ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি ছিল গভীর টান। মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যে মেয়েটির শিল্পীজীবনের শুরু, একসময় তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলা ও পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ। রূপ, অভিনয় ও নৃত্য—তিনের মেলবন্ধনে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া সেই শিল্পী শবনম। দীর্ঘ কয়েক দশকের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি শুধু ঢাকার দর্শককেই মুগ্ধ করেননি, পাকিস্তানের চলচ্চিত্রেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন শবনম। তার অভিনীত শেষ সিনেমা ‘আম্মাজান’। সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দর্শকের কাছে শবনম যেন নতুন করে পরিচিতি পান—‘আম্মাজান’ নামে। তবে এই পরিচয়ের বহু আগে থেকেই উপমহাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে তিনি ছিলেন পরিচিত ও জনপ্রিয় এক তারকা।
১৯৬১ সালে ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পান শবনম। পরের বছর উর্দু চলচ্চিত্র ‘চান্দা’-তে অভিনয় করে তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে তারকাখ্যাতি অর্জন করেন। এরপর ঢাকার পাশাপাশি পাকিস্তানের চলচ্চিত্রেও নিয়মিত কাজ করতে থাকেন।
এক সাক্ষাৎকারে শবনম জানান, ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা থেকে লাহোরে চলে যান। এরপর পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন। সেখানে তার জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়তে থাকে।
পাকিস্তানে প্রথম সিনেমায় অভিনয়ের সম্মানী কত ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে শবনম বলেন, সম্মানীর সঠিক অঙ্কটি তার মনে নেই। তবে সেই অর্থ দিয়ে করাচিতে তিনি দুই বেডরুমের একটি ছোট বাড়ি কিনেছিলেন। তখন তার মা-বাবা ও ছেলে রনি ঢাকায় থাকতেন। বাড়ি কেনার পর তাদেরও পাকিস্তানে নিয়ে যান তিনি।
ঢাকার চলচ্চিত্রে নিজের শুরুর সময়ের কথাও স্মরণ করেছেন এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী। ‘হারানো দিন’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ১ হাজার ২০০ টাকা। সেই অর্থ তিনি মাকে দিয়েছিলেন। তবে ‘এ দেশ তোমার আমার’ এবং ‘রাজধানীর বুকে’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য কোনো সম্মানী পাননি বলেও জানান তিনি।
শবনমের চলচ্চিত্রজীবন শুধু সাফল্যের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে এক শিল্পীর দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস। ঢাকার চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তা অর্জনের পর পাকিস্তানের চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা করে নেওয়া, দুই দেশের দর্শকের ভালোবাসা পাওয়া এবং কয়েক দশক পর আবার ‘আম্মাজান’ হয়ে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে ফিরে আসা—সব মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসেরই একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
আজ সোমবার, ১৭ আগস্ট, শবনমের জন্মদিন। ১৯৪৬ সালে জন্ম নেওয়া এই নন্দিত অভিনেত্রী আজ জীবনের ৮১তম বছরে পা রাখলেন। জন্মদিনে তাকে ঘিরে নতুন করে স্মরণ করা হচ্ছে তার সেই দীর্ঘ শিল্পীজীবন—যে জীবনের শুরু হয়েছিল নৃত্যের ছন্দে, আর পর্দায় যার দীপ্তি ছড়িয়ে ছিল কয়েক দশক ধরে।