কারণে রক্তে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিষয়টি বুঝতে পারলে আতঙ্কের এই চক্র ভাঙা সহজ হতে পারে।
প্যানিক অ্যাটাকের সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লাগলে কী করবেন?
১. শ্বাস ধীর করুন
নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিন এবং মুখ দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন। খুব গভীরভাবে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা না করে আরামদায়ক একটি ছন্দ বজায় রাখুন। অতিরিক্ত গভীর বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া হাইপারভেন্টিলেশন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
২. বসুন বা শুয়ে পড়ুন
খুব বেশি মাথা ঘুরলে বসে পড়ুন। প্রয়োজন হলে সমতল জায়গায় শুয়ে থাকুন, যতক্ষণ না অনুভূতিটি কমে আসে। এতে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে।
চোখ বন্ধ করে শরীরের পেশিগুলো শিথিল করার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ধীরে ধীরে শরীরের ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়া কমতে সাহায্য করতে পারে।
৩. নিজের চারপাশে মনোযোগ দিন
৫-৪-৩-২-১ গ্রাউন্ডিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন—
৫টি জিনিস দেখুন
৪টি জিনিস স্পর্শ করে অনুভব করুন
৩টি শব্দ শুনুন
২টি গন্ধ শনাক্ত করুন
১টি স্বাদ অনুভব করুন
এই পদ্ধতি আপনার মনোযোগকে আতঙ্কের শারীরিক অনুভূতি থেকে সরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
৪. নিজেকে মনে করিয়ে দিন কী হচ্ছে
নিজেকে বলতে পারেন— “এটি একটি প্যানিক অ্যাটাক। অনুভূতিটা ভয়ংকর, কিন্তু এটি কেটে যাবে।” অনেকের ক্ষেত্রেই কী ঘটছে তা বুঝতে পারা এবং নিজেকে আশ্বস্ত করা আতঙ্কের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করে।
কখন ধরে নিতে হবে, এটি শুধু প্যানিক অ্যাটাক নয়?
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতির পেছনে সবসময় উদ্বেগ বা প্যানিক অ্যাটাক কাজ করে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি যদি—
আপনি সত্যিই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন
বারবার অজ্ঞান হন
বুকে ব্যথা হয় এবং তা কমে না
উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়
শরীরের কোনো অংশ দুর্বল হয়ে যাওয়া, কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা বিভ্রান্তির মতো নতুন স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দেয়
আপনার হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকে অথবা পরিবারে আকস্মিক হৃদ্যন্ত্রজনিত মৃত্যুর ইতিহাস থাকে
ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় জ্ঞান হারানোর মতো অনুভূতি হয়
এ ধরনের উপসর্গের পেছনে অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তাই সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্যানিক অ্যাটাকের সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলব—এমন অনুভূতি অত্যন্ত সাধারণ এবং ভয়ংকর। তবে শুধুমাত্র প্যানিক অ্যাটাকের কারণে সত্যিই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা নয়। মাথা ঘোরা, হালকা লাগা বা চোখে ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ অনেক সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবর্তন এবং শরীরের স্বাভাবিক স্ট্রেস প্রতিক্রিয়ার কারণে হয়।
যদি নিয়মিত প্যানিক অ্যাটাক হয়, তাহলে একজন চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উপকারী। কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT), শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের কৌশল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ—এসব চিকিৎসা প্যানিক অ্যাটাকের পাশাপাশি এ নিয়ে তৈরি ভয় ও উদ্বেগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
তবে প্রথমবার অজ্ঞান হওয়া, বারবার অজ্ঞান হওয়া বা নতুন/তীব্র শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলে সেটিকে শুধু প্যানিক অ্যাটাক ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সূত্র: হেলথলাইন